জিলাইভ বাংলা | সত্যের জয় অবধারিত

চট্টগ্রামে রেকর্ড ভাঙা অতি ভারী বর্ষণ: জোয়ার ও জলাবদ্ধতায় স্থবির জনজীবন

টানা তিন দিনের অবিরাম বর্ষণ এবং বঙ্গোপসাগরের জোয়ারের পানিতে আবারো ডুবল বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রাম। সোমবার থেকে শুরু হওয়া অতি ভারী বৃষ্টিপাতে নগরের সিংহভাগ নিচু এলাকা প্লাবিত হয়ে স্থবির হয়ে পড়েছে জনজীবন। প্রধান সড়ক থেকে শুরু করে আবাসিক এলাকার অলিগলিতে এখন থইথই করছে পানি। কোথাও গোড়ালি, আবার কোথাও হাঁটু থেকে কোমরসমান পানিতে তলিয়ে গেছে রাস্তাঘাট। এতে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন অফিসগামী মানুষ ও সাধারণ নগরবাসী। পরিস্থিতি বিবেচনায় উদ্ভূত দুর্যোগের কারণে নগরের বেশ কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে জরুরি ছুটি ঘোষণা করতে বাধ্য হয়েছে কর্তৃপক্ষ।

পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিসের রেকর্ড ও পূর্বাভাস

চট্টগ্রাম পতেঙ্গা আবহাওয়া কার্যালয়ের তথ্য বিশ্লেষণ করে জানা গেছে, সোমবার সকাল ৬টা পর্যন্ত পূর্ববর্তী ২৪ ঘণ্টায় চট্টগ্রামে রেকর্ড ২৮২ দশমিক ৮ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত নথিভুক্ত করা হয়েছে। আবহাওয়া অধিদপ্তরের নিয়ম অনুযায়ী, ২৪ ঘণ্টায় ৮৮ মিলিমিটার বা তার বেশি বৃষ্টিপাত হলে তাকে ‘অতি ভারী বর্ষণ’ হিসেবে গণ্য করা হয়। সেই হিসাবে চট্টগ্রামে স্বাভাবিক সীমার চেয়ে প্রায় তিন গুণ বেশি বৃষ্টিপাত হয়েছে। মঙ্গলবার ভোর থেকে এই বৃষ্টির বেগ আরও বৃদ্ধি পাওয়ায় নগরের নিচু এলাকাগুলো দ্রুত প্লাবিত হয়।

জলমগ্ন এলাকার চিত্র ও নাগরিক দুর্ভোগ

ভারী বর্ষণে নগরের বাণিজ্যিক কেন্দ্র আগ্রাবাদ, কাতালগঞ্জ, কাপাসগোলা, ফরিদার পাড়া, চান্দগাঁও, চকবাজারের তেলেপট্টি গলি, কাট্টলীর ঈশান মহাজন সড়ক এবং হালিশহরের কে ও এল ব্লকের সোনালি আবাসিক, বসুন্ধরা আবাসিক, রামপুর ও আনন্দীপুরসহ বিস্তীর্ণ এলাকা পানিতে তলিয়ে গেছে।

আগ্রাবাদ ও কাতালগঞ্জ এলাকার প্রধান সড়কগুলোতে এখন হাঁটুপানি। আগ্রাবাদ এলাকার চাকরিজীবী জোবায়ের হোসেন ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, সকালবেলা অফিসে যাওয়ার সময় পুরো এলাকা জলমগ্ন থাকায় তাঁদের চরম বেগ পেতে হয়েছে। অনেককে বাধ্য হয়ে নোংরা পানি মাড়িয়েই গন্তব্যে রওনা দিতে হয়েছে। অন্যদিকে, ফরিদার পাড়ার বাসিন্দা ইফতেখার উদ্দিন জানান, ঘরের দোরগোড়ায় পানি চলে আসায় সকাল থেকেই তাঁরা কার্যত গৃহবন্দী হয়ে পড়েছেন।

জলাবদ্ধতার পাশাপাশি ঝোড়ো হাওয়ায় নগরের উত্তর কাট্টলীর ঈশান মহাজন সড়কে একটি বিশালাকার গাছ উপড়ে পড়েছে। ফলে ওই সড়কে সব ধরনের যানবাহন চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে, যা স্থানীয়দের ভোগান্তি আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

সিটি করপোরেশনের বক্তব্য ও ব্যাখ্যা

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের উপপ্রধান পরিচ্ছন্নতা কর্মকর্তা প্রণব কুমার শর্মা উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ে গণমাধ্যমকে জানান, টানা দুই দিনের ভারী বর্ষণের সাথে আজ সকালে সাগরের জোয়ার যুক্ত হওয়ায় পানির উচ্চতা বৃদ্ধি পেয়েছে এবং নগরের বেশ কিছু এলাকায় জলাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে। তবে সিটি করপোরেশনের পরিচ্ছন্নতা কর্মীরা নালা ও খালগুলো সচল রাখার চেষ্টা করছেন, যার ফলে কিছু কিছু এলাকা থেকে পানি দ্রুত নেমে যাচ্ছে। তিনি আরও উল্লেখ করেন, অতীতে যেসব এলাকা সামান্য বৃষ্টিতেই তলিয়ে যেত—যেমন মুরাদপুর, বহদ্দারহাট এবং ২ নম্বর গেট এলাকা—সেসব জায়গায় এবার এখনো পানি ওঠার কোনো খবর পাওয়া যায়নি।

মেগা প্রকল্পের ব্যয় বনাম বাস্তবতা

নগরের স্থায়ী জলাবদ্ধতা নিরসনে বর্তমানে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক), চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (চডিএ) এবং পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) যৌথভাবে চারটি মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। সরকারি তথ্যমতে, গত ৮ থেকে ১০ বছর ধরে এই প্রকল্পগুলোর কাজ চলমান রয়েছে এবং গত মার্চ মাস পর্যন্ত এই খাতে ব্যয় হয়েছে প্রায় ১০ হাজার ৪০৮ কোটি টাকা।

এত বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয়ের পরও নগরের এই বারংবার ডুবুডুবু অবস্থা প্রকল্পগুলোর কার্যকারিতা নিয়ে নাগরিক মনে বড় ধরনের প্রশ্ন তুলেছে। এর আগে চলতি বছরের ২৮ এপ্রিল স্মরণকালের ভয়াবহতম জলাবদ্ধতার মুখোমুখি হয়েছিল চট্টগ্রাম। স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, বিপুল অর্থ ব্যয়ের সুফল মিলছে না সমন্বয়হীনতা ও অপরিকল্পিত কাজের কারণে।

Tags :

বাংলা ডেস্ক । GLive24.com

সর্বশেষ খবর