জিলাইভ [ GLive ] | truth alone triumphs

জাপান-বাংলাদেশ সন্ত্রাসবিরোধী সহযোগিতা আরও জোরদারের অঙ্গীকার

সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলা এবং নিরাপত্তাব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করতে বাংলাদেশসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে ভবিষ্যতেও ঘনিষ্ঠভাবে কাজ চালিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছে জাপান। একই সঙ্গে ২০১৬ সালের ১ জুলাই ঢাকার গুলশানের হোলি আর্টিজান বেকারিতে জঙ্গি হামলায় নিহত সাত জাপানি নাগরিকের স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে তাদের স্বপ্ন ও অবদানকে বাংলাদেশের উন্নয়নযাত্রার সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে যুক্ত বলে উল্লেখ করেছেন দেশটির প্রতিনিধিরা।

বৃহস্পতিবার সকালে মেট্রোরেলের উত্তরা ডিপোতে অবস্থিত মেট্রোরেল এক্সিবিশন অ্যান্ড ইনফরমেশন সেন্টারে আয়োজিত এক স্মরণসভায় জাপানের বৈদেশিক সম্পর্কবিষয়ক সংসদীয় উপমন্ত্রী শিমাদা তোমাকি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে সরাসরি উপস্থিত অতিথিদের পাশাপাশি অনলাইনেও এটি সম্প্রচার করা হয়, যাতে দুই দেশের বিভিন্ন পর্যায়ের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা অংশ নিতে পারেন।

অনুষ্ঠানের শুরুতে হোলি আর্টিজান হামলায় নিহত সব ব্যক্তির স্মরণে দাঁড়িয়ে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। পরে নিহতদের নামফলকের সামনে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়। স্মরণসভায় উপস্থিত অতিথিরা নিহতদের আত্মত্যাগের প্রতি সম্মান জানিয়ে বাংলাদেশ ও জাপানের দীর্ঘদিনের সহযোগিতার কথাও তুলে ধরেন।

শিমাদা তোমাকি বলেন, হোলি আর্টিজানের হামলা ছিল একটি নির্মম ও অমানবিক সন্ত্রাসী ঘটনা, যার স্মৃতি আজও দুই দেশের মানুষের মনে বেদনাদায়ক অধ্যায় হয়ে রয়েছে। তিনি বলেন, জাপান দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে যে এমন মর্মান্তিক ঘটনা আর কখনো ঘটতে দেওয়া যাবে না। সেই লক্ষ্যেই বাংলাদেশসহ আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে সমন্বিতভাবে সন্ত্রাসবিরোধী কার্যক্রম জোরদার, নিরাপত্তা সহযোগিতা বৃদ্ধি এবং অভিজ্ঞতা বিনিময়ের কাজ অব্যাহত থাকবে।

তিনি আরও বলেন, হামলায় নিহত সাত জাপানি বিশেষজ্ঞ সে সময় ঢাকা মাস র‌্যাপিড ট্রানজিট উন্নয়ন প্রকল্পের প্রাথমিক সমীক্ষা দলের সদস্য ছিলেন। রাজধানীর আধুনিক গণপরিবহনব্যবস্থার ভিত্তি নির্মাণে তাঁদের গবেষণা, পরিকল্পনা ও পরিশ্রম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। আজকের ঢাকা মেট্রোরেল সেই স্বপ্নের বাস্তব রূপ, যা প্রতিদিন হাজারো মানুষের যাতায়াত সহজ করছে।

শিমাদা তোমাকির ভাষায়, মেট্রোরেল এখন শুধু একটি পরিবহনব্যবস্থা নয়; এটি বাংলাদেশ ও জাপানের দীর্ঘস্থায়ী বন্ধুত্ব, পারস্পরিক আস্থা এবং উন্নয়ন সহযোগিতার এক উজ্জ্বল প্রতীক। তিনি জানান, বর্তমানে এগিয়ে চলা এমআরটি লাইন-১ ও এমআরটি লাইন-৫ প্রকল্পের ভিত্তিতেও সেই সাত জাপানি বিশেষজ্ঞের প্রাথমিক পরিকল্পনা ও জরিপের অবদান রয়েছে।

প্রতিবছরের ধারাবাহিকতায় এবারও জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা (জাইকা) তাদের নিহত সাত সহকর্মীর স্মরণে এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। সংস্থাটির প্রেসিডেন্ট তানাকা আকিহিকো বলেন, ২০১৬ সালের সেই ভয়াবহ হামলার স্মৃতি এখনও জাইকার প্রতিটি কর্মকাণ্ডে গভীর প্রভাব ফেলে। বাংলাদেশের উন্নয়নের জন্য দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে প্রাণ হারানো এই মানুষগুলোর অবদান কেবল জাইকার ইতিহাসেই নয়, বাংলাদেশ-জাপান সম্পর্কের ইতিহাসেও স্থায়ীভাবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

তিনি নিহতদের পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানিয়ে বলেন, নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়ে জাইকা তার অঙ্গীকারে অবিচল রয়েছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশের অবকাঠামো উন্নয়ন এবং টেকসই নগর পরিবহনব্যবস্থা গড়ে তুলতে সংস্থাটি ভবিষ্যতেও সক্রিয়ভাবে সহযোগিতা করে যাবে।

তানাকা আকিহিকো আরও বলেন, হোলি আর্টিজান হামলার পর অনেকেই ধারণা করেছিলেন, ঢাকা মেট্রোরেল প্রকল্পের অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত হতে পারে। কিন্তু দুই দেশের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় সেই প্রকল্প সফলভাবে বাস্তবায়িত হয়েছে এবং বর্তমানে এটি রাজধানীর মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অপরিহার্য অংশে পরিণত হয়েছে। নিহত সহকর্মীদের স্বপ্ন ও অঙ্গীকার বাস্তবায়নে জাইকা ভবিষ্যতেও বাংলাদেশের পাশে থাকবে বলেও তিনি আশ্বাস দেন।

অনুষ্ঠানে ঢাকা মাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (অতিরিক্ত সচিব) মো. শাওগাতুল আলম বলেন, নিহত সাত জাপানি বিশেষজ্ঞের নিষ্ঠা, দক্ষতা ও আত্মত্যাগ বাংলাদেশের আধুনিক গণপরিবহনব্যবস্থার বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি তৈরি করেছে। তাঁদের অবদান ভবিষ্যতেও শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হবে।

বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পূর্ব এশিয়া ও প্যাসিফিক অনুবিভাগের মহাপরিচালক মোহাম্মদ নূরে-আলম বলেন, হোলি আর্টিজান হামলায় নিহত জাপানি প্রকৌশলীরা বাংলাদেশের উন্নয়নযাত্রার প্রকৃত অংশীদার ছিলেন। তাঁদের আত্মত্যাগ এবং অবদান বাংলাদেশের মানুষ কখনো ভুলবে না। তিনি বলেন, দুই দেশের বন্ধুত্ব ও সহযোগিতা ভবিষ্যতেও আরও বিস্তৃত হবে।

স্মরণসভায় আরও বক্তব্য দেন সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সচিব মোহাম্মদ জিয়াউল হক, অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (অনুবিভাগ প্রধান, যুক্তরাষ্ট্র ও জাপান) মো. আহসান কিবরিয়া সিদ্দিকি এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য কর্মকর্তারা। অনুষ্ঠানে ঢাকায় নিযুক্ত জাপানের রাষ্ট্রদূত সাইদা শিনিচিও উপস্থিত ছিলেন।

২০১৬ সালের হোলি আর্টিজান হামলা বাংলাদেশ ও জাপান—উভয় দেশের জন্যই গভীর শোকের একটি অধ্যায়। তবে সেই শোককে শক্তিতে পরিণত করে উন্নয়ন সহযোগিতা, নিরাপত্তা সমন্বয় এবং পারস্পরিক আস্থার সম্পর্ককে আরও দৃঢ় করার যে অঙ্গীকার দুই দেশ পুনর্ব্যক্ত করেছে, তা ভবিষ্যতের সহযোগিতার ভিত্তিকে আরও মজবুত করবে বলেই সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা।

Tags :

বাংলা ডেস্ক । GLive24.com

সর্বশেষ খবর