আট বছর ধরে আটকে থাকা বহুল কাঙ্ক্ষিত বগুড়া-সিরাজগঞ্জ সরাসরি রেলপথ নির্মাণ প্রকল্পের নির্মাণকাজ শুরু হওয়ার আগেই খরচ বেড়ে দ্বিগুণেরও বেশি হয়ে গেছে। ২০১৮ সালে অনুমোদিত ৫ হাজার ৫৭ ৯ কোটি ৭০ লাখ টাকার এই প্রকল্পটির বর্তমান প্রাক্কলিত ব্যয় দাঁড়িয়েছে ১২ হাজার ৪৪২ কোটি ৫৫ লাখ টাকায়। ফলে মূল বরাদ্দের তুলনায় খরচ বেড়েছে ৬ হাজার ৮৬২ কোটি ৮৫ লাখ টাকা, যা প্রায় ১২৩ শতাংশের এক বিশাল লাফ। সময়মতো কাজ শুরু না হওয়া, বৈশ্বিক ও দেশীয় বাজারের অস্থিতিশীলতা এবং অর্থায়ন কাঠামোর বড় পরিবর্তনে দীর্ঘসূত্রতায় পড়েছে সিরাজগঞ্জ ও বগুড়াবাসীর সরাসরি রেল যোগাযোগের স্বপ্ন।
প্রকল্পের প্রাথমিক পরিকল্পনা ছিল আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ভারতীয় নমনীয় ঋণে এটি বাস্তবায়ন করার। ২০১৮ সালের অনুমোদিত প্রস্তাবে ভারতীয় ঋণের পরিমাণ ছিল ৩ হাজার ১৪৬ কোটি ৫৯ লাখ টাকা, যা ছিল মূল বাজেটের প্রায় ৫৬ শতাংশ। কিন্তু ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর এই অর্থায়ন পথ আটকে যায় এবং ২০২৫ সালের মার্চে অন্তর্বর্তী সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে ভারতীয় ঋণ বাতিল করে। পরবর্তীতে এশিয়ার অবকাঠামো উন্নয়ন ব্যাংক (এআইআইবি)-এর অর্থায়নে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ঋণদাতা সংস্থা পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে প্রকল্পের কারিগরি ও পরামর্শক ব্যয় বহুগুণ বেড়ে গেছে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী নকশা পুনর্মূল্যায়ন ও তদারকির জন্য আগের ৬৮ কোটি ৪০ লাখ টাকার পরামর্শক ব্যয় লাফিয়ে হয়েছে ২৩১ কোটি ৭১ লাখ টাকা—যা এক খাতেই ১৬৩ কোটি ৩১ লাখ টাকা বা প্রায় ২৪০ শতাংশ বৃদ্ধি।
ব্যয় বৃদ্ধির এই রেকর্ড শুধু অর্থায়ন পরিবর্তনের ওপর চাপানো যাচ্ছে না। দীর্ঘ আট বছর ধরে প্রকল্পের মূল কাজ ঝুলিয়ে রাখার ফলে সামগ্রিক অর্থনীতিতেই বড় ধাক্কা পড়েছে। ২০১৮ সালের বিশ্ববাজার ও ডলারের বিনিময় হার বর্তমানে আর প্রযোজ্য নয়। নির্মাণসামগ্রী—বিশেষ করে রড ও সিমেন্টের দাম আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। ডলারের মানের বড় ধরনের অবমূল্যায়নও এই ব্যয় বাড়িয়ে তোলার পেছনে অন্যতম বড় চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করেছে।
জমি অধিগ্রহণের ক্ষেত্রে ফুটে উঠেছে এক অদ্ভুত পরিসংখ্যান। চূড়ান্ত নকশা প্রণয়নের পর দেখা যায় প্রকল্পের জন্য নির্ধারিত জমি কমে দাঁড়িয়েছে ৯০১ দশমিক ৭৭ একরে, যা প্রাথমিক ৯৬০ একরের চেয়ে কম। তবে জমির পরিমাণ কমলেও সিরাজগঞ্জ ও বগুড়া জেলা প্রশাসনের সাম্প্রতিক চূড়ান্ত মূল্যায়নে জমি অধিগ্রহণ খরচ ১ হাজার ৯২১ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ২ হাজার ২৪৪ কোটি ১৬ লাখ টাকা ধরা হয়েছে। অর্থাৎ জমি কম লেগেও প্রশাসনিক মূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে শুধু ভূমি অধিগ্রহণেই বাড়তি ৩২৩ কোটি ১৬ লাখ টাকা খরচ হচ্ছে।
অর্থনৈতিক চাপ ছাড়াও সম্প্রতি রুট পরিবর্তন ঘিরে তৈরি হয়েছিল নতুন অনিশ্চয়তা। বগুড়া শহরের ভেতর দিয়ে লাইন না নিয়ে রানীরহাট জংশন হয়ে গাবতলী পর্যন্ত ১৫ কিলোমিটার নতুন ট্র্যাকিং তৈরির একটি বিকল্প প্রস্তাব তোলা হয়েছিল। এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে গেলে বাড়তি ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকার ভূমি অধিগ্রহণ, ওভারপাস ও আন্ডারপাস নির্মাণের প্রয়োজন হতো। তবে গত ১৬ জুন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নিকট বিষয়টি উপস্থাপন করা হলে তিনি জনস্বার্থ বিবেচনা করে মূল নকশাতেই প্রকল্প বাস্তবায়নের কড়া নির্দেশ দেন। রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. ফাহিমুল ইসলাম পরে নিশ্চিত করেন যে, রুটে কোনো নতুন পরিবর্তন আসছে না এবং এই বাড়তি খরচের হিসাব মূল বাজেটে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।
বগুড়া-সিরাজগঞ্জ রেলপথ প্রকল্পের মূল পরিবর্তন ও খরচের চিত্র
| প্রকল্প খাত / বিবরণ | মূল বাজেট (২০১৮) | সংশোধিত প্রস্তাব (২০২৬) | তারতম্য / বৃদ্ধির পরিমাণ |
| মোট প্রকল্প ব্যয় | ৫,৫৭৯.৭০ কোটি টাকা | ১২,৪৪২.৫৫ কোটি টাকা | +৬,৮৬২.৮৫ কোটি টাকা (১২৩%) |
| মূল অর্থায়ন উৎস | ভারতীয় ঋণ (৩,১৪৬.৫৯ কোটি) | এআইআইবি (AIIB) অর্থায়ন | ঋণদাতা সংস্থায় পরিবর্তন |
| প্রকল্পের প্রাথমিক ও বর্তমান মেয়ার | জুন ২০২৩ (বর্ধিত জুন ২০২৬) | জুন ২০৩১ (প্রস্তাবিত) | দীর্ঘ ৮ বছর ধরে মূল কাজ বন্ধ |
| ভূমি অধিগ্রহণের পরিমাণ | ৯৬০ একর | ৯০১.৭৭ একর | -৫৮.২৩ একর (জমি কমেছে) |
| ভূমি অধিগ্রহণ বাবদ খরচ | ১,৯২১.০০ কোটি টাকা | ২,২৪৪.১৬ কোটি টাকা | +৩২৩.১৬ কোটি টাকা |
| পরামর্শক ও কারিগরি সেবা ব্যয় | ৬৮.৪০ কোটি টাকা | ২৩১.৭১ কোটি টাকা | +১৬৩.৩১ কোটি টাকা (২৪০%) |
| নতুন ডুয়েলগেজ লাইন দৈর্ঘ্য | প্রায় ৮৭ কিলোমিটার | ৮৭ কিলোমিটার | পরিবর্তন হয়নি |
| গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো | নদী সেতু, ওভারপাস ও জংশন | ২২১টি সেতু ও নতুন জংশন | একই বিদ্যমান নকশা |
| প্রস্তাবিত রুট পরিবর্তন | গাবতলী বাইপাস (১,৫০০ কোটি) | বাতিলকৃত | মূল পরিকল্পনা বহাল |
| টেন্ডার ও নির্মাণ শুরু | অমীমাংসিত | ডিপিপি পাসের পর ৯ মাস | দীর্ঘায়িত কার্যসূচি |
ভূমি অধিগ্রহণের অর্থ ইতিমধ্যে দুই জেলার প্রশাসকদের হাতে হস্তান্তর করা হয়েছে। নতুন প্রস্তাবনায় প্রকল্পের মেয়াদ ২০৩১ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত বাড়ানোর তোড়জোর চলছে। সংশোধিত ডিপিপি অনুমোদন পাওয়ার পর দরপত্র আহ্বান ও ঠিকাদার চূড়ান্ত করে কাজ শুরু করতেই আরও প্রায় ৯ মাস লেগে যাবে বলে জানান প্রকল্প পরিচালক আবু জাফর মিঞা।
বর্তমানে বগুড়া থেকে ট্রেনে সিরাজগঞ্জ বা ঢাকায় যেতে দীর্ঘ পথ ঘুরে আসতে হয়, যা সময় ও জ্বালানি দুটোরই বড় অপচয়। ৮৭ কিলোমিটারের এই নতুন ডুয়েলগেজ লাইন তৈরি হলে দেশের উত্তর-পশ্চিম অংশের সঙ্গে রাজধানী ঢাকার দূরত্ব বহু কিলোমিটার কমে আসবে। তবে বড় প্রশ্ন হলো—আট বছরে যে প্রকল্পের খরচ ১২৩ শতাংশ বেড়ে দ্বিগুণ হলো, তা নির্ধারিত ২০৩১ সালের মধ্যে নতুন কোনো মেয়াদ বা ব্যয় বৃদ্ধি ছাড়াই শেষ করা সম্ভব হবে কি না।









