জিলাইভ বাংলা | সত্যের জয় অবধারিত

জ্বালানিসংকট মোকাবেলায় বড় শিল্পগোষ্ঠীগুলোর নজর এখন সৌরবিদ্যুতে

দেশের শিল্প খাতের চিত্র দ্রুত বদলে যাচ্ছে। গ্যাস ও বিদ্যুতের উচ্চমূল্য এবং নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি নিশ্চিত করার তাগিদে দেশের বড় বড় শিল্পগোষ্ঠী এখন নিজ উদ্যোগেই ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে ঝুঁকছে। জ্বালানিসংকটের দীর্ঘমেয়াদি সমাধান এবং আন্তর্জাতিক বাজারে কার্বন নিঃসরণ কমানোর কঠোর চাপের মুখে দেশের শীর্ষস্থানীয় শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের কারখানায় সৌরবিদ্যুৎ প্ল্যান্ট স্থাপনে কোটি কোটি টাকা বিনিয়োগ করছে। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন বড় শিল্পকারখানার ছাদেই কয়েকশ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা তৈরি হয়েছে।
গত কয়েক বছরে দেশের জ্বালানি খাতে অস্থিরতা শুরু হওয়ায় শিল্পমালিকেরা বিকল্প শক্তির উৎসের সন্ধান করতে শুরু করেন। বিশেষ করে তৈরি পোশাক, টেক্সটাইল, সিমেন্ট, সিরামিক, ইস্পাতসহ ভারী শিল্পগুলো নিজেদের বিদ্যুৎ-চাহিদার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ মেটাতে ছাদভিত্তিক সোলার প্যানেল বসানো বাধ্যতামূলক করে তুলেছে। শিল্পসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্র জানিয়েছে, ইতোমধ্যে দেশের বিভিন্ন বড় বড় শিল্পকারখানায় ৬০০ মেগাওয়াটের বেশি সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা তৈরি হয়েছে। এর একটি বড় অংশ জুড়ে রয়েছে রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাক ও টেক্সটাইল খাত।
শীর্ষস্থানীয় শিল্পগোষ্ঠী ডিবিএল গ্রুপ তাদের বিভিন্ন তৈরি পোশাক কারখানায় ৫ দশমিক ৫ মেগাওয়াট ক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন ইউনিট স্থাপন করেছে। পাশাপাশি নতুন করে সিরামিক ও তৈরি পোশাকসহ আরও ১০টি কারখানায় ১৬ মেগাওয়াট সোলার বসানোর কাজ হাতে নিয়েছে তারা। গ্রুপটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, কারখানার ছাদে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রতি ইউনিটে খরচ পড়ছে মাত্র ৬ থেকে সাড়ে ৬ টাকা। যেখানে জাতীয় গ্রিডের বিদ্যুৎ বা অন্যান্য বাণিজ্যিক উৎসের দাম অনেক বেশি, সেখানে সোলার প্যানেল বসিয়ে দীর্ঘমেয়াদে বড় অংকের অর্থ সাশ্রয় করা সম্ভব হচ্ছে।
আরেক শীর্ষস্থানীয় শিল্পপ্রতিষ্ঠান প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ তাদের কারখানার ছাদে ১০০ মেগাওয়াটেরও বেশি সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের বিশাল পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে। তাদের প্রায় ২০টি কারখানায় ইতোমধ্যে ৩৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হচ্ছে। আকিজ বশির গ্রুপও পিছিয়ে নেই; তাদের জনতা জুট মিলস এবং আকিজ গ্লাসের কারখানায় ছাদ ও ব্যাটারি সিস্টেমের মাধ্যমে বড় পরিসরে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন করা হচ্ছে। বর্তমানে সব মিলিয়ে তাদের ছাদ থেকে প্রায় ৭৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হচ্ছে এবং আরও ২৮ মেগাওয়াট বাড়ানোর কাজ চলছে। মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ (এমজিআই) তাদের কারখানায় প্রায় সাড়ে চৌষট্টি মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন করেছে এবং ভবিষ্যতে তা আরও বাড়িয়ে ১১৫ মেগাওয়াটে উন্নীত করার পরিকল্পনা করেছে।
বিশেষজ্ঞ ও গবেষকদের মতে, বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানের বাইরে ছোট ও মাঝারি শিল্পকারখানার ছাদগুলোকেও যদি এই নেটওয়ার্কের আওতায় আনা যায়, তবে দেশের সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা আরও বহুগুণ বেড়ে যেতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক জ্বালানি গবেষণা প্রতিষ্ঠান আইইইএফএর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশের বড় শিল্পগুলোর পাশাপাশি মাঝারি ও ছোট স্থাপনাগুলো যুক্ত করলে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের মোট উৎপাদনক্ষমতা এক হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে।
তবে এই সম্ভাবনার পাশাপাশি কিছু চ্যালেঞ্জের কথাও বলছেন উদ্যোক্তারা। বিশেষ করে মাঝারি ও ছোট শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মালিকেরা বলছেন, সৌরবিদ্যুৎ প্ল্যান্ট স্থাপনের প্রাথমিক খরচ বেশ চড়া হওয়ায় ব্যাংক ঋণ পাওয়ার ক্ষেত্রে নানা জটিলতার মুখে পড়তে হয়। বাংলাদেশ ব্যাংক ও অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে সহজ শর্তে এবং কম সুদে গ্রিন ফাইন্যান্স বা ঋণ পাওয়ার সুযোগ আরও সহজ করলে দেশের অর্থনৈতিক ও জ্বালানি নিরাপত্তায় সৌরবিদ্যুৎ এক বিশাল বিপ্লব ঘটাতে পারবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
Tags :

বাংলা ডেস্ক । GLive24.com

সর্বশেষ খবর