লালমনিরহাটের আদিতমারী উপজেলায় প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য বরাদ্দকৃত সরকারি ত্রাণ সহায়তা গ্রহণের পর ব্যাপক সমালোচনার মুখে তা ফেরত দিয়েছেন চারজন সচ্ছল ব্যক্তি। অভিযুক্তদের মধ্যে স্থানীয় বিএনপির এক প্রভাবশালী নেতাও রয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও স্থানীয় পর্যায়ে বিতর্কের সৃষ্টি হলে প্রশাসনের পক্ষ থেকে ব্যবস্থা গ্রহণের পরিপ্রেক্ষিতে গত মঙ্গলবার থেকে বৃহস্পতিবারের মধ্যে তারা প্রাপ্ত ঢেউটিন ও নগদ অর্থ সংশ্লিষ্ট দপ্তরে জমা দেন।
Table of Contents
ঘটনার প্রেক্ষাপট ও ত্রাণ বরাদ্দ
সাম্প্রতিক কালবৈশাখী ঝড় ও শিলাবৃষ্টিতে আদিতমারী উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় ঘরবাড়ির ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। দুস্থ ও ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য সরকারের পক্ষ থেকে বিশেষ ত্রাণ সহায়তার ব্যবস্থা করা হয়। উপজেলা প্রশাসন ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা দপ্তরের নিয়ম অনুযায়ী, ক্ষতিগ্রস্তদের আবেদনের প্রেক্ষিতে যাচাই-বাছাই শেষে সহায়তা প্রদানের বিধান রয়েছে।
আদিতমারী উপজেলার ভাদাই ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের চারজন ব্যক্তি নিজেদের ক্ষতিগ্রস্ত দাবি করে এই সরকারি সাহায্যের জন্য আবেদন করেন। আবেদনের প্রেক্ষিতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাদের প্রত্যেককে এক বান্ডিল ঢেউটিন এবং নগদ ৩,০০০ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়।
অভিযুক্ত ব্যক্তিদের পরিচিতি
ত্রাণের উপকরণ ও অর্থ ফেরত দেওয়া ব্যক্তিরা এলাকায় আর্থিকভাবে সচ্ছল হিসেবে পরিচিত। তাদের তালিকা নিচে দেওয়া হলো:
| ক্রমিক | নাম | সামাজিক/রাজনৈতিক পরিচয় | এলাকার অবস্থান |
| ০১ | দধি প্রসাদ বর্মন | সভাপতি, ৮ নং ওয়ার্ড বিএনপি, ভাদাই ইউনিয়ন | আদিতমারী, লালমনিরহাট |
| ০২ | শামসুল হক | স্থানীয় বাসিন্দা (সচ্ছল হিসেবে পরিচিত) | ভাদাই ইউনিয়ন |
| ০৩ | গোলাপী রানী | স্থানীয় বাসিন্দা (সচ্ছল হিসেবে পরিচিত) | ভাদাই ইউনিয়ন |
| ০৪ | শংকর কুমার রায় | স্থানীয় বাসিন্দা (সচ্ছল হিসেবে পরিচিত) | ভাদাই ইউনিয়ন |
সমালোচনা ও প্রশাসনের পদক্ষেপ
ত্রাণ বিতরণের পর স্থানীয় এলাকাবাসী ও সচেতন মহল বিষয়টিকে অনৈতিক হিসেবে চিহ্নিত করেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিষয়টি নিয়ে সমালোচনা শুরু হলে স্থানীয় প্রশাসনের নজরে আসে। সচ্ছল হওয়া সত্ত্বেও সরকারি ত্রাণ গ্রহণ করায় ত্রাণ বিতরণ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। পরিস্থিতির গুরুত্ব অনুধাবন করে উপজেলা প্রশাসন অভিযুক্তদের দ্রুত ত্রাণ ফেরত দেওয়ার নির্দেশ দেয়।
প্রশাসনের নির্দেশনা অনুযায়ী, অভিযুক্ত চার ব্যক্তি গত সপ্তাহের তিন দিনের ব্যবধানে (মঙ্গলবার থেকে বৃহস্পতিবার) তাদের প্রাপ্ত ঢেউটিন ও নগদ টাকা উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার কার্যালয়ে ফেরত প্রদান করেন।
সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য
ত্রাণ ফেরত দেওয়া প্রসঙ্গে বিএনপি নেতা দধি প্রসাদ বর্মন জানান, প্রাকৃতিক দুর্যোগে তার ঘরের চাল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় তিনি নিয়মতান্ত্রিকভাবে আবেদন করেছিলেন। তবে পরবর্তী পরিস্থিতির কারণে তিনি সেগুলো ফেরত দিয়েছেন।
সুবিধাভোগী শংকর কুমার রায় জানান, আর্থিক অবস্থা সবসময় একরকম থাকে না বলেই তিনি সহায়তা চেয়েছিলেন। যারা তাকে এই সহায়তা দিয়েছিলেন, তাদের নির্দেশেই আবার তা ফেরত দিয়েছেন। অন্যদিকে, গোলাপী রানীর স্বামী গোবিন্দ রায় উল্লেখ করেন যে, আবেদন করে বরাদ্দ পেলেও সমালোচনার মুখে তারা পণ্যগুলো ফেরত দিতে বাধ্য হয়েছেন। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, মানুষ বাহ্যিক সচ্ছলতা দেখলেও ভেতরের অবস্থা বিবেচনা করে না।
প্রশাসনের প্রতিক্রিয়া ও ভবিষ্যৎ সতর্কতা
আদিতমারী উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা এনামুল হক নিশ্চিত করেছেন যে, সুবিধাভোগীরা তাদের ভুল স্বীকার করে সরকারি মালামাল ও অর্থ ফেরত দিয়েছেন।
আদিতমারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বিধান কান্তি হালদার এই বিষয়ে সাংবাদিকদের জানান, ত্রাণ বিতরণে কোনো অনিয়ম বা ভুল তথ্য দিয়ে সহায়তা নেওয়ার সুযোগ নেই। ভবিষ্যতে এই ধরনের স্পর্শকাতর বিষয়ে আরও বেশি সতর্ক থাকার জন্য সংশ্লিষ্ট জনপ্রতিনিধি ও মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ভবিষ্যতে ত্রাণ বিতরণের তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রে অধিকতর যাচাই-বাছাই নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তিনি।
