রাজধানীর ঐতিহ্যবাহী ইডেন মহিলা কলেজে ক্যাম্পাসে রাজনীতি নিষিদ্ধের দাবিতে মধ্যরাতে উত্তাল বিক্ষোভ প্রদর্শন করেছেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা। শনিবার (৯ মে ২০২৬) রাত ১১টার পর থেকে শুরু হওয়া এই আন্দোলনে শিক্ষার্থীরা কলেজের প্রধান ফটকের তালা ভেঙে এবং বিভিন্ন ব্যানার-ফেস্টুনে অগ্নিসংযোগ করে তাঁদের দাবি উত্থাপন করেন। মূলত ক্যাম্পাসে ছাত্ররাজনীতির পুনরুত্থান বা প্রভাব বিস্তারের আশঙ্কায় শিক্ষার্থীরা এই স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিবাদে অংশ নেন বলে জানা গেছে।
Table of Contents
আন্দোলনের সূত্রপাত ও প্রেক্ষাপট
ইডেন মহিলা কলেজ ক্যাম্পাসকে রাজনীতিমুক্ত রাখার দাবি শিক্ষার্থীদের দীর্ঘদিনের। প্রত্যক্ষদর্শী ও আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনার সূত্রপাত হয় শনিবার সন্ধ্যার পর। কলেজের প্রধান ফটকে বা দেয়ালে পূর্বে লেখা ‘রাজনীতিমুক্ত ক্যাম্পাস’ সম্বলিত দেয়ালচিত্র বা স্লোগান অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিরা রং দিয়ে মুছে ফেলে। এই খবরটি ক্যাম্পাসের ভেতরে ছড়িয়ে পড়লে সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। তাঁরা এটিকে ক্যাম্পাসে রাজনৈতিক কার্যক্রম পুনরায় চালুর একটি অপচেষ্টা হিসেবে অভিহিত করেন।
রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই অসন্তোষ আন্দোলনে রূপ নেয়। রাত ১১টার দিকে কলেজের বিভিন্ন হোস্টেল এবং প্রস্তাবিত ‘হজরত রাবেয়া বসরি ছাত্রীনিবাসের’ শত শত শিক্ষার্থী হোস্টেল থেকে বেরিয়ে আসেন। তাঁরা মিছিল নিয়ে কলেজের প্রধান ফটকের সামনে জড়ো হতে থাকেন।
মধ্যরাতের বিক্ষোভ ও পরিস্থিতি
বিক্ষোভ চলাকালীন শিক্ষার্থীরা কলেজের কয়েকটি গেট ভেঙে ফেলার চেষ্টা করেন এবং নিরাপত্তা তালা ভেঙে প্রধান ফটকের বাইরে চলে আসেন। এ সময় শিক্ষার্থীদের স্লোগানে প্রকম্পিত হয়ে ওঠে পুরো এলাকা। বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা কলেজ গেটে থাকা বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠনের ব্যানার, ফেস্টুন ও পোস্টার ছিঁড়ে ফেলেন এবং সেগুলোতে আগুন ধরিয়ে দেন।
আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের প্রধান দাবি হলো—ইডেন কলেজ ক্যাম্পাসে কোনো ধরনের ছাত্ররাজনীতি বা রাজনৈতিক প্রভাব থাকতে পারবে না। তাঁরা সাফ জানিয়ে দেন যে, ক্যাম্পাসে কেবল শিক্ষা ও সহশিক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত হবে, কোনো রাজনৈতিক শক্তির আধিপত্য তাঁরা মেনে নেবেন না। শিক্ষার্থীদের এই বিক্ষোভের সময় ক্যাম্পাসের আশেপাশে সাধারণ মানুষের মধ্যে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয় এবং নিরাপত্তার খাতিরে বিপুল সংখ্যক আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়।
শিক্ষার্থীদের দাবি ও পরবর্তী অবস্থান
বিক্ষোভে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীরা জানান, রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে অতীতে বিভিন্ন সময়ে কলেজের সাধারণ শিক্ষার্থীরা নানাভাবে হয়রানি ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। ক্যাম্পাসের সুষ্ঠু পরিবেশ বজায় রাখতে এবং শিক্ষার মানোন্নয়নে রাজনীতিমুক্ত আঙিনা অপরিহার্য। সন্ধ্যাবেলা ‘রাজনীতিমুক্ত ক্যাম্পাস’ লেখাটি মুছে ফেলার ঘটনাকে তাঁরা প্ররোচনামূলক ও সাধারণ শিক্ষার্থীদের ইচ্ছার পরিপন্থী বলে দাবি করেন।
শিক্ষার্থীদের সুনির্দিষ্ট দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে:
ক্যাম্পাসের ভেতরে এবং আশেপাশে রাজনৈতিক সকল কর্মকাণ্ড স্থায়ীভাবে নিষিদ্ধ করা।
ব্যানার বা স্লোগান মুছে ফেলার ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের চিহ্নিত করে শাস্তি প্রদান।
সাধারণ শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে সুনির্দিষ্ট অঙ্গীকার।
কর্তৃপক্ষ ও প্রশাসনের ভূমিকা
আন্দোলন চলাকালীন কলেজের শিক্ষকবৃন্দ এবং স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে শিক্ষার্থীদের শান্ত করার চেষ্টা করেন। রাত গভীর হওয়া সত্ত্বেও শিক্ষার্থীদের অবস্থান অনড় থাকায় প্রশাসনের পক্ষ থেকে আলোচনার প্রস্তাব দেওয়া হয়। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা গেটের বাইরে নিরাপত্তা বলয় তৈরি করে যাতে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে।
তথ্য অনুযায়ী, কলেজের প্রশাসনিক কর্মকর্তারা শিক্ষার্থীদের দাবিগুলো পর্যালোচনার আশ্বাস দিলে এবং দেয়ালচিত্রগুলো পুনরায় স্থাপনের প্রতিশ্রুতি দিলে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়। তবে শিক্ষার্থীরা জানিয়েছেন, তাঁদের দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত এবং ক্যাম্পাসে রাজনীতির ছায়া পুরোপুরি নির্মূল না হওয়া পর্যন্ত তাঁরা সতর্ক দৃষ্টি রাখবেন।
