জিলাইভ [ GLive ] | truth alone triumphs

গ্যাস সংকটে আশুলিয়ার কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত

তীব্র গ্যাসসংকটে সাভার-আশুলিয়া শিল্পাঞ্চলের গ্যাসনির্ভর কয়েকটি কারখানায় উৎপাদন কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। কোথাও উৎপাদন কমে গেছে ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত, কোথাও দিনের পর দিন পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে কারখানা। এতে বাড়ছে উৎপাদন ব্যয় ও আর্থিক ক্ষতি। পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে শ্রমিক ছাঁটাইয়ের আশঙ্কার কথাও জানিয়েছেন কয়েকজন শিল্পোদ্যোক্তা।

আশুলিয়ার কাঠগড়া আমতলা এলাকায় ফ্যাশন গ্লোব গ্রুপের কারখানা এ আর ওয়েট প্রসেসিং লিমিটেডে কয়েক সপ্তাহ ধরে কম সক্ষমতায় উৎপাদন চলার পর গতকাল সকালে কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। এর আগের রাত পর্যন্ত কারখানাটিতে উৎপাদন চললেও বৃহস্পতিবার সকালে গিয়ে দেখা যায়, তিনটি বিভাগের সব কার্যক্রম বন্ধ। কারখানা প্রাঙ্গণে নিরাপত্তাকর্মী ও কয়েকজন কর্মকর্তা থাকলেও কোনো শ্রমিককে দেখা যায়নি।

কারখানার কর্মকর্তারা জানান, গ্যাসসংকট শুরুর পর উৎপাদন প্রায় ৭৫ শতাংশ কমে গেছে। দৈনিক ৫০ হাজার পিস উৎপাদনের সক্ষমতা থাকলেও বাইরে থেকে গ্যাস এনে সর্বোচ্চ ২০ হাজার পিস পর্যন্ত উৎপাদন করা সম্ভব হয়েছে। এরপরও কারখানার একটি অংশ বন্ধ রাখতে হয়েছে।

ড্রাই প্রসেস, ওয়াশিং ও ফিনিশিং কোয়ালিটি বিভাগে থাকা ৮০ থেকে ৯০টি যন্ত্রের মধ্যে ২৪টি বন্ধ রয়েছে। পরিদর্শনের সময় গ্যাসের মিটারে চাপ পাওয়া যায় ২ দশমিক ৫ পিএসআই। কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, কারখানার স্বাভাবিক উৎপাদনের জন্য প্রায় ১০ পিএসআই চাপ প্রয়োজন। অথচ গ্যাসের চাপ কখনো শূন্যে নেমে যাচ্ছে, আবার কখনো সর্বোচ্চ ২ দশমিক ৫ পিএসআই পর্যন্ত উঠছে। এমনকি চাপ কিছুটা বাড়লেও গ্যাসের মান খারাপ থাকায় উৎপাদনে তা কার্যকরভাবে ব্যবহার করা যাচ্ছে না।

ফ্যাশন গ্লোব গ্রুপের কোম্পানি সচিব আরএকে লিটন বলেন, গ্যাসসংকটের কারণে তাঁদের ওয়াশিং কারখানার উৎপাদন ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে বাইরে থেকে গ্যাস এনে ব্যবহার করেও সমস্যার সমাধান হচ্ছে না। এতে প্রতি ঘণ্টায় অতিরিক্ত প্রায় ৩০ হাজার টাকা ব্যয় হচ্ছে। তাঁর দাবি, দিনের প্রায় অর্ধেক সময় গ্যাসের চাপ শূন্য থাকে।

আশুলিয়ার আরেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান পাকিজা গ্রুপের একটি বস্ত্র কারখানাও গ্যাসসংকটে প্রায় ১৫ দিন ধরে বন্ধ রয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রতিষ্ঠানের এক কর্মকর্তা। নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই কর্মকর্তা বলেন, উৎপাদন বন্ধ থাকায় প্রতিদিন প্রায় এক কোটি টাকা লোকসান হচ্ছে। বৃহস্পতিবার সকালে কয়েকজন শ্রমিক কারখানার ফটকে এলেও তাঁদের ভেতরে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি। নিরাপত্তাকর্মীরাও নিশ্চিত করেন, কারখানার ভেতরে তখন কোনো শ্রমিক ছিলেন না।

রিং শাইন টেক্সটাইল লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক অনিরুদ্ধ পিয়াল জানান, তাঁদের রং করার কারখানাটি কাগজে-কলমে চালু থাকলেও গ্যাসের পর্যাপ্ত চাপ না থাকায় কার্যত উৎপাদন হচ্ছে না। কারখানাটির দৈনিক উৎপাদন সক্ষমতা ৯০ টন হলেও বর্তমানে দুই টনও উৎপাদন করা সম্ভব হচ্ছে না।

গ্যাসের চাপ কিছুটা বাড়লে কারখানার সব যন্ত্র চালু করা হলেও অল্প সময়ের মধ্যেই আবার চাপ কমে যায় বলে জানান তিনি। এতে উৎপাদনের প্রতিটি ধাপ ব্যাহত হচ্ছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, প্রতিটি উৎপাদন চালানে আট থেকে ১০ কোটি টাকা মূল্যের পণ্য থাকে। মাঝপথে গ্যাস চলে গেলে সেই উৎপাদন প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হয় এবং ক্ষতির পরিমাণও বেড়ে যায়।

রিং শাইন টেক্সটাইলে প্রায় ৯৭৫ জন শ্রমিক কর্মরত। উৎপাদন বন্ধ থাকলেও তাঁদের বেতন পরিশোধের দায় প্রতিষ্ঠানটির ওপর রয়েছে। ঢাকা রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলের আওতাধীন কারখানা হিসেবে প্রতি মাসের ১০ তারিখের মধ্যে শ্রমিকদের বেতন দেওয়ার বাধ্যবাধকতাও রয়েছে।

গ্যাসের ঘাটতি মোকাবিলায় বিকল্প জ্বালানির ওপর নির্ভর করছে জামগড়ার লিটল স্টার স্পিনিং মিল। প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান খোরশেদ আলম বলেন, একাধিক জ্বালানি উৎস ব্যবহার করেও মিলটি মোট সক্ষমতার ৪০ শতাংশ উৎপাদন ধরে রাখতে হিমশিম খাচ্ছে। গ্যাস দিয়ে কোনো উৎপাদন করা যাচ্ছে না। বিদ্যুৎ ব্যবহার করে প্রায় ২৫ শতাংশ এবং সৌরবিদ্যুৎ ও ব্যাটারির মাধ্যমে বাকি উৎপাদন চালানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।

বিকল্প জ্বালানি ব্যবহারের কারণে মিলটির উৎপাদন ব্যয়ও বেড়েছে। চেয়ারম্যানের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, উৎপাদন ব্যয় প্রায় ১২ শতাংশ বেড়েছে এবং প্রতি পাউন্ড সুতা উৎপাদনে অতিরিক্ত ১৪ থেকে ১৫ টাকা খরচ হচ্ছে। অন্যদিকে গ্যাসের চাপ সর্বোচ্চ ১ থেকে ১ দশমিক ৫ পিএসআই পর্যন্ত উঠছে, যা কারখানার নিজস্ব বিদ্যুৎ উৎপাদনযন্ত্র চালানোর জন্যও পর্যাপ্ত নয়।

পরিস্থিতি সামাল দিতে মিলটিতে তিন পালায় উৎপাদন সীমিত করে চালানো হচ্ছে। ছয়টি বিভাগের মধ্যে মাত্র দুটি চালু রাখা হয়েছে। শ্রমিকদের বেতন পরিশোধের জন্য লোকসানেও সুতা বিক্রি করতে হয়েছে বলে জানান খোরশেদ আলম। তাঁর আশঙ্কা, গ্যাসসংকট অব্যাহত থাকলে অন্তত ৩০ শতাংশ জনবল কমানোর সিদ্ধান্ত নিতে হতে পারে।

তবে শিল্পাঞ্চলের কারখানা বন্ধের বিষয়ে ভিন্ন তথ্য দিয়েছে শিল্প পুলিশ। শিল্প পুলিশ-১-এর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মমিনুল ইসলাম ভূঁইয়া বলেন, গ্যাসসংকটের কারণে আশুলিয়া অঞ্চলের কোনো কারখানা বন্ধ হওয়ার তথ্য তাঁদের কাছে নেই। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, মুন্নু সিরামিকস এক বা দুই দিন বন্ধ ছিল। প্রীতি অ্যাপারেলসসহ আরও একটি কারখানাও একই সময়ে সমস্যায় পড়েছিল। গ্যাসের চাপ স্বাভাবিক থাকলে এসব কারখানায় আবার সমস্যা থাকে না বলেও জানান তিনি।

ফলে আশুলিয়ার শিল্পাঞ্চলে গ্যাসসংকটের প্রভাব নিয়ে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর দেওয়া তথ্য এবং শিল্প পুলিশের কাছে থাকা তথ্যের মধ্যে পার্থক্য দেখা যাচ্ছে। তবে কারখানা কর্তৃপক্ষগুলোর বক্তব্যে উৎপাদন ব্যাহত হওয়া, বিকল্প জ্বালানিতে অতিরিক্ত ব্যয় এবং শ্রমিকদের বেতন পরিশোধের চাপ—এই তিনটি বিষয় স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে। গ্যাস সরবরাহের চাপ অনিয়মিত থাকায় উৎপাদন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে না পারা এবং চলমান উৎপাদন প্রক্রিয়া বারবার থেমে যাওয়ায় শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক চাপও বাড়ছে।

Tags :

বাংলা ডেস্ক । GLive24.com

সর্বশেষ খবর