খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ২৮ই জুন ২০২৬, ২:৫৩ পিএম

গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলায় একটি হাফিজিয়া মাদ্রাসার দুই শিশু শিক্ষার্থীকে বলাৎকারের চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উঠেছে। উপজেলার বামনডাঙ্গা ইউনিয়নের বকসীপাড়া হাফিজিয়া মাদ্রাসা ও এতিমখানায় এই ঘটনা ঘটে। এই ন্যাক্কারজনক ঘটনার প্রতিবাদে এবং অভিযুক্ত সানজু বকসীর দ্রুত গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে উত্তাল হয়ে উঠেছে এলাকা। বিক্ষুব্ধ এলাকাবাসী ও মসজিদ কমিটির যৌথ উদ্যোগে ইতিমধ্যে বড় ধরনের প্রতিবাদ কর্মসূচি পালিত হয়েছে।
গতকাল শনিবার (২৭ জুন) বিকেলে উপজেলার বামনডাঙ্গা ইউনিয়নের তেলানীপাড়া ইবতেদায়ী মাদ্রাসা মাঠসংলগ্ন সড়কে এক বিশাল মানববন্ধন ও বিক্ষোভ মিছিল অনুষ্ঠিত হয়। স্থানীয় মসজিদ কমিটি এবং সর্বস্তরের জনসাধারণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে এই কর্মসূচি রূপ নেয় গণবিক্ষোভে। মানববন্ধনে অংশ নেওয়া শত শত মানুষ “সারা বাংলার খবর দে, ধর্ষকদের কবর দে” সহ বিভিন্ন স্লোগানে রাজপথ কাঁপিয়ে তোলেন। তারা দুই ভুক্তভোগী শিশুর ওপর ঘটে যাওয়া অমানবিক যৌন নির্যাতনের তীব্র নিন্দা জানান এবং অভিযুক্তের সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি করেন।
অভিযোগের বিবরণ থেকে জানা গেছে, গত এক মাসে মাদ্রাসার ওই দুই শিশু শিক্ষার্থী একাধিকবার পাশবিক নির্যাতনের শিকার হয়েছে। অভিযুক্ত সানজু বকসী বামনডাঙ্গা ইউনিয়নের রামধন গ্রামের মৃত জয়নাল বকসীর ছেলে। এলাকায় প্রভাবশালী ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত সানজু বকসী বামনডাঙ্গা ইউনিয়ন শ্রমিক লীগের সেক্রেটারি এবং উপজেলা জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতা মো. লুৎফর রহমান বকসীর বড় ভাই।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, সানজু বকসী ওই মাদ্রাসার কোনো নিয়মিত শিক্ষক বা পরিচালনা কমিটির কেউ নন। তবে রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব খাটিয়ে মাদ্রাসার বিভিন্ন উন্নয়নমূলক ও দাপ্তরিক কাজে তিনি সম্পৃক্ত থাকতেন। এই সুযোগেই মাদ্রাসার ভেতরে তার অবাধ যাতায়াত ছিল এবং সেই সুযোগ কাজে লাগিয়েই তিনি কোমলমতি দুই শিশুর ওপর এই জঘন্য নির্যাতন চালান।
মাদ্রাসার শিক্ষক নুর আলম ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে বলেন, যখন এই ঘটনাগুলো ঘটছিল, তখন তিনি ছুটিতে ছিলেন। ছুটি কাটিয়ে মাদ্রাসায় ফেরার পর ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীদের আচরণে অস্বাভাবিকতা লক্ষ্য করেন এবং একপর্যায়ে পুরো বিষয়টি জানতে পারেন। ঘটনার ভয়াবহতা অনুধাবন করে তিনি তাৎক্ষণিকভাবে মাদ্রাসা পরিচালনা কমিটিকে পুরো বিষয়টি অবহিত করেন।
অন্যদিকে, মাদ্রাসা পরিচালনা কমিটির সভাপতি আশরাফ বকসী জানান, অভিযোগ পাওয়ার পর থেকেই তারা বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখছেন। ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে অভিযুক্ত সানজু বকসীকে মাদ্রাসা কার্যালয়ে তলব করা হয়েছিল। কিন্তু তিনি কমিটির ডাকে সাড়া দেননি এবং বর্তমানে পলাতক রয়েছেন।
মানববন্ধনে অংশ নেওয়া বক্তারা স্থানীয় প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ প্রকাশ করেন। তারা অভিযোগ করেন, ঘটনার পর ভুক্তভোগী শিশুদের পরিবার আইনি সহায়তার জন্য সুন্দরগঞ্জ থানায় মামলা করতে গিয়েছিল। কিন্তু থানার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বিষয়টি আমলে নিয়ে মামলা রেকর্ড করার পরিবর্তে উল্টো ভুক্তভোগীদের পরিবারকে স্থানীয়ভাবে আপস-মীমাংসা বা সমঝোতা করার পরামর্শ দেন। পুলিশের এমন দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণে ক্ষোভ আরও ছড়িয়ে পড়ে, যা পরবর্তীতে এলাকাবাসীকে রাজপথে নামতে বাধ্য করে।
“একটি ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিশুদের ওপর এমন নির্যাতন কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। আমরা থানায় গিয়েও সঠিক বিচার পাইনি। উল্টো আমাদের মুখ বন্ধ করার চেষ্টা করা হয়েছে। আমরা অবিলম্বে এই লম্পট সানজু বকসীর গ্রেপ্তার চাই এবং তার সর্বোচ্চ শাস্তি দেখতে চাই।” — মানববন্ধনে অংশ নেওয়া এক স্থানীয় অভিভাবক
দুই শিশুর ওপর এমন পাশবিক নির্যাতনের ঘটনায় পুরো সুন্দরগঞ্জ উপজেলায় ব্যাপক চাঞ্চল্য ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। মানবাধিকারকর্মী ও স্থানীয় সচেতন মহল এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে দ্রুত একটি নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠনের দাবি তুলেছেন। সেই সঙ্গে রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনা না করে অপরাধীকে দ্রুত আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করার জন্য জেলা পুলিশ প্রশাসনের প্রতি জোর দাবি জানানো হয়েছে। বর্তমানে এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে।
মন্তব্য