খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ২২ই জুলাই ২০২৬, ৮:২৪ পিএম

ময়মনসিংহে চলতি জুলাই মাসে ডেঙ্গুর প্রকোপ দ্রুত বেড়েছে। ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে বছরের প্রথম ছয় মাসে ১২৬ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হলেও জুলাইয়ের প্রথম ২২ দিনেই ভর্তি হয়েছেন ২২০ জন। হাসপাতাল সূত্র বলছে, চলতি বছর এখন পর্যন্ত মোট ৩৪৬ জন ডেঙ্গু রোগী সেখানে চিকিৎসা নিয়েছেন। তাঁদের বড় একটি অংশ ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশন এলাকার বাসিন্দা হলেও জেলার বিভিন্ন উপজেলা এবং আশপাশের জেলার রোগীরাও এই হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসছেন।
চলতি বছর ডেঙ্গুতে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ফেব্রুয়ারিতে একজন, জুনে তিনজন এবং জুলাইয়ে একজন মারা গেছেন। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে রোগীর সংখ্যা বাড়তে থাকায় পরিস্থিতি সামাল দিতে আলাদা ডেঙ্গু ওয়ার্ড চালু করা হয়েছে।
হাসপাতাল সূত্র জানায়, প্রতিবছর সাধারণত জুলাই থেকে নভেম্বর পর্যন্ত ডেঙ্গুর সংক্রমণ বাড়তে দেখা যায়। বছরের মোট আক্রান্তের বড় অংশই এই পাঁচ মাসে হাসপাতালে ভর্তি হন। গত বছরের হিসাবেও একই ধরনের প্রবণতা দেখা যায়। ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ১৭৬ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছিলেন এবং তাঁদের মধ্যে একজনের মৃত্যু হয়েছিল। তবে আগস্ট থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত পাঁচ মাসে রোগীর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ২ হাজার ২২৭ জনে। ওই সময়ে ২৮ জনের মৃত্যু হয়।
চলতি বছরের পরিস্থিতিও স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্টদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছে। বুধবার সকাল ৭টা পর্যন্ত ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ডেঙ্গু আক্রান্ত ৩৯ জন রোগী ভর্তি ছিলেন। আগের ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ১০ জন রোগী ভর্তি হয়েছেন, বিপরীতে চিকিৎসা শেষে ছাড়পত্র পেয়েছেন ১১ জন।
ডেঙ্গুর সংক্রমণ বিবেচনায় ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশনের ছয়টি ওয়ার্ডকে বিশেষ ঝুঁকিপূর্ণ বা ‘স্পেশাল জোন’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ওয়ার্ডগুলো হলো ৬, ১০, ১১, ১২, ১৩ ও ১৪ নম্বর।
সিটি করপোরেশনের হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত নগরে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা ছিল মাত্র চারজন। জুনে আক্রান্ত হন আটজন। এরপর জুলাইয়ের ২১ তারিখ পর্যন্ত আক্রান্ত হয়েছেন আরও ৫৮ জন। সব মিলিয়ে চলতি বছরে নগর এলাকায় ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৭০ জনে। তাঁদের মধ্যে একজনের মৃত্যু হয়েছে।
ডেঙ্গুর বিস্তার ঠেকাতে স্পেশাল জোনগুলোতে বিশেষ মশকনিধন কার্যক্রম চালানোর কথা জানিয়েছে সিটি করপোরেশন। প্রশাসক মো. রুকুনোজ্জামান রোকন জানিয়েছেন, গত বছরের অভিজ্ঞতা বিবেচনায় নিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব এলাকায় দিনে দুই দফা মশকনিধন কার্যক্রম পরিচালনার পাশাপাশি ফগিং ও স্প্রে করা হচ্ছে। বাসাবাড়ি ও আশপাশের পরিবেশ পরিষ্কার রাখার বিষয়ে সচেতনতা বাড়াতে বাড়ি বাড়ি লিফলেটও বিতরণ করা হচ্ছে।
তবে নগরের কিছু এলাকায় মশার উপদ্রব নিয়ে বাসিন্দাদের অভিযোগ রয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার তালিকায় থাকা নওমহল এলাকায় নালা-নর্দমায় আবর্জনা জমে থাকার চিত্রও দেখা গেছে। স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, মশার ওষুধ ছিটানোর পরও উপদ্রব কমছে না। তাঁদের আশঙ্কা, অপরিষ্কার নালা ও জমে থাকা পানির কারণে মশার বংশবিস্তার বাড়তে পারে।
রোগীর চাপ বেড়ে যাওয়ায় গত ২ জুলাই ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পৃথক ডেঙ্গু ওয়ার্ড চালু করা হয়। হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, ২০ শয্যার এই ওয়ার্ডে বুধবার সকাল পর্যন্ত ৩৯ জন রোগী ভর্তি ছিলেন। অর্থাৎ নির্ধারিত শয্যার তুলনায় রোগীর সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ। ফলে কয়েকজন রোগীকে মেঝেতেও চিকিৎসা নিতে হচ্ছে।
দায়িত্বরত নার্সদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২ জুলাই থেকে বুধবার দুপুর পর্যন্ত ওই ওয়ার্ডে ২৪২ জন রোগী ভর্তি হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ১০৩ জন ময়মনসিংহ জেলার বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দা। ভর্তি রোগীদের প্রায় ৫৬ শতাংশই ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশন এলাকার। নগরের নওমহল, আকুয়া মাদ্রাসা কোয়ার্টার এবং বাউন্ডারি রোড এলাকার রোগীর সংখ্যা তুলনামূলক বেশি বলে হাসপাতাল সূত্র জানিয়েছে।
ডেঙ্গু আক্রান্তদের মধ্যে কেউ কেউ ময়মনসিংহের বাইরে থেকেও সংক্রমিত হয়ে হাসপাতালে এসেছেন। আকুয়া মাদ্রাসা কোয়ার্টার এলাকায় এক আত্মীয়ের বাসায় যাওয়ার পর জ্বরে আক্রান্ত হন স্কুলশিক্ষক আবদুল আউয়াল। প্রথমে সাধারণ জ্বর মনে হলেও পরে তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটে। পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর ডেঙ্গু শনাক্ত হয় এবং তাঁর প্লাটিলেট কমে ৬৮ হাজারে নেমে আসে।
ফুলবাড়িয়া উপজেলার সন্তোষপুর গ্রামের ২০ বছর বয়সী রাকিব হোসেনও ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। কাজের সন্ধানে গাজীপুরের কোনাবাড়ী এলাকায় থাকার সময় তিনি জ্বরে আক্রান্ত হন। চিকিৎসায় সুস্থ না হওয়ায় ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয় তাঁকে। প্লাটিলেট কমে যাওয়ায় তাঁকে চার ব্যাগ রক্ত দিতে হয়েছে বলে তিনি জানান।
হাসপাতালের সহকারী পরিচালক (প্রশাসন) মো. মাইনউদ্দিন খান বলেন, চলতি মৌসুমে ডেঙ্গু রোগীর চাপ বেড়েছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় পৃথক আইসোলেশন ওয়ার্ড চালু করা হয়েছে এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা কার্যক্রম চলছে। জ্বর ও শরীরে র্যাশ নিয়ে অনেক রোগী হাসপাতালে আসছেন। রোগীদের প্রয়োজনীয় ওষুধ এবং পরীক্ষার ব্যবস্থা রাখার কথাও জানান তিনি।
ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বাইরে জেলার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতেও ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসা নিচ্ছেন। জেলা সিভিল সার্জন দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২২ জুলাই পর্যন্ত জেলার ১২টি উপজেলায় ৩৫ জন ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসা নিয়েছেন। তাঁদের মধ্যে পাঁচজন বর্তমানে হাসপাতালে ভর্তি আছেন।
সিভিল সার্জন দপ্তরের হিসাবে, ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এ পর্যন্ত ২৩৬ জন রোগী চিকিৎসা নিয়েছেন এবং তাঁদের মধ্যে একজনের মৃত্যু হয়েছে। তবে জেলার কোন উপজেলায় কতজন রোগী আক্রান্ত হয়েছেন, সেই অনুযায়ী পৃথক পরিসংখ্যান সিভিল সার্জন দপ্তরে সংরক্ষিত নেই।
সিভিল সার্জন ফয়সল আহমেদ জানিয়েছেন, ডেঙ্গু পরিস্থিতি মোকাবিলায় স্বাস্থ্য বিভাগ প্রস্তুত রয়েছে। নতুন যোগ দেওয়া চিকিৎসকদের ডেঙ্গু রোগীর চিকিৎসা বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি পরিচ্ছন্নতা ও জনসচেতনতামূলক কার্যক্রমও চালানো হচ্ছে।
স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তাদের মতে, ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রোগীর সংখ্যা বেশি দেখানোর একটি কারণ হলো এটি শুধু নগর বা জেলার বাসিন্দাদের চিকিৎসা দেয় না; আশপাশের বিভিন্ন জেলার মানুষও এখানে চিকিৎসার জন্য আসেন। তবে নগর এলাকায় আক্রান্তের সংখ্যা দ্রুত বাড়তে থাকায় মশকনিধন, জলাবদ্ধতা নিরসন এবং বাড়ি ও আশপাশের পরিবেশ পরিষ্কার রাখার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।
ডেঙ্গু পরিস্থিতির এই ঊর্ধ্বগতি সামলাতে চিকিৎসা ব্যবস্থার পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে প্রতিরোধমূলক উদ্যোগও সমান জরুরি হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে জমে থাকা পানি অপসারণ, মশার প্রজননস্থল ধ্বংস এবং আক্রান্ত রোগীদের দ্রুত শনাক্ত করে চিকিৎসার আওতায় আনা গেলে সংক্রমণের বিস্তার নিয়ন্ত্রণে রাখা সহজ হতে পারে।
মন্তব্য