ইতিহাসের পাতায় কিছু নাম কেবল কালির আঁচড় হয়ে থাকে না, বরং তা হয়ে ওঠে একটি জাতির অহংকার ও আত্মমর্যাদার প্রতীক। মাগফার আহমেদ চৌধুরী আজাদ—যিনি আমাদের কাছে শহীদ আজাদ নামে পরিচিত—ছিলেন তেমনই এক অদম্য প্রাণ তরুণ। একাত্তরের অগ্নিঝরা দিনে নিজের জীবনের মায়া ত্যাগ করে তিনি ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন মাতৃভূমির মুক্তিসংগ্রামে। ঢাকার বুকে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর ত্রাস সৃষ্টি করা কিংবদন্তিতুল্য গেরিলা দল ‘ক্র্যাক প্লাটুনে’র সদস্য হিসেবে তিনি যেসব সাহসী অভিযান পরিচালনা করেছিলেন, তা আজও আমাদের মনে করিয়ে দেয় পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙার সেই চিরন্তন শক্তি।
১৯৪৬ সালের ১১ জুলাই জন্ম নেওয়া আজাদ শৈশব ও কৈশোর কাটিয়েছেন বেশ স্বচ্ছল ও অভিজাত পরিবেশে। তাঁর পিতা ইউনুস আহমেদ চৌধুরী ছিলেন তৎকালীন সময়ের অত্যন্ত ধনাঢ্য ব্যবসায়ী এবং মা মোসাম্মাৎ সাফিয়া বেগম ছিলেন একজন দৃঢ়চেতা নারী। পারিবারিক টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে বেড়ে উঠলেও আজাদ ছিলেন অত্যন্ত স্বাধীনচেতা, প্রাণবন্ত এবং বইপ্রেমী। প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনার পাশাপাশি শিল্প-সাহিত্য ও সংস্কৃতির প্রতি তাঁর গভীর অনুরাগ ছিল। করাচি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক সম্পন্ন করার পর তিনি ১৯৭০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ থেকে মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করেন। সচ্ছল পরিবারের সন্তান হয়েও তিনি নিরাপদ ও আরামদায়ক জীবন বেছে নেননি; বরং দেশের ক্রান্তিলগ্নে মুক্তির মিছিলে শামিল হন।
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে আজাদ যোগ দেন ২ নম্বর সেক্টরের অধীনে গঠিত নগরভিত্তিক গেরিলা দল ক্র্যাক প্লাটুনে। পাকিস্তানি সামরিক জান্তার রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে ঢাকার অলিগলিতে চালানো বিভিন্ন দুঃসাহসিক অপারেশনে তিনি অসাধারণ বীরত্বের পরিচয় দেন। কিন্তু নিষ্ঠুর ইতিহাসের নির্মম সত্য হলো, ১৯৭১ সালের ৩০ আগস্ট পাকিস্তানি বাহিনী তাঁকে নিজ বাসা থেকে আটক করে নিয়ে যায়। রমনা রেসকোর্স ময়দানসহ বিভিন্ন গোপন আস্তানায় তাঁর ওপর চালানো হয় অমানুষিক শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন। কিন্তু দেশপ্রেমিক এই বীরের মুখ থেকে একটি কথাও বের করতে পারেনি ঘাতকেরা। সহযোদ্ধাদের নাম কিংবা মুক্তিযুদ্ধের গোপন কৌশল রক্ষায় তিনি নিজের জীবনকে তুচ্ছ জ্ঞান করেছিলেন।
এই আত্মত্যাগের সবচেয়ে হৃদয়বিদারক দিকটি জড়িয়ে আছে তাঁর জননী সাফিয়া বেগমের সঙ্গে। কারাবন্দি ছেলের সঙ্গে শেষ সাক্ষাতের সময় মা যখন জানতে চেয়েছিলেন তার কী খেতে ইচ্ছে করছে, আজাদ সরলভাবে বলেছিলেন ভাত খেতে চাওয়ার কথা। মা পরদিন পরম যত্নে ভাত রান্না করে পাকিস্তানি বাহিনীর কাছে নিয়ে গেলেও ছেলের দেখা পাননি। ঘাতকেরা তাঁকে আগেই হত্যা করেছিল। সন্তানের মুখে নিজের হাতে একমুঠো ভাত তুলে দিতে না পারার এই নির্মম যন্ত্রণা সাফিয়া বেগমকে আমৃত্যু পুড়িয়েছে। সন্তানের শোকে তিনি জীবনের বাকি চৌদ্দ বছর কখনো মুখে ভাত তোলেননি, যা আমাদের মুক্তিযুদ্ধের এক নিদারুণ মানবিক ও বেদনাবিধূর অধ্যায় হয়ে আছে।
পরবর্তীতে কথাসাহিত্যিক আনিসুল হক এই সত্য ও মর্মান্তিক ঘটনার ওপর ভিত্তি করে রচনা করেন কালজয়ী উপন্যাস ‘মা’, যা প্রতিটি বাঙালির হৃদয়ে গভীর দাগ কেটেছে। শহীদ আজাদ শুধু একজন ব্যক্তি নন, তিনি আমাদের স্বাধীনতার জন্য জীবন উৎসর্গ করা লাখো তরুণের অদম্য সাহসের প্রতিচ্ছবি। তাঁর আত্মত্যাগ এবং তাঁর মায়ের অন্তহীন অপেক্ষা আমাদের শিখিয়েছে স্বাধীনতা কতটা মূল্যবান। আজকের স্বাধীন বাংলাদেশে দাঁড়িয়ে সেই বীর শহীদ ও তাঁর পরিবারের আত্মত্যাগকে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব।









