খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ১১ই আগস্ট ২০২৬, ৩:১১ পিএম

লোডশেডিংয়ের ভোগান্তির মধ্যেই একের পর এক ট্রান্সফরমার চুরির ঘটনায় ফেনীর বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা নতুন করে চাপে পড়েছে। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ১০ আগস্ট পর্যন্ত জেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে অন্তত ১০০টি ট্রান্সফরমার চুরি হয়েছে। এর মধ্যে ফেনী সদর ও ছাগলনাইয়া উপজেলাতেই চুরি হয়েছে ৯৪টি। ফলে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার পাশাপাশি নতুন ট্রান্সফরমার স্থাপনে সময় লাগায় অনেক গ্রাহককে দিনের পর দিন বিদ্যুৎহীন অবস্থায় থাকতে হচ্ছে।
ফেনী পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির এজিএম (প্রশাসন) আবদুল আউয়ালের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারি থেকে ১০ আগস্ট পর্যন্ত ফেনী সদর উপজেলায় ৫৮টি এবং ছাগলনাইয়ায় ৩৬টি ট্রান্সফরমার চুরি হয়েছে। এ ছাড়া পরশুরামে তিনটি, সোনাগাজীতে দুটি এবং দাগনভূঞায় একটি ট্রান্সফরমার চুরির ঘটনা ঘটেছে। ফুলগাজীতে এ সময়ে কোনো ট্রান্সফরমার চুরির খবর পাওয়া যায়নি।
চুরির ঘটনাগুলোতে সাধারণত গভীর রাতকে বেছে নেয় দুর্বৃত্তরা। সংশ্লিষ্টদের ধারণা, সংঘবদ্ধ চক্র বৈদ্যুতিক খুঁটি থেকে ট্রান্সফরমার খুলে নিয়ে যাওয়ার পর সেগুলো ভেঙে ভেতরের মূল্যবান কয়েল ও তামার তার সংগ্রহ করে। ফলে চুরির পর যন্ত্রটি হারানোর পাশাপাশি একটি নির্দিষ্ট এলাকার বিদ্যুৎ সরবরাহও বন্ধ হয়ে যায়। নতুন ট্রান্সফরমার সংগ্রহ, অর্থের ব্যবস্থা এবং স্থাপনের প্রক্রিয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত গ্রাহকদের বিদ্যুৎবিহীন থাকতে হয়।
আগস্টের তীব্র গরমে এই সমস্যা আরও কষ্টকর হয়ে উঠেছে। বিদ্যুৎ না থাকায় ঘরবাড়ির স্বাভাবিক কাজ ব্যাহত হচ্ছে। শিশু, বয়স্ক ও সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনেও এর প্রভাব পড়ছে। একই সঙ্গে বিদ্যুৎনির্ভর দোকানপাট, ক্ষুদ্র ব্যবসা ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানেও উৎপাদন এবং বেচাকেনা ব্যাহত হচ্ছে।
সম্প্রতি উত্তর কুহুমা গ্রামের একটি মসজিদের ২৫ কেভিএ ক্ষমতার ট্রান্সফরমার চুরি হওয়ার পর স্থানীয় ৬৩টি পরিবার বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়ে। স্থানীয় বাসিন্দা ইসমাইল মিথুন জানান, নতুন ট্রান্সফরমার স্থাপনের জন্য গ্রাহকদের পক্ষ থেকে বিদ্যুৎ অফিসে ৮১ হাজার টাকা জমা দেওয়া হয়। পরে ১০ আগস্ট বিকেলে সেখানে বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক হয়। ঘটনাটি দেখিয়ে দেয়, একটি ট্রান্সফরমার চুরি হলেও এর প্রভাব একাধিক পরিবার ও একটি পুরো এলাকার ওপর পড়ে।
ট্রান্সফরমার চুরির প্রভাব বাণিজ্যিক ও শিল্প গ্রাহকদের ক্ষেত্রেও কম নয়। শিল্প মিটারের গ্রাহক আলাউদ্দিন বলেন, চুরি হওয়া ট্রান্সফরমারের পরিবর্তে নতুন যন্ত্র স্থাপন না হওয়া পর্যন্ত উৎপাদন ও বেচাকেনা ব্যাহত হয়। বিশেষ করে পচনশীল পণ্য নিয়ে ব্যবসা করা প্রতিষ্ঠানগুলো দ্রুত ক্ষতির মুখে পড়ে। পোল্ট্রি ব্যবসার ক্ষেত্রেও বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্নতার কারণে ক্ষতির মাত্রা বাড়তে পারে।
ট্রান্সফরমার প্রতিস্থাপনের ব্যয় নিয়েও গ্রাহকদের মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে। ফেনী পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির জিএম মুহাম্মদ নুরুল হোসাইন জানান, প্রচলিত নীতিমালা অনুযায়ী কোনো গ্রাহকের ট্রান্সফরমার প্রথমবার চুরি হলে নতুন ট্রান্সফরমারের মূল্যের অর্ধেক গ্রাহককে বহন করতে হয়। একই গ্রাহকের ক্ষেত্রে দ্বিতীয়বার চুরি হলে নতুন ট্রান্সফরমারের পুরো মূল্য পরিশোধের দায়িত্ব গ্রাহকের ওপর পড়ে। ফলে চুরির কারণে বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হওয়ার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট গ্রাহকের ওপর সরাসরি আর্থিক চাপও তৈরি হয়।
বিদ্যুৎ সমিতির পক্ষ থেকে প্রতিটি চুরির ঘটনায় থানায় মামলা করার কথা জানানো হয়েছে। পাশাপাশি গ্রাহকদের সতর্ক ও সচেতন করতে মাইকিং করা হচ্ছে। তবে একের পর এক চুরির ঘটনায় স্থানীয় পর্যায়ে নজরদারি আরও জোরদার করার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে রাতের বেলায় বিদ্যুৎ অবকাঠামোর নিরাপত্তা, সন্দেহজনক চলাচল সম্পর্কে দ্রুত তথ্য দেওয়া এবং ঝুঁকিপূর্ণ স্থাপনাগুলোতে বাড়তি নজরদারি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
পুলিশের পক্ষ থেকেও চক্রটির বিরুদ্ধে অভিযান চালানোর কথা জানানো হয়েছে। ফেনীর পুলিশ সুপার প্রত্যুষ কুমার মজুমদার বলেন, ট্রান্সফরমার চুরির ঘটনায় জেলার বিভিন্ন থানায় একাধিক মামলা হয়েছে। এসব মামলায় কয়েকজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে এবং চুরি হওয়া তারও উদ্ধার করা হয়েছে। তাঁর ভাষ্য, ট্রান্সফরমার চুরির সঙ্গে একটি সংঘবদ্ধ চক্র জড়িত। চক্রটির সদস্যদের শনাক্ত ও গ্রেফতারে পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
জানুয়ারি থেকে ১০ আগস্ট পর্যন্ত ট্রান্সফরমার চুরির চিত্র হলো—
| উপজেলা | চুরি হওয়া ট্রান্সফরমার |
|---|---|
| ফেনী সদর | ৫৮টি |
| ছাগলনাইয়া | ৩৬টি |
| পরশুরাম | ৩টি |
| সোনাগাজী | ২টি |
| দাগনভূঞা | ১টি |
| ফুলগাজী | ০টি |
| মোট | ১০০টি |
ফেনীর বিদ্যুৎ গ্রাহকদের জন্য পরিস্থিতি তাই দ্বিমুখী সংকটে পরিণত হয়েছে। নিয়মিত লোডশেডিংয়ের কারণে যেখানে স্বাভাবিক জীবন ও ব্যবসা ব্যাহত হচ্ছে, সেখানে ট্রান্সফরমার চুরি বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক করার প্রক্রিয়াকে আরও দীর্ঘ করছে। কোনো এলাকায় চুরি হওয়া ট্রান্সফরমার দ্রুত প্রতিস্থাপন করা না গেলে প্রতিদিনের বিদ্যুৎহীনতার সঙ্গে বাড়তে থাকে মানুষের দুর্ভোগ ও আর্থিক ক্ষতি।
ভুক্তভোগীদের দাবি, শুধু চুরির পর মামলা করলেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। চুরি প্রতিরোধে মাঠপর্যায়ে নজরদারি বাড়ানো, সন্দেহভাজন চক্রের বিরুদ্ধে কার্যকর অভিযান চালানো এবং চুরি হয়ে যাওয়া ট্রান্সফরমার দ্রুত প্রতিস্থাপনের ব্যবস্থা করা জরুরি। বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ এই সরঞ্জামগুলো নিরাপদ রাখা গেলে একদিকে গ্রাহকদের অতিরিক্ত আর্থিক চাপ কমবে, অন্যদিকে বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্নতার সময়ও উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনা সম্ভব হবে।
মন্তব্য