জিলাইভ বাংলা | সত্যের জয় অবধারিত

কেন্দুয়ায় বিএনপি নেতার নেতৃত্বে স্কুলছাত্রীকে দলবদ্ধ ধর্ষণ, অন্তঃসত্ত্বা ভুক্তভোগী

নেত্রকোণার কেন্দুয়ায় এক স্কুলছাত্রীকে ভয়ভীতি দেখিয়ে ব্ল্যাকমেইল করে দীর্ঘ দিন ধরে দলবদ্ধ ধর্ষণের চাঞ্চল্যকর খবর সামনে এসেছে। স্থানীয় এক বিএনপি নেতার সরাসরি নেতৃত্বে এই বর্বর নির্যাতন চালানো হয়েছে বলে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। ধর্ষণের শিকার দশম শ্রেণির ওই কিশোরী বর্তমানে ছয় মাসের অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়েছে। হৃদয়বিদারক এই ঘটনায় থানায় মামলা দায়েরের পর পুলিশ এক আসামিকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হলেও ঘটনার মূল খলনায়ক স্থানীয় বিএনপি নেতা এখনো পলাতক রয়েছে।

ঘটনার প্রধান অভিযুক্ত বকুল মিয়া (৫০) কেন্দুয়া পৌর বিএনপির সহ-যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এবং ৫ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। পুলিশ জানায়, মঙ্গলবার রাতে ভুক্তভোগী কিশোরীর বাবা বাদী হয়ে বকুল মিয়াসহ পাঁচজনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাতনামা আরও কয়েকজনকে আসামি করে কেন্দুয়া থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। লিখিত অভিযোগ পাওয়ার পরপরই পুলিশ এলাকায় জোরদার অভিযান চালিয়ে মামলার দুই নম্বর আসামি আবু মিয়াকে (৩৬) গ্রেপ্তার করে। তবে ঘটনা জানাজানি হতেই মূল অভিযুক্ত বকুল মিয়া গা ঢাকা দেন।

মামলার এজাহার ও ভুক্তভোগীর পারিবারিক সূত্র থেকে জানা যায়, কৌশলে আপত্তিকর ভিডিও ধারণ করে তা ছড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে কিশোরীটিকে দীর্ঘদিন ধরে জিম্মি করে রাখা হয়েছিল। ভুক্তভোগী মেয়েটি স্থানীয় একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী। ঘটনার সূচনা হয় প্রায় চার বছর আগে, যখন সে মাত্র ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ত। ২০২২ সালের ২০ নভেম্বর বকুল মিয়া তাকে ফাঁদে ফেলে একটি নির্জন বাড়িতে নিয়ে যান এবং জোরপূর্বক নির্যাতন চালান। ওই সময় গোপনে ধর্ষণের পুরো দৃশ্য মোবাইলে ভিডিও করে রাখা হয়। পরবর্তীতে সেই ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া ও পরিবারকে প্রাণে মেরে ফেলার হুমকি দিয়ে বকুল নিয়মিত তাকে ব্ল্যাকমেইল ও শারীরিক নির্যাতন করতে থাকেন।

সময়ের সাথে সাথে নির্যাতনের মাত্রা আরও ভয়াবহ রূপ নেয়। মামলার বিবরণীতে উল্লেখ রয়েছে, ২০২৫ সালের মার্চ-এপ্রিলের দিকে বকুল মিয়ার এক নারী সহযোগী কৌশল করে ওই ছাত্রীকে একটি নির্দিষ্ট ভাড়া বাসায় নিয়ে যান। সেখানে বকুলের উপস্থিতিতে এবং সরাসরি নির্দেশে একাধিক ব্যক্তি তাকে জোরপূর্বক দলবদ্ধ ধর্ষণ করে। এরপর চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই মাস পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে মেয়েটিকে ভয় দেখিয়ে আলাদা আলাদা বাসায় নিয়ে একইভাবে অনবরত পাশবিক নির্যাতন চালানো হয়।

টানা কয়েক বছরের মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন সত্ত্বেও তীব্র ভয়ে কিশোরীটি এতদিন মুখ খুলতে সাহস পায়নি। কিন্তু গত ১ আগস্ট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার একটি ভিডিও অসৎ উদ্দেশ্যে ছড়িয়ে দেওয়া হলে বিষয়টি স্বজনদের চোখে পড়ে। ঘটনাটি নিয়ে সন্দেহ তৈরি হলে পরিবারের সদস্যরা গত ১৮ আগস্ট তাকে নিয়ে স্থানীয় একটি বেসরকারি ক্লিনিকে চিকিৎসকের কাছে যান। সেখানে বিভিন্ন পরীক্ষা ও আল্ট্রাসনোগ্রাফি করানোর পর চিকিৎসকেরা নিশ্চিত করেন যে মেয়েটি বর্তমানে ছয় মাসের অন্তঃসত্ত্বা।

চোখের জলে নিজের দুর্বিষহ অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে ভুক্তভোগী ছাত্রী জানায়, গোপন ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে বকুল ও তার ঘনিষ্ঠ সহযোগী আবু তাকে বিভিন্ন জায়গায় নিয়ে যেত এবং জোরপূর্বক অন্যদের মাধ্যমেও নির্যাতন করাত। অপরাধীদের কোনো ছাড় না দিয়ে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছে এই শিক্ষার্থী।

রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে এমন নৃশংস অপরাধের বিষয়ে কঠোর অবস্থানের কথা নিশ্চিত করেছেন কেন্দুয়া পৌর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মোয়াজ্জেম হোসেন। তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানান, এই ধরনের জঘন্য অপকর্মের খবর তারা পেয়েছেন এবং দল কোনোভাবেই কোনো অপরাধীর দায়ভার বহন করবে না। দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে অভিযুক্ত বকুল মিয়ার বিরুদ্ধে দ্রুতই কঠোর সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

কেন্দুয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. তরিকুল ইসলাম জানান, মামলা দায়েরের সাথে সাথেই তৎপরতা চালিয়ে গ্রেপ্তারকৃত আসামি আবু মিয়াকে আদালতের মাধ্যমে জেলহাজতে পাঠানো হয়েছে। ভুক্তভোগী ছাত্রীর প্রয়োজনীয় ডাক্তারি পরীক্ষা ও আইনি প্রক্রিয়া দ্রুততার সাথে সম্পন্ন করা হচ্ছে। মূল অভিযুক্ত বকুল মিয়াসহ ঘটনার সাথে জড়িত অন্য সব আসামিকে আইনের আওতায় আনতে পুলিশের একাধিক বিশেষ টিম নিরবচ্ছিন্ন অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে।

Tags :

বাংলা ডেস্ক । GLive24.com

সর্বশেষ খবর