আইনজীবীর সহকারী পরিচয়ের আড়ালে এক প্রতারক চক্র আদালতপাড়ার পবিত্র অঙ্গনকে অপরাধের আখড়ায় পরিণত করেছিল। প্রথমে ঢাকার দ্বিতীয় অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালতের এজলাস থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র মামলার নথি উধাও হয়ে যায়। ঠিক একই কায়দায় কিছু দিন পর ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট-৮ আদালত থেকেও আরেকটি মাদক মামলার নথি চুরি হয়। এই ধারাবাহিক নথি চুরির রহস্য উদঘাটন করতে গিয়ে পুলিশ থলের বিড়াল বের করে আনে। জানা যায়, আদালতের ভেতর থেকে নথি গায়েব করে কম্পিউটারের দোকানে বসে নিখুঁতভাবে জাল রায় ও ভুয়া আদেশের কপি তৈরি করত এই চক্রটি।
তদন্তে নেমে কোতোয়ালি থানা পুলিশ ক্লোজসার্কিট ক্যামেরার ফুটেজ বিশ্লেষণ করে মূল হোতাকে শনাক্ত করে। গত ২১ আগস্ট ভোর সাড়ে পাঁচটার দিকে রাজধানীর শ্যামপুরের একতা হাউজিং এলাকা থেকে আনোয়ারুল হক ওরফে রাসেলকে গ্রেপ্তার করা হয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জিজ্ঞাসাবাদে বেরিয়ে আসে লোমহর্ষক সব তথ্য। আইনজীবী আবদুস সাত্তারের চেম্বারে দীর্ঘদিন পিয়ন হিসেবে কাজ করার সুবাদে আদালতপাড়ার অলিগলি ও কাজের ধরণ সম্পর্কে ভালো ধারণা ছিল আনোয়ারুলের। চলতি বছরের মার্চে সে কাজ ছেড়ে দেয় এবং চেম্বারের মক্কেলদের ফোন নম্বর হাতিয়ে নিয়ে প্রতারণা শুরু করে।
পুলিশ ও আদালত সূত্র জানায়, খিলগাঁও থানার একটি অস্ত্র মামলায় পলাতক আসামি তানভীর আহমেদ তনয় ওরফে রাব্বী দীর্ঘদিন ধরে সৌদি আরবে অবস্থান করছেন। অন্যদিকে তার মামা রবিউল হক ভাটারা থানার একটি মাদক মামলার পলাতক আসামি। এই দুই আসামিকে সম্পূর্ণভাবে মামলা থেকে খালাস পাইয়ে দেওয়ার কথা বলে তানवीরের স্ত্রী জামিলা আক্তার ওরফে অর্পার সঙ্গে ৯০ হাজার টাকার চুক্তি করেছিল আনোয়ারুল। জামিলার মায়ের বাসায় গিয়ে সে এই টাকা হাতিয়ে নেয়। চুক্তি অনুযায়ী মামলা খালাসের ভুয়া কাগজ তৈরি করে দিলেও পরবর্তীতে আদালত থেকে সমন আসায় জামিলার মনে সন্দেহ জাগে। সেই সন্দেহ দূর করতেই আনোয়ারুল আদালত থেকে মামলার মূল নথিটিই চুরি করার दुসাহস দেখায়।
গত ২ জুলাই দুপুরে অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালতের এজলাসে প্রবেশ করে খিলগাঁও থানার অস্ত্র মামলার নথি দেখতে চায় আনোয়ারুল। আদালতের উমেদার নাজমুল হাসান তাকে নথিটি দিয়ে বিচারকের খাসকামরায় যাওয়ার সুযোগে সে নথি নিয়ে চম্পট দেয়। একই কায়দায় ৩ আগস্ট মাদক মামলার নথিও চুরি করে সে। এই চুরির ঘটনায় আদালতের সংশ্লিষ্ট কর্মচারীরা কোতোয়ালি থানায় পৃথক মামলা দায়ের করেন।
নথি চুরির এই ঘটনায় আনোয়ারুলের সহযোগী হিসেবে কম্পিউটার অপারেটর আহসান হাবীব এবং আসামি তানভীরের স্ত্রী জামিলা আক্তারকেও গ্রেপ্তার করা হয়েছে। হাবীবের কম্পিউটার থেকে বিভিন্ন মামলার অন্তত দশটি ভুয়া খালাসের রায় ও আদেশের কপি উদ্ধার করা হয়েছে। গত সোমবার জামিলা আদালতে ১৬ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। অন্যদিকে চক্রের বাকি সদস্যদের গ্রেপ্তার এবং জালিয়াতিতে ব্যবহৃত নকল সিল উদ্ধারে পুলিশি অভিযান অব্যাহত রয়েছে। আদালতপাড়ার সুরক্ষায় এমন গুরুতর অপরাধের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।









