চট্টগ্রাম নগরীর চান্দগাঁওয়ে ফুটপাতে রিকশাভ্যানে অবৈধভাবে দোকান বসাতে বাধা দেওয়াকে কেন্দ্র করে এক রক্তাক্ত ঘটনার সৃষ্টি হয়েছে। প্রতিপক্ষের সজোরে ধাক্কা ও মারধরের শিকার হয়ে ফজল আমিন নামে এক যুবদল নেতা মারা গেছেন। শুক্রবার দুপুরে চান্দগাঁও থানার ওমর আলী মাতবর সড়কের একটি স্থানীয় স্কুলের সামনে প্রকাশ্যে এ ঘটনা ঘটে। মর্মান্তিক এই হত্যাকাণ্ডে গোটা এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। নিহতের স্বজনেরা ইতিমধ্যেই অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে থানায় লিখিত মামলা দায়ের করেছেন।
নিহত ফজল আমিন চট্টগ্রাম নগরীর ৬ নম্বর ওয়ার্ড যুবদলের সিনিয়র যুগ্ম সম্পাদক হিসেবে রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন। অন্যদিকে এ ঘটনায় অভিযুক্ত প্রধান আসামির নাম মো. শাহজাহান, যিনি এলাকায় নিজেকে বিএনপির স্থানীয় নেতা বলে দাবি করেন। চান্দগাঁও থানা পুলিশ সূত্রে নিশ্চিত করা হয়েছে যে, নিহতের পরিবারের লিখিত আবেদনের ভিত্তিতে শাহজাহান ও তার কয়েকজন সহযোগীকে আসামি করে হত্যা মামলা নথিভুক্ত হয়েছে।
শনিবার দুপুরে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের মর্গে ফজল আমিনের মরদেহের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়। ময়নাতদন্ত চলাকালে মর্গ প্রাঙ্গণে উপস্থিত নিহতের স্বজন ও স্থানীয় অধিবাসীরা অভিযুক্ত শাহজাহানের বিরুদ্ধে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেন। স্থানীয়দের দাবি, শাহজাহান দীর্ঘদিন ধরে ওমর আলী মাতবর সড়কে অবৈধভাবে ভ্যান বসিয়ে ফুটপাত দখল করে আসছিলেন। কেবল দোকান বসানোই নয়, প্রতিটি ভ্যান থেকে নিয়মিত চাঁদা তুলতেন তিনি। স্কুলের ঠিক সামনে এই ভ্যানগুলো রাখার কারণে প্রতিদিন শত শত কোমলমতি শিক্ষার্থী ও পথচারীদের চলাচলে বিঘ্ন ঘটত।
রাস্তায় শৃঙ্খলা ফেরাতে এবং কোমলমতি শিক্ষার্থীদের যাতায়াত নির্বিঘ্ন করতে সম্প্রতি স্থানীয় মাতবর ও সর্বস্তরের বাসিন্দারা এক বৈঠকে মিলিত হন। সর্বসম্মতিক্রমে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় যে, স্কুলের সামনের ফুটপাত বা সড়কে কোনোভাবেই ব্যবসায়িক ভ্যান বসানো যাবে না। কিন্তু এলাকার সামাজিক এই সিদ্ধান্তকে কোনো তোয়াক্কা না করেই শুক্রবার ফের সেখানে রিকশাভ্যান বসিয়ে চাঁদাবাজি শুরু করেন শাহজাহান।
ঘটনার রোমহর্ষক বর্ণনা দিতে গিয়ে নিহতের ছেলে জোবায়ের হক ইনান জানান, শুক্রবার দুপুরে স্কুলের সামনে ভ্যান দেখতে পেয়ে তার বাবা ফজল আমিন শাহজাহানের কাছে গিয়ে নিষেধ করেন এবং সিদ্ধান্তের কথা মনে করিয়ে দেন। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে উঠে শাহজাহান ও তার ছেলে ফজল আমিনের ওপর চড়াও হয়। একপর্যায়ে তারা তাকে এলোপাতাড়ি মারধর করে এবং বুকের ওপর সজোরে ধাক্কা মারে।
নিহতের ছেলে আরও জানান, কয়েক বছর আগে তার বাবার হার্টে একটি বড় অস্ত্রোপচার (ওপেন হার্ট সার্জারি) হয়েছিল। ফলে বুকে সজোরে আঘাত পাওয়ার মাত্র ১০ মিনিটের মাথায় ফজল আমিন রাস্তায় ঢলে পড়েন এবং মারাত্মক শ্বাসকষ্ট অনুভব করতে থাকেন। স্বজনেরা আশঙ্কাজনক অবস্থায় তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলেও পথেই তার মৃত্যু হয়। ইনান অভিযোগ করে বলেন, ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সুযোগ নিয়ে শাহজাহান হঠাৎ সক্রিয় হয়ে উঠেছেন এবং ‘হাইব্রিড বিএনপি নেতা’ সেজে এলাকার অলিগলিতে দখলদারি ও চাঁদাবাজির সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছেন।
আইনি পদক্ষেপ ও প্রাথমিক তদন্ত প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) পাঁচলাইশ জোনের সহকারী কমিশনার কাজী মো. বিধান আবিদ জানান, স্থানীয় ফুটপাতে দোকান বসানো নিয়ে দুই পক্ষের মধ্য কথা-কাটাকাটি ও ধাক্কাধাক্কির খবর পেয়েছিল পুলিশ। হাসপাতালে নেওয়ার আগেই তিনি মারা যান। নিহতের আগের শারীরিক অসুস্থতা এবং ধাক্কার আঘাতের তীব্রতা কতটুকু ছিল, তা ময়নাতদন্তের পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট পেলেই পরিষ্কার হওয়া যাবে। চাঁদাবাজির বিষয়টি নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা হচ্ছে এবং আসামিদের দ্রুত গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে।
এদিকে ঘটনা প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম মহানগর যুবদলের সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ শাহেদ জানান, ফজল আমিন তাদের ওয়ার্ড কমিটির দায়িত্বশীল নেতা ছিলেন। অপরাধীর মূল পরিচয় সে একজন অপরাধী। এখানে রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে ছাড় পাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। যে-ই এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত থাকুক, তদন্তের মাধ্যমে তাকে যেন আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তি দেওয়া হয়।









