বাংলাদেশের আমদানি-রপ্তানি, বৈদেশিক বাণিজ্য, প্রবাসী আয়, বিদেশে পড়াশোনা ও চিকিৎসা—সব ক্ষেত্রেই বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে মার্কিন ডলারের দর বাড়া বা কমার প্রভাব পড়ে আমদানি ব্যয়, ব্যবসায়িক লেনদেন এবং বিদেশে অর্থ পাঠানোর খরচে। ফলে প্রতিদিনের মুদ্রাবাজারের দর সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে ব্যবসায়ী ও আমদানিকারকদের কাছেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর তথ্য অনুযায়ী, আন্তব্যাংক বাজারে মার্কিন ডলারের সর্বনিম্ন দর ছিল ১২২ টাকা ৭৫ পয়সা। সর্বোচ্চ দর ছিল ১২২ টাকা ৮০ পয়সা। ওই দিনের ভারিত গড় দর বা ডব্লিউএআর ছিল ১২২ টাকা ৭৬ পয়সা। একই দিনে বাংলাদেশ ব্যাংকের স্পট রেফারেন্স রেট ছিল ১২২ টাকা ৭৯৫৫ পয়সা।
সাম্প্রতিক কয়েক দিনের তুলনায় ডলারের দরে কিছুটা পরিবর্তন দেখা গেছে। ২৩ সেপ্টেম্বর আন্তব্যাংক বাজারে ডলারের সর্বনিম্ন দর ছিল ১২৩ টাকা ১৫ পয়সা এবং সর্বোচ্চ ১২৩ টাকা ২৫ পয়সা। ওই দিনের ভারিত গড় দর ছিল ১২৩ টাকা ২২ পয়সা। পাঁচ দিনের ব্যবধানে ২৮ সেপ্টেম্বর সর্বনিম্ন আন্তব্যাংক দর ৪০ পয়সা কমে ১২২ টাকা ৭৫ পয়সায় নেমেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রকাশিত ক্রস-রেটেও বিভিন্ন বৈদেশিক মুদ্রার বিপরীতে টাকার অবস্থান উঠে এসেছে। ২৮ সেপ্টেম্বর ইউরোর দর ছিল ১৩৯ টাকা ৮২ পয়সা থেকে ১৩৯ টাকা ৮৯ পয়সার মধ্যে। ব্রিটিশ পাউন্ডের দর ছিল ১৬২ টাকা ৬৬ পয়সা থেকে ১৬২ টাকা ৮০ পয়সা। অস্ট্রেলিয়ান ডলারের দর ছিল প্রায় ৮৬ টাকা ২১ পয়সা এবং কানাডিয়ান ডলারের দর ৮৬ টাকা ৭৭ পয়সার কাছাকাছি।
বিভিন্ন মুদ্রার দর
২৮ সেপ্টেম্বরের উল্লেখযোগ্য বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার নিচে দেওয়া হলো—
| মুদ্রা | বাংলাদেশি টাকায় দর |
|---|---|
| ইউএস ডলার | ১২২ টাকা ৭৫ পয়সা |
| ইউরো | ১৩৯ টাকা ৮২ পয়সা |
| পাউন্ড | ১৬২ টাকা ৬৫ পয়সা |
| কানাডিয়ান ডলার | ৮৬ টাকা ৭৭ পয়সা |
| অস্ট্রেলিয়ান ডলার | ৮৬ টাকা ২০ পয়সা |
| চায়নিজ ইয়েন | ১৮ টাকা ২৫ পয়সা |
| সিঙ্গাপুরি ডলার | ৯৬ টাকা ০৪ পয়সা |
| ভারতীয় রুপি | ১ টাকা ২৮ পয়সা |
| মালয়েশিয়ান রিঙ্গিত | ৩০ টাকা ১৬ পয়সা |
| সৌদি রিয়াল | ৩২ টাকা ৭৯ পয়সা |
| কাতারি রিয়াল | ৩৩ টাকা ৭৬ পয়সা |
| কুয়েতি দিনার | ৩৯৮ টাকা ৮৮ পয়সা |
| আরব আমিরাতের দিরহাম | ৩৩ টাকা ৫৪ পয়সা |
তবে আন্তব্যাংক বাজারের দর এবং সাধারণ গ্রাহকের জন্য ব্যাংক বা মানি এক্সচেঞ্জ প্রতিষ্ঠানের নির্ধারিত দর এক নয়। কোনো মুদ্রা কেনা বা বিক্রির ক্ষেত্রে লেনদেনের ধরন, ব্যাংকভেদে নির্ধারিত দর এবং প্রযোজ্য অন্যান্য খরচের কারণে প্রকৃত বিনিময়মূল্যে পার্থক্য হতে পারে। ফলে প্রকাশিত রেটকে সরাসরি গ্রাহকের চূড়ান্ত কেনাবেচার দর হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয়।
বাজারে চাহিদা-জোগানের প্রভাব
বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে ডলারের চাহিদা ও সরবরাহের ভারসাম্য গুরুত্বপূর্ণ। আমদানির জন্য ডলারের চাহিদা বাড়লে বাজারে চাপ তৈরি হতে পারে। বিপরীতে রপ্তানি আয় ও প্রবাসী আয় বাড়লে বৈদেশিক মুদ্রার সরবরাহ শক্তিশালী হয়। এর সঙ্গে বৈদেশিক লেনদেনের সামগ্রিক পরিস্থিতি এবং ব্যাংকগুলোর চাহিদাও বিনিময় হারে প্রভাব ফেলে।
সাম্প্রতিক সময়ে প্রবাসী আয় বৈদেশিক মুদ্রার সরবরাহে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জুলাই মাসে দেশে ২৮৫ কোটি ৮৬ লাখ ৮০ হাজার মার্কিন ডলারের প্রবাসী আয় এসেছে। একই সময়ে বৈদেশিক মুদ্রার মোট রিজার্ভ ছিল ৩৬ দশমিক ৪২ বিলিয়ন ডলার। আগস্ট শেষে রিজার্ভ বেড়ে দাঁড়ায় ৩৭ দশমিক ৩৫ বিলিয়ন ডলারে।
আইএমএফের কর্মসূচি ও বিনিময় হার
বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রাবাজারের সাম্প্রতিক পরিবর্তনের সঙ্গে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) কর্মসূচির বিষয়টিও যুক্ত। কর্মসূচির আওতায় বিনিময় হার ব্যবস্থাকে আরও বাজারভিত্তিক ও নমনীয় করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এর ফলে ডলারের দর নির্ধারণে বাজারের চাহিদা ও জোগানের ভূমিকা আগের তুলনায় বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
ডলারের বিনিময় হার আমদানিকারকদের জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কোনো আমদানিকারককে পণ্য বা কাঁচামালের মূল্য ডলারে পরিশোধ করতে হলে ডলারের দর বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে টাকায় তার ব্যয়ও বাড়তে পারে। আবার ডলারের দর তুলনামূলক স্থিতিশীল থাকলে আমদানির খরচ ও ব্যবসায়িক পরিকল্পনা করা সহজ হয়।
একইভাবে বিদেশে পড়াশোনা, চিকিৎসা বা ভ্রমণের জন্য বৈদেশিক মুদ্রা প্রয়োজন এমন ব্যক্তিদের ব্যয়ের ওপরও বিনিময় হারের প্রভাব পড়ে। রপ্তানিকারক এবং প্রবাসী আয় গ্রহণকারীদের ক্ষেত্রেও বিনিময় হারের পরিবর্তনের প্রভাব আলাদা হতে পারে।
এ কারণে প্রতিদিনের মুদ্রার দর শুধু ব্যাংকিং খাতের একটি পরিসংখ্যান নয়; এটি দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য ও ব্যক্তিগত আন্তর্জাতিক লেনদেনের সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত। তবে দিনের শুরুতে প্রকাশিত বা নির্দিষ্ট কোনো রেট পরে পরিবর্তিত হতে পারে। বড় অঙ্কের বৈদেশিক লেনদেনের ক্ষেত্রে তাই সংশ্লিষ্ট ব্যাংক বা অনুমোদিত ডিলারের কাছ থেকে সর্বশেষ প্রযোজ্য দর জেনে নেওয়া প্রয়োজন।
বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার বাজার পরিস্থিতি, চাহিদা-জোগান ও লেনদেনের ধরন অনুযায়ী পরিবর্তিত হতে পারে।








