জিলাইভ বাংলা | সত্যের জয় অবধারিত

নিউক্লিয়ার নয় আমাদের দরকার কিউবিট ক্যাপাসিটি

১৯৬৫ সালের সেপ্টেম্বর যুদ্ধস্রোতের পর পাকিস্তানের তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টো এক তীব্র ও আবেগপূর্ণ হুংকার ছেড়েছিলেন—”ভারত যদি পারমাণবিক বোমা তৈরি করে, তবে আমরা প্রয়োজনে ঘাস কিংবা পাতা খেয়ে বেঁচে থাকব, তবুও আমরা আমাদের নিজস্ব পরমাণু অস্ত্র তৈরি করব।” পাকিস্তানের সামরিক ও আমলাতান্ত্রিক এলিটশ্রেণি তাদের রাষ্ট্র পরিচালনার চূড়ান্ত দর্শন হিসেবে এই আত্মঘাতী জেদটিকেই আঁকড়ে ধরেছিল। ইতিহাসের নিষ্ঠুর পরিণতি হলো, পাকিস্তান পারমাণবিক রাষ্ট্র হয়েছে ঠিকই, কিন্তু আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (IMF) এবং বিশ্বব্যাংকের হালনাগাদ অর্থনৈতিক সূচকগুলো সাক্ষী দেয় যে ভুট্টো সাহেবের সেই ‘ঘাস খাওয়ার’ ভবিষ্যদ্বাণীই তাদের জাতীয় জীবনের নির্মম সত্যে পরিণত হয়েছে। আজ দেশটির সাধারণ মানুষ আক্ষরিক অর্থেই আটার বস্তার লাইনে দাঁড়িয়ে জীবন বাজি রাখছে, অথচ তাদের রাষ্ট্রীয় অস্ত্রাগারে শোভা পাচ্ছে বিধ্বংসী নিউক্লিয়ার ওয়ারহেড।
একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি বা স্থায়িত্ব কোনো দিনই মারণাস্ত্রের স্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে না; তার ভিত্তি গড়ে ওঠে নাগরিকদের জীবনযাত্রার মান, অর্থনৈতিক সক্ষমতা এবং প্রযুক্তিগত উৎকর্ষের ওপর। পাকিস্তান তার অর্থনীতি, শিক্ষা এবং জনগণের মৌলিক অধিকারকে বিসর্জন দিয়ে ভারতের সঙ্গে একটি কৃত্রিম ও চিরস্থায়ী বৈরিতার নীতি বজায় রেখেছে। এর ফলে বৈশ্বিক অঙ্গনে তাদের পরিচিতি দাঁড়িয়েছে এমন এক জাতি হিসেবে, যার “এক হাতে বন্দুক আর অন্য হাতে ভিক্ষার থালা।” আন্তর্জাতিক পাসপোর্ট সূচকে তাদের অবস্থান তলানিতে, আর বিশ্বের বিভিন্ন বিমানবন্দরে ভিক্ষাবৃত্তির অভিযোগে নাগরিকদের আটকের ঘটনা এখন নিয়মিত সংবাদ। এই পতনশীল রূপ চিত্রিত করে যে, ভূরাজনৈতিক জিদ যখন অর্থনৈতিক বাস্তবতাকে গ্রাস করে ফেল,তখন পারমাণবিক বোমাও একটি দেউলিয়া রাষ্ট্রকে তলিয়ে যাওয়া থেকে বাঁচাতে পারে না।

Table of Contents

এক হাতে বন্দুক, অন্য হাতে ভিক্ষার থালা: পাকিস্তান মডেলের মরীচিকা

১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর এক রক্তক্ষয়ী ও বিধ্বংসী মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ যখন স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে তার পথচলা শুরু করেছিল, তখন বিশ্বমঞ্চের বাঘা বাঘা বিশ্লেষকরা এই নবজাত রাষ্ট্রের টিকে থাকা নিয়ে চরম সংশয় প্রকাশ করেছিলেন। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের কোষাগার সম্পূর্ণ শূন্য করে সমস্ত সম্পদ ও পুঁজি পশ্চিম পাকিস্তানে পাচার করে দেওয়ার কারণে স্বাধীনতার অব্যবহিত পরে বাংলাদেশের জিডিপির আকার ছিল মাত্র ৮.৭৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যেখানে পাকিস্তানের জিডিপি ছিল ১০.৬৭ বিলিয়ন ডলার। অর্থনৈতিক শক্তিমত্তার পাশাপাশি পাকিস্তানের অনুকূলে ছিল সুরক্ষিত সামরিক অবকাঠামো এবং পরাশক্তিগুলোর শক্তিশালী কূটনৈতিক লবি। কিন্তু পরবর্তী সাড়ে পাঁচ দশকে সামরিক উন্মাদনা বনাম অর্থনৈতিক pragmatism বা বাস্তবতাবোধের এই দুই ভিন্ন মেরুর নীতি দুই দেশের ভাগ্য সম্পূর্ণ বদলে দিয়েছে। বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ এবং ইউএনডিপি (UNDP)-র অফিশিয়াল ডেটা এই ঐতিহাসিক ব্যবধানকে আজ এক অকাট্য বাস্তবতায় রূপ দিয়েছে:
  • মাথাপিছু জিডিপি (Nominal GDP per capita): আইএমএফ-এর হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশের মাথাপিছু জিডিপি ২,৫২০ মার্কিন ডলারে উন্নীত হয়েছে। পক্ষান্তরে পাকিস্তানের মাথাপিছু জিডিপি সংকুচিত হয়ে নেমে এসেছে মাত্র ১,৪৭১ মার্কিন ডলারে। অর্থাৎ, পরিসংখ্যানগতভাবেই একজন সাধারণ বাংলাদেশি নাগরিকের অর্থনৈতিক উৎপাদনশীলতা ও ক্রয়ক্ষমতা একজন পাকিস্তানির তুলনায় প্রায় ৭১ শতাংশ বেশি।
  • মুদ্রার স্থায়িত্ব ও মুদ্রাস্ফীতির কষাঘাত: যেখানে বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে বাংলাদেশি টাকার বিনিময় হার তুলনামূলক স্থিতিশীল রাখা সম্ভব হয়েছে, সেখানে এক মার্কিন ডলার কিনতে পাকিস্তানি নাগরিকদের গুনতে হচ্ছে রেকর্ড পরিমাণ রুপি। মুদ্রার এই বেসামাল অবমূল্যায়নের পাশাপাশি পাকিস্তানের আকাশচুম্বী মুদ্রাস্ফীতি দেশের সাধারণ মানুষের সঞ্চয় ও ক্রয়ক্ষমতা পুরোপুরি চূর্ণ করে দিয়েছে। এর বিপরীতে বাংলাদেশ বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ধাক্কা সামলেও মূল্যস্ফীতিকে সহনশীল সীমার মধ্যে ধরে রাখতে পেরেছে।
  • বৈদেশিক বাণিজ্য ও রিজার্ভের স্বস্তি: পাকিস্তানের রপ্তানি আয় যখন কয়েক দশক ধরে ৩০ বিলিয়ন ডলারের চৌহদ্দিতে আটকে রয়েছে, তখন তৈরি পোশাকশিল্প, বহুমুখী পণ্য রপ্তানি এবং প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সের ওপর ভর করে বাংলাদেশের মোট রপ্তানি আয় বহু গুণে বৃদ্ধি পেয়েছে। একই সময়ে পাকিস্তান যখন আন্তর্জাতিক ঋণখেলাপি হওয়া থেকে বাঁচতে বন্ধুরাষ্ট্রগুলোর দ্বারে দ্বারে চড়া সুদে ঋণ রোল-ওভার করার আকুতি জানিয়েছে, বাংলাদেশ তখন নিজস্ব আর্থিক কাঠামোর ওপর ভরসা রেখে বড় বড় মেগা প্রকল্পের কাজ এগিয়ে নিয়েছে।
  • মানব উন্নয়ন সূচক (HDI): রাষ্ট্র হিসেবে পাকিস্তানের ব্যর্থতার সবচেয়ে বড় দলিল মিলবে তাদের মানব সম্পদ উন্নয়নের মানদণ্ডে। ইউএনডিপির সর্বশেষ মানব উন্নয়ন সূচকে বাংলাদেশ ‘মাঝারি মানব উন্নয়ন’ ক্যাটাগরিতে অবস্থান করে পাকিস্তানকে বহু পেছনে ফেলে দিয়েছে। বাংলাদেশের মানুষের গড় আয়ু ও জীবনযাত্রার মান দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশের জন্যই এখন ঈর্ষণীয়।
এই পরিসংখ্যানগুলো কোনো সমাপতন নয়; এটি একটি রাষ্ট্রের ভুল নীতি এবং অগ্রাধিকার হারানোর অনিবার্য মূল্য। পাকিস্তান যখন পারমাণবিক অস্ত্রের রক্ষণাবেক্ষণ এবং ভারতের বিরুদ্ধে ছায়াযুদ্ধ টিকিয়ে রাখতে বাজেটের সিংহভাগ অর্থ অনুৎপাদনশীল সামরিক খাতে ঢেলেছে, বাংলাদেশ তখন নিরবে প্রাথমিক শিক্ষা, গ্রামীণ অবকাঠামো, স্বাস্থ্যসেবা ও নারীর ক্ষমতায়নে বিনিয়োগ বাড়িয়ে গেছে। আজ পাকিস্তান যখন আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের কঠোর শর্তের বেড়াজালে পিষ্ট হয়ে একপ্রকার সাহায্যপ্রার্থী রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে, তখন প্রতিবেশী ভারত ৩.৭ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি নিয়ে বিশ্বের অন্যতম প্রধান বৈশ্বিক শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। এই ব্যবধান প্রমাণ করে যে, কেবল অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে টেকসই উন্নয়ন অর্জন করা অসম্ভব, যদি না অর্থনৈতিক বুনিয়াদ মজবুত হয়।

দেশীয় ছদ্ম-বুদ্ধিবৃত্তিক উন্মাদনা এবং ৪,১৫৬ কিলোমিটারের বাস্তব সীমান্ত

দুর্ভাগ্যের বিষয় হলো, আমাদের সমাজের কিছু অতিউৎসাহী গোষ্ঠী এবং সুযোগসন্ধানী মহল আজও এই দেউলিয়া ‘পাকিস্তান মডেলের’ মায়া কাটিয়ে উঠতে পারেনি। একধরনের ভূরাজনৈতিক হীনম্মন্যতা ও কৃত্রিম যুদ্ধোন্মাদনায় ভুগে তারা প্রায়শই আফগানিস্তান বা মধ্যপ্রাচ্যে পরাশক্তির পিছু হটার ঘটনা দেখে রাস্তায় উল্লাস প্রকাশ করে। কিন্তু এই সহজ সত্যটি অনুধাবন করার মতো ন্যূনতম বুদ্ধিবৃত্তিক পরিপক্বতা তাদের নেই যে—আফগানিস্তান বা ইরানের ভূপ্রকৃতি, কৌশলগত অবস্থান এবং বিশাল ভূগর্ভস্থ খনিজ সম্পদের সঙ্গে বাংলাদেশের ভৌগোলিক বাস্তবতার দূরতম কোনো সম্পর্ক নেই।
পাহাড়ঘেরা দুর্গম আফগানিস্তান কিংবা তেলসমৃদ্ধ ইরান যেভাবে দশকের পর দশক যুদ্ধ টিকিয়ে রেখেছে, ঘনবসতিপূর্ণ এবং সমতল ভূমির বাংলাদেশ কি তা পারবে? যুদ্ধ পরবর্তী ওই দেশগুলোর ক্ষুধা, চরম দারিদ্র্য ও আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতার চিত্র দেখার ফুসরত এই উগ্রপন্থীদের নেই। তারা অন্ধের মতো একটি কাল্পনিক সংঘাতের স্বপ্ন দেখে। অথচ তারা বুঝতে পারে না যে আমাদের মতো একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল ও জনবহুল ভূখণ্ডে সামান্য কোনো সামরিক সংঘাতের ধাক্কা লাগলে গত কয়েক দশকে তিলে তিলে গড়ে ওঠা আমাদের অর্থনীতি, রেমিট্যান্স এবং পোশাক খাতের ভিত্তি এক নিমেষে ধুলোয় মিশে যাবে।
এই গোষ্ঠীটি মূলত জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পররাষ্ট্রনীতির মূল মন্ত্র—”সকলের সাথে বন্ধুত্ব, কারো সাথে বৈরিতা নয়”—এই আদর্শকে বিসর্জন দিয়ে বাংলাদেশকে কোনো পরাশক্তির দাবার ঘুঁটি বানাতে চায়। তারা চায় আমরা পাকিস্তানের অন্ধ অনুকরণ করি এবং নিজেদের সার্বভৌমত্ব বিপন্ন করে ফেলব। তারা বোঝে না যে ভারতের সাথে আমাদের ৪,১৫৬ কিলোমিটারের এক বিশাল ও জটিল স্থল সীমান্ত রয়েছে। পাকিস্তানের সঙ্গে ভারতের সীমান্ত মূলত মরুভূমি ও পাহাড়ি অঞ্চলের হওয়ায় তা পাহারা দেওয়া একরকম; কিন্তু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে তিন দিকের সীমান্ত এবং নদীমাতৃক ভূপ্রকৃতির বাস্তবতায় যদি চিরস্থায়ী বৈরিতা টিকিয়ে রাখতে গিয়ে সামরিক মহড়া ও ডিফেন্স বেল্ট গড়ে তুলতে হয়, তবে জাতীয় বাজেটের বড় অংশ কেবল সামরিক খাতেই ফুরিয়ে যাবে। স্বাস্থ্য ও শিক্ষার বাজেট কোণঠাসা হয়ে শেষ পর্যন্ত এ দেশের মানুষের হাতেও পাকিস্তানের মতো ভিক্ষার থালা তুলে দিতে হবে।
ভারতবেষ্টিত এই ভূখণ্ডে টিকে থাকার একমাত্র বাস্তবসম্মত দর্শন হলো পারস্পরিক সম্মান ও সমতার ভিত্তিতে সুসম্পর্ক বজায় রাখা। সংঘাত নয়, বরং এই ৪,১৫৬ কিলোমিটার সীমান্তকে আঞ্চলিক বাণিজ্যের করিডোর ও ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহার করে ভারতের বিশাল বাজারে প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করাই বুদ্ধিমানের কাজ। বন্দুকের নল উঁচিয়ে সীমান্ত পাহারা দেওয়ার চেয়ে বাণিজ্যের আন্তঃসংযোগ বা ইকোনমিক ইন্টারকানেক্টিভিটি তৈরি করাই হলো সবচেয়ে শক্তিশালী কূটনৈতিক প্রতিরক্ষাব্যবস্থা। বিংশ শতাব্দীর আদিম মানসিকতা পরিহার করে একবিংশ শতাব্দীর এআই ও কোয়ান্টাম যুগে টিকে থাকতে হলে আমাদের মূল শক্তি হতে হবে জ্ঞানভিত্তিক অর্থনৈতিক প্রতিরোধ, সীমান্তে কামানের গোলা দাগানো নয়।

নিউক্লিয়ার বনাম কিউবিট ক্যাপাসিটি: শক্তির নতুন সমীকরণ

শক্তির চিরন্তন সংজ্ঞা এখন সম্পূর্ণ বদলে গেছে। পারমাণবিক বোমার বদলে যখন ‘কিউবিট ক্যাপাসিটি’ বা কোয়ান্টাম সক্ষমতার কথা বলা হয়, তখন অনেকে হয়তো অবাক হন। একটু গভীরভাবে চিন্তা করলে দেখা যাবে, পারমাণবিক বোমার ধারণাটি চরম ধ্বংসাত্মক ও রৈখিক। একটি পরমাণু বোমা একটি নির্দিষ্ট শহর বা ভূখণ্ডকে নিমেষে পুড়িয়ে ছাই করে দিতে পারে, কিন্তু তা নতুন কোনো অর্থনৈতিক মূল্য, সম্পদ বা মানবকল্যাণ সৃষ্টি করতে পারে না। এর শেষ গন্তব্য কেবল শ্মশান।
অন্যদিকে, কোয়ান্টাম কম্পিউটিংয়ের মূল একক ‘কিউবিট’-এর শক্তি হলো সৃজনশীল ও বহুমাত্রিক। প্রথাগত বাইনারি কম্পিউটারের লিনিয়ার গণ্ডি পেরিয়ে কোয়ান্টাম কম্পিউটার একই সঙ্গে কোটি কোটি জটিল গাণিতিক সম্ভাবনা ও সমীকরণ সমাধান করতে পারে। বিংশ শতাব্দীতে কোনো দেশের ক্ষমতা মাপা হতো তার পারমাণবিক অস্ত্রাগার বা খনিজ তেলের পরিমাণের ওপর ভিত্তি করে। কিন্তু বর্তমান যুগে মানচিত্রের কাঁটাতার কিংবা অস্ত্রের স্তূপের সেই যুগ পেরিয়ে ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু চলে গেছে সিলিকন চিপ ও কিউবিটের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র পারমাণবিক স্তরে। বিশ্বশক্তিগুলোর নীতিনির্ধারকরা এখন পারমাণবিক ওয়ারহেড গোনার চেয়ে অনেক বেশি ব্যস্ত সেমিকন্ডাক্টর চিপের সাপ্লাই চেইন এবং কোয়ান্টাম প্রযুক্তির একচ্ছত্র আধিপত্য ধরে রাখতে। আন্তর্জাতিক সম্পর্কে একেই বলা হচ্ছে ‘চিপ-রাজনীতি’ বা Chiplomacy।
ভবিষ্যতের অর্থনীতি তেল বা কয়লার ওপর নির্ভর করবে না; তা চলবে খাঁটি কম্পিউটেশনাল ক্ষমতার জোরে। যার হাতে যত শক্তিশালী কিউবিট ক্যাপাসিটি থাকবে, সে তত দ্রুত উন্নত ন্যানো-মেটেরিয়াল উদ্ভাবন করতে পারবে, জটিল রোগের প্রতিষেধক আবিষ্কার করবে এবং শত্রুদেশের সাইবার ডিফেন্স বা ব্যাংকিং এনক্রিপশন সিস্টেম এক নিমিষে অচল করে দিয়ে রক্তপাতহীন জয় নিশ্চিত করতে পারবে। তাই তরুণ প্রজন্মকে সস্তা যুদ্ধাবস্থার দিকে ঠেলে না দিয়ে চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের এই চাবিকাঠি—কোয়ান্টাম প্রযুক্তির উপযোগী করে গড়ে তোলাই আমাদের সবচেয়ে বড় ডিটারেন্স বা প্রতিরোধক দেয়াল।

চিপ-রাজনীতি ও এশীয় অক্ষের রূপান্তর: হার্ডওয়্যারের নতুন একচেটিয়া বাজার

প্রযুক্তির শেষ কথা বুঝি সিলিকন ভ্যালি—এই ধারণাটি ভ্রান্ত। সিলিকন ভ্যালি যতই চোখধাঁধানো সফটওয়্যার বা জেনারেটিভ এআই তৈরি করুক না কেন, সেগুলোর ভৌত অস্তিত্ব ও প্রসেসিং ক্ষমতা সম্পূর্ণভাবে এশীয় অক্ষের ওপর নির্ভরশীল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কোড বা অ্যালগরিদম লিখতে পারলেও সেই কোডকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার মতো হার্ডওয়্যার পরিকাঠামো তাদের মাটিতে নেই। বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে সূক্ষ্ম ও জটিল প্রসেসরগুলোর ডিজাইন পশ্চিমে হলেও সেগুলোর উৎপাদন বা ম্যানুফ্যাকচারিং হয় তাইওয়ানের টিএসএমসি কিংবা দক্ষিণ কোরিয়ার বৃহৎ ল্যাবগুলোতে। এই এশীয় একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ কোনো সামরিক আগ্রাসনের ফল নয়; এটি অর্জিত হয়েছে দীর্ঘমেয়াদি শিক্ষা পরিকল্পনা এবং প্রযুক্তিগত দূরদর্শিতার মাধ্যমে। মাও সে তুংয়ের সেই পুরোনো উক্তি—”শক্তির উৎস বন্দুকের নল”—তা আজ পুরোপুরি বাতিল হয়ে গেছে। একবিংশ শতাব্দীতে শক্তির উৎস সিলিকন ওয়েফারের অণুপরিমাণ ট্রানজিস্টর।
এই কম্পিউটেশনাল লড়াইয়ে চীন এবং ভারতের নিজস্ব ইকোসিস্টেম গড়ে তোলার গল্প বাংলাদেশের জন্য বিরাট শিক্ষা। আমেরিকার কঠোর প্রযুক্তিগত নিষেধাজ্ঞা ও অর্থনৈতিক অবরোধের মুখেও চীন নিজস্ব প্রযুক্তিতে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন প্রসেসর তৈরি করে তাক লাগিয়ে দিয়েছে এবং কোয়ান্টাম সুপ্রিমেসির দৌড়ে পরাশক্তি আমেরিকার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠেছে। অন্যদিকে, ভারত তাদের বিশাল জনসংখ্যাকে কাজে লাগিয়ে ‘ইন্ডিয়া স্ট্যাক’ এবং ‘ইউপিআই’ (UPI)-এর মাধ্যমে ডিজিটাল পাবলিক ইনফ্রাস্ট্রাকচারের এক অনন্য বিপ্লব ঘটিয়েছে। তারা নিজস্ব ‘ন্যাশনাল কোয়ান্টাম মিশন’ চালু করে কিউবিট ক্যাপাসিটি অর্জনে বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করছে। এটি প্রমাণ করে যে আঞ্চলিক শান্তি ও প্রযুক্তিগত স্বাবলম্বিতাই একটি দেশকে সত্যিকার অর্থে শক্তিশালী করে তোলে।

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার স্ট্র্যাটেজিক জাম্প এবং কোয়ান্টাম অর্থনীতির দিকে যাত্রা

আবর্তনের এই যুগে ভিয়েতনাম বা ইন্দোনেশিয়ার মতো দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় দেশগুলো কোনো ধরনের ভূরাজনৈতিক কোন্দলে না জড়িয়ে নিজেদের অর্থনীতিকে বৈশ্বিক সেমিকন্ডাক্টর ও গ্রিন-টেক ভ্যালু চেইনের সঙ্গে শক্তভাবে যুক্ত করেছে। বৈশ্বিক কোম্পানিগুলো যখন বিকল্প বাজারের সন্ধান করল, ভিয়েতনাম তখন কোনো কালক্ষেপণ না করে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দূর করে বিশ্বের অন্যতম প্রধান ইলেকট্রনিক্স ও চিপ অ্যাসেম্বলি হাবে পরিণত হলো। তারা তরুণ প্রজন্মকে প্রথাগত সস্তা ফ্রিল্যান্সিং থেকে টেনে বের করে সরাসরি হার্ডওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিং ও সেমিকন্ডাক্টর আর্কিটেকচারের দুনিয়ায় প্রবেশ করিয়েছে। তারা বুঝতে পেরেছে যে আগামী দিনের কোয়ান্টাম অর্থনীতিতে টিকে থাকতে হলে পুরোনো জংধরা প্রযুক্তির মোহ ত্যাগ করতেই হবে।

বাংলাদেশের বর্তমান দুর্বলতা ও কাঠামোগত সংকট

ডিজিটাল বাংলাদেশ রূপকল্পের সুবাদে ফাইবার অপটিক ক্যাবল সম্প্রসারণ কিংবা মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসের বিস্তারে সাধারণ মানুষের জীবন সহজ হয়েছে। কিন্তু ঐতিহাসিকভাবে পিছিয়ে থাকার কারণে এই অগ্রগতির পরও আমরা এশিয়ার উন্নত দেশগুলোর সমকক্ষ হতে পারিনি। আমাদের সবচেয়ে বড় কৌশলগত সীমাবদ্ধতা হলো—আমরা একটি চমৎকার ‘কনজিউমার সোসাইটি’ বা প্রযুক্তি ব্যবহারকারী সমাজ গঠন করতে পেরেছি ঠিকই, কিন্তু কোনো ‘ইনোভেশন ইকোনমি’ বা প্রযুক্তি উৎপাদনকারী অর্থনীতি গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়েছি। আমাদের আইটি খাত এখনো সস্তা ও মাঝারি দক্ষতার ফ্রিল্যান্সিংয়ের ওপর নির্ভরশীল। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও এআই এজেন্টের যুগে ডাটা এন্ট্রি বা সাধারণ কোডিংয়ের মতো কাজগুলোর চাহিদা বিশ্ববাজারে দ্রুত কমে আসছে। ভিয়েতনাম বা ভারতের তরুণরা যখন ক্লাউড আর্কিটেকচার ও ডেটা সায়েন্স নিয়ে ব্যস্ত, আমাদের তরুণদের একাংশ এখনো পুরোনো ফ্রেমওয়ার্কে আটকে আছে।
পরিকাঠামোগতভাবে আমাদের হাই-টেক পার্কগুলোতে মেগাওয়াট স্কেলের নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ গ্রিড এবং আল্ট্রা-লো ল্যাটেন্সি কানেক্টিভিটির অভাব রয়েছে। পাশাপাশি, বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যসূচি এবং ইন্ডাস্ট্রির চাহিদার মধ্যকার ব্যবধান আমাদের গ্র্যাজুয়েটদের আধুনিক প্রবলেম সলভার হিসেবে গড়ে উঠতে দিচ্ছে না। আমলাতান্ত্রিক ধীরগতি এবং পলিসির স্থবিরতা বিদেশি ভেঞ্চার ক্যাপিটাল ও উচ্চমানের বিনিয়োগ আকর্ষণে বড় ধরনের অন্তরায় হয়ে রয়েছে।

‘ইনোভেশন ইকোনমি’র পথে উত্তরণের কৌশলগত ক্ষেত্রসমূহ

১. ডিজিটাল পাবলিক ইনফ্রাস্ট্রাকচার ও ফিনটেক ইন্টিগ্রেশন: আমাদের ফিনটেক ইকোসিস্টেমকে এশিয়ার অন্যান্য পেমেন্ট গেটওয়ের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। এতে রেমিট্যান্সের খরচ শূন্যের কোঠায় নেমে আসবে এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা সরাসরি আন্তর্জাতিক বাজারে লেনদেন করতে পারবেন। একই সঙ্গে নাগরিক ডাটাবেজকে নিরাপদ ওপেন এপিআই আর্কিটেকচারের আওতায় আনতে হবে।
২. এগ্রি-টেক ও প্রিসিশন এগ্রিকালচার: কোল্ড স্টোরেজের রিয়েল-টাইম ট্র্যাকিং এবং গাণিতিক মডেলের মাধ্যমে কৃষকদের চাহিদার সঠিক পূর্বাভাস দিতে পারলে খাদ্য অপচয় ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে আনা সম্ভব।
৩. সেমিকন্ডাক্টর ও আইসি ডিজাইন হাব: চিপ তৈরির কারখানা প্রতিষ্ঠা ব্যয়বহুল হলেও ইন্টিগ্রেটেড সার্কিট (IC) ডিজাইন ও টেস্টিংয়ের ক্ষেত্রে মেধাবী তরুণদের কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশ এশিয়ার অন্যতম বড় চিপ ডিজাইন আউটসোর্সিং হাবে পরিণত হতে পারে।
৪. জুডিশিয়াল ও স্মার্ট গভর্ন্যান্স অটোমেশন: আদালতগুলোর মামলার জট কমাতে এবং প্রশাসনিক সেবা ডিজিটালাইজ করতে ক্লাউড এবং ডাটা অ্যানালিটিক্সের পূর্ণাঙ্গ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।

নীতিনির্ধারণী দেয়াল ও ডিজিটাল কলোনিয়ালিজমের ঝুঁকি

প্রযুক্তির জ্যামিতিক গতির বিপরীতে আমলাতান্ত্রিক ফাইলের রৈখিক গতি আমাদের সবচেয়ে বড় শক্র। ক্রস-বর্ডার পেমেন্ট রেগুলেশন ও ট্যাক্স কাঠামোর জটিলতা নতুন উদ্ভাবনকে বিদেশে পাড়ি জমাতে বাধ্য করছে। এর চেয়েও বড় বিপদ হলো ব্যাংকিং ও রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তায় ব্যবহৃত ট্র্যাডিশনাল আরএসএ (RSA) এনক্রিপশন। কোয়ান্টাম কম্পিউটারের উৎকর্ষের যুগে পিটার শোরের অ্যালগরিদম ব্যবহার করে এই এনক্রিপশন যেকোনো মুহূর্তে ভেঙে ফেলা সম্ভব হতে পারে। এখনই ‘পোস্ট-কোয়ান্টাম ক্রিপ্টোগ্রাফি’ (PQC) স্ট্যান্ডার্ড গ্রহণ না করলে ডিজিটাল কলোনিয়ালিজম বা উপাত্তের পরাধীনতার মুখে পড়তে হবে আমাদের।

আগামী দশকের পাঁচ কৌশলগত পূর্বাভাস (২০২৬-২০৩৬)

১. এআই এজেন্টের একাধিপত্য (২০২৮): সাধারণ ফ্রিল্যান্সিং ও ডেটা প্রসেসিংয়ের কাজগুলো পুরোপুরি এআইয়ের নিয়ন্ত্রণে চলে যাবে।
২. এশীয় সেমিকন্ডাক্টর মনোপলি (২০৩০): বৈশ্বিক কম্পিউটেশনাল ক্ষমতার ৮০ শতাংশের নিয়ন্ত্রণ চলে যাবে এশীয় অক্ষের হাতে।
৩. দেশীয় লার্জ ফাউন্ডেশনাল মডেল (২০৩১): ডেটা সার্বভৌমত্ব রক্ষায় বাংলাদেশ নিজস্ব বাংলা ভাষার ফাউন্ডেশনাল এআই মডেল তৈরি করবে।
৪. কোয়ান্টাম ক্লাউড ইনফ্রাস্ট্রাকচার (২০৩৩): বাণিজ্যিক খাতে কোয়ান্টাম ক্লাউড সার্ভিসের ব্যবহার আমাদের ফিনটেক ও লজিস্টিকস খাতকে আমূল বদলে দেবে।
৫. আইপি-ভিত্তিক স্টার্টআপ ইকোনমি (২০৩৬): রেমিট্যান্সের প্রধান উৎস হবে সস্তা শ্রম নয়, বরং নিজস্ব বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পত্তি (IP) এবং সফটওয়্যার-অ্যাজ-আ-সার্ভিস (SaaS) মডেল।

পরবর্তী দশকের কার্যকরী রোডম্যাপ

  • সার্ভিস থেকে আইপি মডেলে উত্তরণ: জাতীয় নীতিমালায় ফ্রিল্যান্সিংয়ের সংখ্যাগত পরিমাপের পরিবর্তে ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি ও পেটেন্ট উদ্ভাবনকে প্রাধান্য দিতে হবে।
  • উচ্চতর গণিত ও চিপ ডিজাইন শিক্ষা: বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে লিনিয়ার অ্যালজেব্রা, ডেটা সায়েন্স এবং ভিএলএসআই ডিজাইন কোর্স বাধ্যতামূলক করে বিশেষায়িত ল্যাব প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
  • কোয়ান্টাম ক্রিপ্টোগ্রাফি টাস্কফোর্স: রাষ্ট্রীয় এবং ব্যাংকিং ডেটা সুরক্ষায় অবিলম্বে পোস্ট-কোয়ান্টাম ক্রিপ্টোগ্রাফি স্ট্যান্ডার্ড বাস্তবায়ন করতে হবে।
  • আমলাতান্ত্রিক সংস্কার: বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য ব্যবসার পথ সুগম করতে ক্রস-বর্ডার পেমেন্ট ও ব্যাংকিং প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ আমলাতন্ত্র-মুক্ত করতে হবে।
অতীতে ফাইবার অপটিক নেটওয়ার্কের প্রসার দিয়ে আমরা যে ভিত্তি গড়েছি, তা প্রশংসনীয়। কিন্তু ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু যখন ভৌত হার্ডওয়্যার এবং এশীয় সেমিকন্ডাক্টর মনোপলির দিকে চলে গেছে, তখন পুরোনো ছকে বসে থাকার কোনো অবকাশ নেই। সিলিকন ভ্যালির একাধিপত্য ভাঙার এই ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে—আমরা কি সস্তা শ্রমের বৃত্তে বন্দি থেকে ডিজিটাল কলোনিতে পরিণত হব, নাকি দূরদর্শী পলিসি ও মেধার জোরে এশিয়ার নতুন এই প্রযুক্তির সমীকরণে নিজেদের এক অপ্রতিরোধ্য অংশীদার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করব? পরিবর্তনের সেই সাহসী সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় এখনই।
Tags :

সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর এর কলাম

সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর একজন বাংলাদেশী তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ, শিক্ষা ও আইসিটি উদ্যোক্তা এবং লেখক।

https://sufifaruq.com/

সর্বশেষ খবর