তীব্র গ্যাস-সংকটের কারণে শিল্পকারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় দেশের বাজারে চিনি ও ভোজ্যতেলের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ উল্লেখযোগ্য হারে কমে গেছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে পাইকারি ও খুচরা বাজারে। বিশেষ করে চিনির সরবরাহ স্বাভাবিকের তুলনায় প্রায় ৭০ শতাংশ পর্যন্ত হ্রাস পাওয়ায় দাম চড়তে শুরু করেছে। একই সঙ্গে বেড়েছে প্যাকেটজাত আটার দামও, যা সাধারণ ভোক্তাদের পকেটে বাড়তি চাপ তৈরি করছে।
Table of Contents
উৎপাদন সংকটের পেছনে মূল কারণ
অপরিশোধিত চিনি পরিশোধন এবং গম থেকে আটা প্রস্তুত করার প্রক্রিয়ায় শিল্পকারখানায় নিরবচ্ছিন্ন গ্যাসের প্রয়োজন হয়। কিন্তু সাম্প্রতিক গ্যাস-সংকটের কারণে রিফাইনারিগুলো তাদের পূর্ণ শক্তিতে উৎপাদন চালাতে পারছে না। একসময় দেশের ছয়টি শিল্প গ্রুপ চিনি প্রক্রিয়াজাতের সঙ্গে যুক্ত থাকলেও বর্তমানে টিকে আছে মাত্র তিনটি—মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ, সিটি গ্রুপ এবং আবদুল মোনেম সুগার রিফাইনারি। এই তিনটির কোনো একটির উৎপাদনে বিঘ্ন ঘটলেই সারা দেশের সরবরাহব্যবস্থায় তার নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। মিল গেটে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ট্রাক দাঁড়িয়ে থেকেও চাহিদামতো পণ্য মিলছে না বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। কোনো কোনো কারখানা তাদের স্বাভাবিক সরবরাহের ২৫ শতাংশের বেশি দিতে পারছে না, আবার কয়েকটি কারখানায় উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে।
পাইকারি ও খুচরা বাজারের বর্তমান চিত্র
রাজধানী ঢাকাসহ দেশের প্রধান পাইকারি বাজারগুলোতে চিনির দাম মণপ্রতি এবং কেজিতে ঊর্ধ্বমুখী। বাংলাদেশ চিনি ব্যবসায়ী সমিতির তথ্য অনুযায়ী, সরবরাহ কমে যাওয়ায় পাইকারিতে চিনির দাম কেজিতে এক থেকে দুই টাকা বেড়েছে। অন্যদিকে রাজধানীর মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেটে খুচরা পর্যায়ে প্রতি বস্তা (৫০ কেজি) চিনিতে দাম বেড়েছে প্রায় ৫০০ টাকা। খুচরা দোকানে প্রতি কেজি খোলা চিনি ১১৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যা কয়েক দিন আগেও ১০৫ টাকা ছিল।
ঢাকার বাইরে চট্টগ্রামের অন্যতম বৃহৎ পাইকারি বাজার খাতুনগঞ্জেও একই চিত্র দেখা গেছে। সেখানে গত এক সপ্তাহে খোলা চিনির দাম মণপ্রতি ১০০ থেকে ১৫০ টাকা পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। খাতুনগঞ্জে গত সপ্তাহে যে চিনি ৩ হাজার ৬০০ টাকায় বিক্রি হতো, তা বেড়ে এখন ৩ হাজার ৭০০ থেকে ৩ হাজার ৭৫০ টাকায় ঠেকেছে। এর ফলে চট্টগ্রামের বিভিন্ন খুচরা বাজারেও খোলা চিনি কেজিতে ৫ থেকে ৭ টাকা পর্যন্ত বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। চিনির পাশাপাশি প্যাকেজজাত আটার বাজারেও দামের ঊর্ধ্বগতি লক্ষ করা গেছে। বর্তমানে দুই কেজির আটার প্যাকেট ১১৫ থেকে ১২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যা আগে ১০০ থেকে ১০৫ টাকার মধ্যে পাওয়া যেত।
ভোজ্যতেলের পরিস্থিতি ও অন্যান্য পণ্যের প্রভাব
চিনির বাজারে অস্থিরতা দেখা দিলেও সয়াবিন তেলের সরবরাহ ও দাম তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল রয়েছে। বাজারে তেলের পর্যাপ্ত মজুত থাকায় সয়াবিনের দামে এখনো বড় কোনো প্রভাব পড়েনি। তবে আন্তর্জাতিক বাজার ও স্থানীয় সরবরাহ কিছুটা কমে যাওয়ায় পাম তেলের দাম প্রতি মণে ৩০ থেকে ৫০ টাকা পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। পাইকারি ব্যবসায়ীরা আশা করছেন, গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক হলে অচিরেই এই সংকট কাটবে এবং বাজার আবার আগের অবস্থায় ফিরে আসবে।
নিত্যপণ্যের বাজার পরিস্থিতির একটি সংক্ষিপ্ত বিবরণ
| বাজারের নাম | পণ্যের ধরন | পূর্বের মূল্য | বর্তমান মূল্য | দাম পরিবর্তনের হার / পরিমাণ |
| মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেট (ঢাকা) | খোলা চিনি (প্রতি কেজি) | ১০৫ টাকা | ১১৫ টাকা | কেজিতে ১০ টাকা বৃদ্ধি |
| মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেট (ঢাকা) | প্যাকেটজাত আটা (২ কেজি) | ১০০-১০৫ টাকা | ১১৫-১২০ টাকা | প্যাকেজে ১৫ টাকা বৃদ্ধি |
| খাতুনগঞ্জ পাইকারি বাজার (চট্টগ্রাম) | খোলা চিনি (প্রতি মণ) | ৩,৬০০ টাকা | ৩,৭০০-৩,৭৫০ টাকা | মণে ১০০-১৫0 টাকা বৃদ্ধি |
| চট্টগ্রামের খুচরা বাজার | খোলা চিনি (প্রতি কেজি) | ১০০-১০৫ টাকা | ১১0 টাকা | কেজিতে ৫-৭ টাকা বৃদ্ধি |
| পাইকারি বাজার (পাম তেল) | পাম তেল (প্রতি মণ) | পূর্বের নির্ধারিত হার | ৩০-৫০ টাকা বেশি | মণে ৩০-৫০ টাকা বৃদ্ধি |
| সয়াবিন তেল বাজার | সয়াবিন তেল (খুচরা ও পাইকারি) | স্থিতিশীল মজুত | স্থিতিশীল | দামে এখনো কোনো পরিবর্তন নেই |
| আটা ও ময়দার সরবরাহ | পাইকারি গুদাম ও বাজার | পর্যাপ্ত মজুত | পর্যাপ্ত | দামে বড় কোনো প্রভাব পড়েনি |
| চিনি পরিশোধন কারখানা | উৎপাদন সক্ষমতা | স্বাভাবিক মাত্রা | ৩০ শতাংশে নেমেছে | প্রায় ৭০ শতাংশ সরবরাহ ঘাটতি |
| সক্রিয় চিনি রিফাইনারি | শিল্প গ্রুপ সংখ্যা | পূর্বে ৬টি গ্রুপ | বর্তমানে ৩টি গ্রুপ | মেঘনা, সিটি ও আবদুল মোনেম সচল |
| চিনির বস্তা (খুচরা) | ৫০ কেজি বস্তা (ঢাকা) | আগের তুলনায় কম | ৫০০ টাকা বেশি | বস্তাপ্রতি ৫০০ টাকা বৃদ্ধি |
শিল্পকারখানায় গ্যাস সরবরাহ দ্রুত স্বাভাবিক না হলে নিত্যপ্রয়োজনীয় এসব পণ্যের দাম আরও বাড়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা। সাধারণ ভোক্তারা বলছেন, দফায় দফায় পণ্যের দাম বাড়ায় তাদের দৈনন্দিন সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।









