চট্টগ্রাম নগরের বায়েজিদ বোস্তামী এলাকায় চাঁদাবাজি ও পেট্রলবোমা হামলার একটি পুরোনো মামলায় প্রশাসনিক সমন্বয়হীনতার চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। দেখা গেছে, একজন অভিযুক্ত ব্যক্তি বর্তমানে কারাগারে বন্দি থাকলেও সংশ্লিষ্ট মামলার নথিতে তিনি এখনো পলাতক হিসেবে তালিকাভুক্ত রয়েছেন, যা পুরো বিচার প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
ঘটনার সূত্রপাত ২০১৯ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর। ওই দিন অক্সিজেন নয়াহাট এলাকার এক ব্যবসায়ীর পাঁচতলা বাসার দ্বিতীয় তলায় পেট্রলবোমা নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে। অভিযোগ অনুযায়ী, ভুক্তভোগী ব্যবসায়ীর কাছে ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয়েছিল। চাঁদা না পেয়ে পরিকল্পিতভাবে এই হামলা চালানো হয় বলে দাবি তদন্তসংশ্লিষ্টদের।
পরবর্তীতে চাঁদাবাজি ও বিস্ফোরক দ্রব্য সংক্রান্ত আইনে একটি মামলা দায়ের করা হয়। দীর্ঘ তদন্ত শেষে ২০২০ সালের ১৮ অক্টোবর আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেয় তদন্তকারী সংস্থা। অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়, বিদেশে অবস্থানরত এক কথিত শীর্ষ অপরাধীর নির্দেশে ইমতিয়াজ সুলতান ইকরাম নামের এক ব্যক্তি ভুক্তভোগী ব্যবসায়ীর কাছে ফোনে চাঁদা দাবি করেন এবং টাকা না পাওয়ায় হামলার নির্দেশ দেন।
অভিযোগপত্র অনুযায়ী মোট ৯ জনকে আসামি করা হয়। তাদের মধ্যে কয়েকজন ইতিমধ্যে মৃত্যুবরণ করেছেন, কয়েকজন জামিনে আছেন, আবার কয়েকজনকে পলাতক দেখানো হয়েছে। এর মধ্যে ইমতিয়াজ সুলতান ইকরাম অন্যতম।
তবে পুলিশ ও কারা সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে অস্ত্র সংক্রান্ত আরেকটি মামলায় ইমতিয়াজকে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তারের সময় তাঁর কাছ থেকে একটি বিদেশি পিস্তল, ম্যাগাজিন ও গুলি উদ্ধার করা হয়। সেই মামলায় তিনি বর্তমানে কারাগারে আছেন।
অথচ বিস্ময়করভাবে চাঁদাবাজি ও বিস্ফোরক দ্রব্য সংক্রান্ত মামলায় তাঁকে এখনো গ্রেপ্তার দেখানো হয়নি। ফলে আদালতের নথিতে তিনি এখনও পলাতক হিসেবে তালিকাভুক্ত রয়েছেন।
আইনজ্ঞদের মতে, একজন আসামি অন্য কোনো মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে থাকলে সংশ্লিষ্ট সব মামলায় তাঁকে আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রেপ্তার দেখানো প্রয়োজন। তা না হলে পলাতক অবস্থার সুযোগ নিয়ে ভবিষ্যতে আইনি সুবিধা বা জামিনের পথ তৈরি হতে পারে, যা বিচার প্রক্রিয়ার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।
মামলার গুরুত্বপূর্ণ তথ্য নিচে সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো—
| বিষয় | বিবরণ |
|---|---|
| ঘটনার তারিখ | ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৯ |
| অভিযোগ | চাঁদা না পেয়ে পেট্রলবোমা হামলা |
| মামলার ধরণ | চাঁদাবাজি ও বিস্ফোরক দ্রব্য সংক্রান্ত |
| অভিযোগপত্র দাখিল | ১৮ অক্টোবর ২০২০ |
| মোট আসামি | ৯ জন |
| বর্তমানে কারাবন্দি | ইমতিয়াজ সুলতান ইকরাম |
| মামলার বর্তমান অবস্থা | একজন আসামি নথিতে পলাতক |
তদন্ত ও সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো আরও জানায়, ইমতিয়াজ একসময় বিদেশে অবস্থানরত এক কথিত শীর্ষ অপরাধীর ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে পরিচিত ছিলেন। অভিযোগ রয়েছে, তিনি বিদেশ থেকে ফোনের মাধ্যমে চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণ করতেন এবং ব্যবসায়ীদের ভয়ভীতি দেখাতেন। তাঁর বিরুদ্ধে হত্যা, অস্ত্র ও নাশকতা সংশ্লিষ্ট একাধিক মামলা রয়েছে।
এছাড়া আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, তিনি কিশোর গ্যাং পরিচালনার সঙ্গেও জড়িত ছিলেন এবং পরিচয় গোপন করে বিভিন্ন সময়ে দেশের ভেতরে ও বাইরে চলাচল করতেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মামলার তথ্য সমন্বয়ের এই ধরনের ঘাটতি বিচার ব্যবস্থার দুর্বলতাকে স্পষ্ট করে। একই ব্যক্তি ভিন্ন মামলায় ভিন্ন অবস্থানে থাকলে বিচারিক জটিলতা তৈরি হয় এবং অপরাধীরা আইনি ফাঁকফোকর ব্যবহারের সুযোগ পেতে পারে।
রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা জানিয়েছেন, বিষয়টি নজরে এসেছে এবং দ্রুত প্রয়োজনীয় সংশোধনমূলক পদক্ষেপ নেওয়া হবে। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট থানাগুলোকে তথ্য হালনাগাদ করার নির্দেশনা দেওয়া হতে পারে বলে জানা গেছে।
সব মিলিয়ে এই ঘটনা বিচার ব্যবস্থার তথ্য ব্যবস্থাপনা, সমন্বয় ও নজরদারি কাঠামোর কার্যকারিতা নিয়ে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
