এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (এডিবি) থেকে বাজেট সহায়তা হিসেবে ১০০ কোটি মার্কিন ডলারের ঋণ পেয়েছে বাংলাদেশ। এই অর্থ যুক্ত হওয়ার পর দেশের বৈদেশিক মুদ্রার গ্রস বা মোট রিজার্ভের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। আজ রবিবার দেশের গ্রস রিজার্ভের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৫ দশমিক ৬৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে, যা গত ৪৩ মাসের মধ্যে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ হিসেবে রেকর্ড করা হয়েছে।
রিজার্ভের সাম্প্রতিক ওঠানামা ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কয়েকবার ৩৫ বিলিয়ন ডলারের ঘর অতিক্রম করলেও তা আজকের এই উচ্চতায় পৌঁছাতে পারেনি। এর আগে গত বৃহস্পতিবার গ্রস রিজার্ভের পরিমাণ ছিল ৩৪ দশমিক ৫৯ বিলিয়ন ডলার। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের সময় দেশের এই গ্রস রিজার্ভ হ্রাস পেয়ে ২৫ দশমিক ৯২ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছিল। সেখান থেকে ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পেয়ে চলতি বছরের নভেম্বর মাসে প্রথমবার রিজার্ভ পুনরায় ৩৫ বিলিয়ন ডলারের ঘর অতিক্রম করতে সক্ষম হয়। এর আগে সর্বশেষ ২০২২ সালের নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে বাংলাদেশের রিজার্ভ ৩৫ বিলিয়ন ডলারের নিচে নেমেছিল।
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ইতিহাসে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সবচেয়ে বড় মাইলফলক স্পর্শ করেছিল ২০২১ সালের আগস্ট মাসে। ওই সময়ে রিজার্ভের পরিমাণ দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ ৪৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার অতিক্রম করেছিল। তবে পরবর্তী সময়ে অর্থপাচার বৃদ্ধি পাওয়াসহ বিভিন্ন কারণে সেখান থেকে রিজার্ভ দ্রুত গতিতে কমতে থাকে। রিজার্ভ সংকটের পাশাপাশি দেশের মুদ্রা বাজারেও এর প্রভাব পড়ে, যার ফলে ৮৪ টাকার মার্কিন ডলারের দর বৃদ্ধি পেয়ে ১২০ টাকা ছাড়িয়ে যায়। সরকার পতনের সময় রিজার্ভ কমে ২৫ দশমিক nicotine৯২ বিলিয়ন ডলারে নেমেছিল।
বিপিএম৬ পদ্ধতিতে রিজার্ভের নতুন মাইলফলক
আন্তর্জাতিক মানদণ্ড বজায় রাখতে বাংলাদেশ ব্যাংক ২০২৩ সালের জুন মাস থেকে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) নির্ধারিত হিসাব পদ্ধতি ‘বিপিএম৬’ (BPM6) অনুযায়ী রিজার্ভের তথ্য প্রকাশ শুরু করে। ওই সময়ে অর্থাৎ ২০২৩ সালের জুনে বিপিএম৬ পদ্ধতি মোতাবেক দেশের রিজার্ভ ছিল ২৪ দশমিক ৭৫ বিলিয়ন ডলার।
আজ রবিবার নতুন ঋণ যুক্ত হওয়ার পর বিপিএম৬ পদ্ধতি অনুযায়ী বাংলাদেশের রিজার্ভের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩১ দশমিক শূন্য ৭ বিলিয়ন ডলারে। এর আগে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের সময় বিপিএম৬ অনুযায়ী রিজার্ভ কমে ২০ দশমিক ৪৮ বিলিয়ন ডলারে নেমেছিল। দেশের ইতিহাসে এই প্রথম বিপিএম৬ অনুযায়ী রিজার্ভ ৩১ বিলিয়ন ডলারের ওপরে উঠল। এর আগে চলতি বছরের ১৯ জানুয়ারি প্রথমবারের মতো বিপিএম৬ পদ্ধতি অনুযায়ী রিজার্ভ ৩০ বিলিয়ন ডলারের মাইলফলক পার হয়েছিল, যা আজ আরও শক্তিশালী অবস্থানে পৌঁছাল।
রেমিট্যান্সের উচ্চ প্রবাহ ও অর্থনৈতিক স্বস্তি
বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পেয়ে বর্তমান স্বস্তিদায়ক অবস্থানে আসার পেছনে প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করেছে প্রবাসী আয়ের বা রেমিট্যান্সের উচ্চ প্রবাহ। ২০২৪ সালের আগস্ট মাসের পর থেকেই দেশের বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স আসার হার উচ্চ মাত্রায় রয়েছে।
অর্থনৈতিক খাতের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের ১০ জুন পর্যন্ত প্রবাসী বাংলাদেশিরা মোট ৩৩ দশমিক ৯৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স দেশে পাঠিয়েছেন। এই পরিমাণটি আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ৫৫০ কোটি ডলার বা ১৯ দশমিক ৩১ শতাংশ বেশি। উল্লেখ্য, এর আগের অর্থবছরেও দেশে রেমিট্যান্সের প্রবৃদ্ধি হয়েছিল প্রায় ২৭ শতাংশ। প্রবাসী আয়ের এই ধারাবাহিক ও শক্তিশালী প্রবৃদ্ধির ওপর ভর করেই দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এখন একটি মজবুত ও স্বস্তিদায়ক অবস্থায় উন্নীত হয়েছে।
