জি- লাইভ ডেস্ক
প্রকাশ: ৩১ই জুলাই ২০২৬, ৫:৪২ পিএম

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে (রাবি) সাম্প্রতিক সংঘর্ষ, শিক্ষার্থী মারধর, পাল্টাপাল্টি অভিযোগ এবং সাংবাদিকদের সঙ্গে উত্তেজনাকর পরিস্থিতিকে কেন্দ্র করে ক্যাম্পাসজুড়ে উদ্বেগ ও আলোচনা তৈরি হয়েছে। কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার ও প্রক্টরের কার্যালয়সহ বিভিন্ন স্থানে সংঘটিত ঘটনাকে ঘিরে একদিকে যেমন মামলা হয়েছে, অন্যদিকে তদন্ত কমিটি গঠন করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। একই সঙ্গে বিভিন্ন ছাত্রসংগঠন, সাধারণ শিক্ষার্থী ও সাংবাদিক সংগঠনগুলোও পৃথকভাবে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরেছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, গত ২৭ জুলাইয়ের ঘটনাপ্রবাহে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (রাকসু) সাধারণ সম্পাদক সালাউদ্দিন আম্মার এবং তার সঙ্গে থাকা কয়েকজনের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের মারধরের অভিযোগ ওঠে। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, ওইদিন বাগ্বিতণ্ডার একপর্যায়ে তিন শিক্ষার্থী—মো. আনাস, মাহমুদুল হাসান ও হাসানের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে। অভিযোগ রয়েছে, নিরস্ত্র অবস্থায় থাকা শিক্ষার্থীদের ওপর বেলচা ও বাঁশ নিয়ে চড়াও হওয়া হয়। পরে ওই ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়।
ঘটনার পর আরও অভিযোগ ওঠে যে, মারধরের শিকার দুই শিক্ষার্থীকে উল্টো রাজনৈতিক পরিচয়ের অভিযোগে পুলিশের কাছে সোপর্দ করা হয়েছে। আনাসের বিরুদ্ধে ছাত্রলীগের কর্মী হওয়ার অভিযোগ তোলা হলেও তিনি তা অস্বীকার করেছেন। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদল এবং বামপন্থী ছাত্রসংগঠনগুলো প্রকাশ্যে নিন্দা জানিয়ে হামলাকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি তোলে। তাদের বক্তব্য, বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো শিক্ষাঙ্গনে সহিংসতা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
এদিকে আহত শিক্ষার্থী মাহমুদুল হাসানের বাবা এমএস আসাদ উজ জামান বাদী হয়ে মতিহার থানার মাধ্যমে আদালতে একটি মামলা দায়ের করেছেন। মামলায় সালাউদ্দিন আম্মারকে প্রধান আসামি করা হয়েছে। পাশাপাশি রাকসুর সহসভাপতি, সহকারী সাধারণ সম্পাদক এবং আরও কয়েকজনের নাম আসামির তালিকায় রয়েছে। মামলাটি বর্তমানে বিচারিক প্রক্রিয়ায় রয়েছে।
অন্যদিকে অভিযোগ অস্বীকার করে সালাউদ্দিন আম্মার দাবি করেছেন, তাদের ওপর প্রথমে হামলা করা হয়েছিল এবং আত্মরক্ষার্থেই তারা প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, রাকসু ভবনে তাদের লক্ষ্য করে হামলার চেষ্টা হলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে তারা পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হন। তবে এই বক্তব্যের সঙ্গে একমত নয় বিরোধী ছাত্রসংগঠনগুলো। বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের সভাপতি সুলতান আহমেদ রাহী দাবি করেন, ব্যক্তিগত বিরোধকে রাজনৈতিক রূপ দিয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালানো হয়েছে এবং রাজনৈতিক পরিচয়ের অভিযোগ ব্যবহার করে পরিস্থিতি ভিন্ন খাতে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে।
ঘটনার পর আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনও নতুন বিতর্কের জন্ম দেয়। সেখানে রাকসুর সহসভাপতি ও ছাত্রশিবিরের সাবেক নেতা মোস্তাকুর রহমান জাহিদ সাংবাদিকদের সংবাদ পরিবেশন নিয়ে কঠোর সমালোচনা করেন। তিনি অভিযোগ করেন, বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম একপেশেভাবে ঘটনা প্রকাশ করেছে এবং সাংবাদিকদের আচরণ নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। তার বক্তব্যে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ইঙ্গিত থাকায় বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত সাংবাদিকদের সংগঠনগুলো তীব্র প্রতিবাদ জানায়। পরে তারা রাকসুর সংবাদ কার্যক্রম বয়কটের ঘোষণা দেয়।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন জানিয়েছে, ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটনের চেষ্টা চলছে। প্রক্টর অধ্যাপক ড. মাহবুবুর রহমান বলেন, ক্যাম্পাসে স্বাভাবিক পরিবেশ বজায় রাখতে প্রশাসন প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিচ্ছে। দফায় দফায় সংঘর্ষ ও হামলার অভিযোগ তদন্তে পাঁচ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিকে ১০ কর্মদিবসের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এদিকে গণতান্ত্রিক ছাত্র জোট কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারে শিক্ষার্থী মারধরের ঘটনাকে ‘মব ভায়োলেন্স’ হিসেবে উল্লেখ করে পাঁচ দফা দাবি জানিয়েছে। উপ-উপাচার্যের কাছে দেওয়া স্মারকলিপিতে তারা অভিযুক্তদের বিচারের আওতায় আনা, রাকসু ভবন ও বাম ছাত্রজোটের কর্মসূচিতে হামলার তদন্ত, জুলাই-পরবর্তী অমীমাংসিত ঘটনাগুলোর দ্রুত নিষ্পত্তি এবং প্রক্টরিয়াল বডির জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার দাবি তোলে। সংগঠনটির নেতারা বলেন, শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধিত্বকারী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ বিশ্ববিদ্যালয়ের গণতান্ত্রিক পরিবেশের জন্য উদ্বেগজনক।
একই সময়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের উদ্যোগে কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে গণস্বাক্ষর কর্মসূচিও শুরু হয়েছে। ‘রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীবৃন্দ’ ব্যানারে পরিচালিত এই কর্মসূচির মাধ্যমে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে দ্রুত ও নিরপেক্ষ বিচার নিশ্চিত করার দাবি জানানো হচ্ছে। কর্মসূচিটি কয়েকদিন ধরে চলার কথা রয়েছে।
এদিকে সালাউদ্দিন আম্মারকে ঘিরে অতীতের কয়েকটি বিতর্কও নতুন করে আলোচনায় এসেছে। বিভিন্ন সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের সঙ্গে উত্তেজনাকর আচরণ এবং আন্দোলনকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষের অভিযোগে তার নাম আলোচিত হয়েছে। যদিও এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষের ভিন্নমতও রয়েছে।
সাম্প্রতিক ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বিক পরিস্থিতি এখন প্রশাসনের নিবিড় পর্যবেক্ষণে রয়েছে। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন, চলমান মামলার অগ্রগতি এবং প্রশাসনের পরবর্তী পদক্ষেপের ওপর নির্ভর করবে এ ঘটনার আনুষ্ঠানিক পরিণতি। একই সঙ্গে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকসহ বিভিন্ন মহলের প্রত্যাশা, ক্যাম্পাসে আইনশৃঙ্খলা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং শিক্ষার স্বাভাবিক পরিবেশ দ্রুত পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হবে।
মন্তব্য