খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ২১ই জুলাই ২০২৬, ৫:২০ পিএম

জীবিকার তাগিদে ২০১৮ সালে বাংলাদেশ ছেড়ে মালয়েশিয়ায় পাড়ি জমিয়েছিলেন খুলনার রূপসার তরুণ নাজমুস সাকিব। প্রবাসজীবনের ব্যস্ততা, কর্মক্ষেত্রের চাপ কিংবা নতুন দেশের বাস্তবতা—কোনোটিই তার শৈশবের ক্রিকেট-স্বপ্নকে থামিয়ে দিতে পারেনি। বরং কাজের ফাঁকে নিয়মিত ক্রিকেট খেলে নিজের প্রতিভাকে আরও শাণিত করেছেন তিনি। সেই অধ্যবসায়ের ফল হিসেবে এবার মালয়েশিয়ার জাতীয় ক্রিকেট দলে জায়গা করে নিয়েছেন ২৬ বছর বয়সী এই বাংলাদেশি।
পিতৃহীন নাজমুস সাকিব বর্তমানে মালয়েশিয়ার নেগেরি সিমবিলান প্রদেশে ‘সিলিফোকাস এসডিএন’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত। প্রবাসে চাকরির পাশাপাশি অবসর সময়ে তিনি টেপ টেনিস ক্রিকেট খেলতেন। সেখানেই ধীরে ধীরে মালয়েশিয়ার ক্রিকেটাঙ্গনের কয়েকজন খেলোয়াড়ের সঙ্গে তার পরিচয় হয়। সেই পরিচয়ই পরবর্তী সময়ে তার ক্রিকেটজীবনের নতুন দরজা খুলে দেয়।
প্রবাসে থাকা দুই শুভাকাঙ্ক্ষীর সহযোগিতায় সাকিব মালয়েশিয়ার ক্রিকেট ক্লাব ‘এসএসএফ প্যান্থারস’-এ খেলার সুযোগ পান। ক্লাবটির হয়ে নিজের সামর্থ্যের প্রমাণ দিতে খুব বেশি সময় নেননি তিনি। উইকেটকিপার-ব্যাটার হিসেবে ধারাবাহিক পারফরম্যান্সের পাশাপাশি অলরাউন্ড নৈপুণ্য দিয়ে স্থানীয় ক্রিকেটসংশ্লিষ্টদের নজরে আসেন এই তরুণ।
ঘরোয়া ক্রিকেটে টানা তিন বছর ভালো পারফরম্যান্স করার পর মালয়েশিয়া ‘এ’ দলে ডাক পান সাকিব। সেখানেও ব্যাট হাতে নিজের সক্ষমতার পরিচয় দেন তিনি। সিঙ্গাপুরের বিপক্ষে একটি টি-টোয়েন্টি ম্যাচে মাত্র ৫০ বলে ১২২ রানের ঝোড়ো ইনিংস খেলেন। তার ওই বিধ্বংসী ব্যাটিং নির্বাচকদের নজর কাড়ে এবং জাতীয় দলের দরজাও খুলে যায়।
এরপর আসে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে খেলার সুযোগ। ওমানে অনুষ্ঠিত ‘এসিসি মেনস প্রিমিয়ার কাপ’ টি-টোয়েন্টি টুর্নামেন্টের জন্য মালয়েশিয়া দলে অন্তর্ভুক্ত হন সাকিব। জাতীয় দলের হয়ে আনুষ্ঠানিক অভিষেকের জন্য অবশ্য তাকে আরও কিছুটা অপেক্ষা করতে হয়।
গত ৮ জুন শুরু হওয়া ৫০ ওভারের ‘এসিসি মেনস চ্যালেঞ্জ কাপ’ হয়ে ওঠে তার আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অভিষেকের মঞ্চ। প্রথম টুর্নামেন্টেই নিজের সামর্থ্যের জানান দেন তিনি। থাইল্যান্ডের বিপক্ষে বৃষ্টিবিঘ্নিত ম্যাচে মাত্র ২৫ বলে ৫৭ রানের ঝড়ো ইনিংস খেলেন সাকিব। তার কার্যকর ব্যাটিংয়ে মালয়েশিয়া ফাইনালে ওঠে। পরে থাইল্যান্ডকে হারিয়ে টুর্নামেন্টের শিরোপাও জেতে দলটি।
মালয়েশিয়ার জাতীয় দলে জায়গা করে নেওয়ার এই যাত্রা সাকিবের জন্য শুধু ব্যক্তিগত সাফল্য নয়, প্রবাসজীবনে নিজের স্বপ্ন ধরে রাখারও এক অনুপ্রেরণামূলক গল্প। কর্মজীবনের পাশাপাশি নিয়মিত অনুশীলন, ঘরোয়া ক্রিকেটে ধারাবাহিকতা এবং সুযোগ পাওয়ার পর তা কাজে লাগানোর সক্ষমতাই তাকে জাতীয় পর্যায়ে পৌঁছে দিয়েছে।
ভবিষ্যৎ লক্ষ্য নিয়েও উচ্চাকাঙ্ক্ষী সাকিব। তিনি বলেন, মালয়েশিয়া জাতীয় ক্রিকেট দলকে ভবিষ্যতে বিশ্বকাপের মঞ্চে দেখতে চান। বিশ্ব র্যাংকিংয়ে মালয়েশিয়াকে সেরা ২০ দলের মধ্যে নিয়ে আসার লক্ষ্যেও নিজের সর্বোচ্চটা দিয়ে অবদান রাখতে চান তিনি। তার কাছে মালয়েশিয়ার হয়ে ভালো খেলার পাশাপাশি নিজের মাতৃভূমি বাংলাদেশকে গর্বিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
সাকিবের জাতীয় দলে সুযোগ পাওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর মালয়েশিয়ায় বসবাসরত বাংলাদেশিদের মধ্যেও আনন্দের সঞ্চার হয়েছে। প্রবাসের মাটিতে একজন বাংলাদেশির এমন সাফল্যকে তারা নিজেদের অর্জন হিসেবেই দেখছেন। বিশেষ করে যারা কাজের পাশাপাশি খেলাধুলা কিংবা অন্য কোনো ক্ষেত্রে নিজেদের প্রতিভা ধরে রাখার চেষ্টা করছেন, তাদের জন্য সাকিবের গল্পটি নতুন করে সাহস জোগাতে পারে।
বাংলাদেশে জন্ম নেওয়া এক তরুণের প্রবাসজীবন থেকে মালয়েশিয়ার জাতীয় ক্রিকেট দলে উঠে আসার এই পথচলা তাই ক্রিকেটের গণ্ডি ছাড়িয়ে পরিশ্রম, অধ্যবসায় এবং স্বপ্ন ধরে রাখার এক অনন্য উদাহরণ হয়ে উঠেছে।
মন্তব্য