কিছু মানুষের চলে যাওয়া কেবল একটি জীবনের সমাপ্তি নয়; তাঁদের সঙ্গে হারিয়ে যায় একটি সময়ের প্রত্যক্ষদর্শী, একটি নির্ভীক কণ্ঠ এবং সত্যকে প্রশ্ন করার এক স্বতন্ত্র সাহস। সাংবাদিক ও কলামিস্ট বিভুরঞ্জন সরকার ছিলেন তেমনই একজন মানুষ। দীর্ঘ পাঁচ দশকের সাংবাদিকতা জীবনে তিনি বাংলাদেশের রাজনীতি, সমাজ, রাষ্ট্র ও মানুষের নানা পরিবর্তনের সাক্ষী হয়েছেন। লিখেছেন, প্রশ্ন তুলেছেন এবং নিজের অবস্থান থেকে সত্যকে তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন। তাঁর মৃত্যু তাই শুধু সাংবাদিক সমাজের জন্য নয়, দেশের গণমাধ্যম অঙ্গনের জন্যও এক বেদনাদায়ক ঘটনা।
১৯৫৪ সালের ৬ জুন পঞ্চগড়ের বোদা উপজেলায় জন্মগ্রহণ করেন বিভুরঞ্জন সরকার। কৈশোরেই সাংবাদিকতার সঙ্গে তাঁর পরিচয়। ষাটের দশকের শেষ দিকে স্কুলে পড়ার সময় দৈনিক আজাদ-এর মফস্বল সংবাদদাতা হিসেবে কাজ শুরু করেন তিনি। বয়স তখন খুব বেশি নয়, কিন্তু সংবাদ সংগ্রহ ও লেখার প্রতি তাঁর আগ্রহ ছিল প্রবল। সেই শুরু থেকে সাংবাদিকতা ধীরে ধীরে তাঁর জীবনের প্রধান পরিচয়ে পরিণত হয়।
ছাত্রজীবনে তিনি রাজনীতির সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের দিনাজপুর জেলা কমিটির সহসভাপতি এবং কেন্দ্রীয় সংসদের সহকারী সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা সাংবাদিকতার দৃষ্টিভঙ্গিকেও প্রভাবিত করেছিল। রাজনীতি তাঁর কাছে কেবল দলীয় কর্মকাণ্ডের বিষয় ছিল না; মানুষের জীবন, রাষ্ট্রের চরিত্র এবং সমাজের পরিবর্তন বোঝার একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র ছিল।
বোদা পাইলট হাই স্কুলে পড়াশোনা শেষে দিনাজপুর সরকারি কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক সম্পন্ন করে ১৯৭৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে ভর্তি হন তিনি। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়ই সাংবাদিকতাকে পেশা হিসেবে বেছে নেন। দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি সাপ্তাহিক জয়ধ্বনি, সাপ্তাহিক একতা, যায়যায়দিন, দৈনিক সংবাদ, দৈনিক রূপালীসহ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে কাজ করেন। সম্পাদনার দায়িত্বও পালন করেছেন সাপ্তাহিক চলতিপত্র, দৈনিক মাতৃভূমি ও সাপ্তাহিক মৃদুভাষণ-এ।
তাঁর সাংবাদিকতার একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় ছিল রাজনৈতিক বিশ্লেষণ। আশির দশকের মাঝামাঝি যায়যায়দিন-এ ‘তারিখ ইব্রাহিম’ ছদ্মনামে প্রকাশিত তাঁর রাজনৈতিক নিবন্ধগুলো পাঠকের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি করে। ঘটনাকে শুধু ঘটনাক্রম হিসেবে না দেখে তার পেছনের রাজনৈতিক বাস্তবতা, ক্ষমতার সম্পর্ক এবং সময়ের প্রবণতা ব্যাখ্যা করার চেষ্টা ছিল তাঁর লেখার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে তিনি নিয়মিত লিখেছেন। জীবনের শেষ পর্যায়েও তিনি সাংবাদিকতা থেকে দূরে সরে যাননি; আজকের পত্রিকা-তে জ্যেষ্ঠ সহকারী সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করার পাশাপাশি বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে কলাম লিখেছেন।
লেখালেখির পাশাপাশি বই প্রকাশেও তাঁর আগ্রহ ছিল। তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা দশের বেশি। ২০২৩ সালের অমর একুশে বইমেলায় আগামী প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত হয় ‘বঙ্গবন্ধুঃ ইতিহাসের নির্মাতা’ এবং ‘শেখ হাসিনাঃ স্বপ্ন পূরণের সফল কারিগর’। ইতিহাস, রাজনীতি ও সমকালীন বাংলাদেশের নানা বিষয় নিয়ে তাঁর লেখার বিস্তৃতি ছিল উল্লেখযোগ্য।
তাঁর সাংবাদিকতা জীবনের সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধের সময়কার ঘটনাপ্রবাহও জড়িয়ে আছে। পরবর্তী পাঁচ দশকে তিনি দেশের রাজনৈতিক উত্থান-পতন, আন্দোলন, গণআন্দোলন ও রাষ্ট্রীয় পরিবর্তনের নানা অধ্যায় প্রত্যক্ষ করেছেন। শেষ জীবনে পাঠানো একটি ‘খোলা চিঠি’তে তিনি নিজেই লিখেছিলেন, সাংবাদিকতার সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক পাঁচ দশকের বেশি সময়ের। ওই লেখাটি তিনি ২১ আগস্ট ভোরে পাঠিয়েছিলেন এবং ফুটনোটে উল্লেখ করেছিলেন, এটি তাঁর জীবনের শেষ লেখা হিসেবে প্রকাশ করা যেতে পারে।
এর পরের ঘটনাপ্রবাহ আরও বেদনাদায়ক।
২০২৫ সালের ২১ আগস্ট সকাল ১০টার দিকে ঢাকার সিদ্ধেশ্বরীর বাসা থেকে কর্মস্থলে যাওয়ার কথা বলে বের হন বিভুরঞ্জন সরকার। এরপর তাঁর সঙ্গে পরিবারের আর যোগাযোগ হয়নি। ওই রাতেই তাঁর নিখোঁজ হওয়ার বিষয়ে রমনা থানায় সাধারণ ডায়েরি করা হয়। পরদিন ২২ আগস্ট বিকেলে মুন্সীগঞ্জের গজারিয়া উপজেলার বলাকির চর এলাকার মেঘনা নদীতে ভাসমান অবস্থায় তাঁর মরদেহ উদ্ধার করে নৌ-পুলিশ। পরে পরিবারের সদস্যরা মরদেহ শনাক্ত করেন।
ঘটনার পর তাঁর মৃত্যু ঘিরে স্বাভাবিকভাবেই নানা প্রশ্ন দেখা দেয়। কীভাবে সিদ্ধেশ্বরী থেকে তাঁর যাত্রাপথ মেঘনা নদী পর্যন্ত পৌঁছাল? নদীতে তাঁর মৃত্যু কীভাবে ঘটল? এসব প্রশ্নের নিশ্চিত উত্তর তখনও পাওয়া যায়নি। ময়নাতদন্তে তাঁর শরীরের বাইরে ও ভেতরে দৃশ্যমান আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়নি বলে চিকিৎসক জানিয়েছিলেন। মৃত্যুর কারণ নিশ্চিত করতে শরীরের বিভিন্ন নমুনা ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছিল।
তাঁর মৃত্যুর আগে লেখা ‘খোলা চিঠি’ ঘটনাটিকে আরও আবেগঘন করে তোলে। সেখানে নিজের দীর্ঘ সাংবাদিকতা জীবন, ব্যক্তিগত অপূর্ণতা এবং পেশাগত সংগ্রামের কথা তুলে ধরেছিলেন তিনি। লেখাটির ভাষায় ছিল এক ধরনের আত্মসমালোচনা ও বিষণ্নতা। কিন্তু সেই লেখাকে তাঁর মৃত্যুর কারণ হিসেবে ব্যাখ্যা করার মতো কোনো নিশ্চিত প্রমাণ প্রকাশ্যে পাওয়া যায়নি। তাই তাঁর মৃত্যুকে ঘিরে প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে অনুমানের বদলে তদন্ত ও প্রামাণ্য তথ্যের ওপরই নির্ভর করা জরুরি।
বিভুরঞ্জন সরকার চলে গেছেন, কিন্তু তাঁর সাংবাদিকতার উত্তরাধিকার রয়ে গেছে। সংবাদকে কেবল ঘটনার বিবরণ হিসেবে না দেখে তার অন্তর্নিহিত অর্থ খুঁজে দেখার যে প্রবণতা তাঁর লেখায় ছিল, সেটিই তাঁকে সহকর্মী ও পাঠকদের কাছে আলাদা করে তুলেছিল। একজন সাংবাদিকের সবচেয়ে বড় সম্পদ তাঁর লেখা এবং মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি। সেই অর্থে বিভুরঞ্জন সরকারের দীর্ঘ কর্মজীবন এখনও স্মরণযোগ্য।
একজন প্রবীণ সাংবাদিকের এমন আকস্মিক ও রহস্যঘেরা মৃত্যু অনেক প্রশ্ন রেখে যায়। সময় এগিয়ে যায়, সংবাদ পুরোনো হয়ে যায়, কিন্তু সব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায় না। বিভুরঞ্জন সরকারের ক্ষেত্রেও তাঁর জীবন ও কর্মের স্মৃতির পাশাপাশি রয়ে গেছে সেই অমীমাংসিত অধ্যায়।
তাঁকে স্মরণ করার সবচেয়ে যথার্থ পথ হয়তো তাঁর লেখা, তাঁর সাংবাদিকতার সততা এবং প্রশ্ন করার সাহসকে মনে রাখা। তিনি নেই, কিন্তু তাঁর কলমের ছাপ রয়ে গেছে। বাংলাদেশের সাংবাদিকতার ইতিহাসে তাঁর দীর্ঘ পথচলা এবং রেখে যাওয়া শব্দগুলোই হয়ে থাকবে তাঁর স্থায়ী পরিচয়।
বিভুরঞ্জন সরকারকে তাই শুধু একজন প্রয়াত সাংবাদিক হিসেবে নয়, সত্যের পক্ষে লিখে যাওয়া এক প্রবীণ কলমযোদ্ধা হিসেবেই স্মরণ করা হবে। তাঁর মৃত্যুতে যে শূন্যতা তৈরি হয়েছে, তা পূরণ হওয়ার নয়। আর তাঁর শেষ অধ্যায় যে প্রশ্নগুলো রেখে গেছে, সেগুলোর উত্তর খুঁজে পাওয়া ভবিষ্যতের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হয়ে থাকবে।
বিনম্র শ্রদ্ধা বিভুরঞ্জন সরকারের স্মৃতির প্রতি।









