খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ৭ই মে ২০২৬, ১:২৪ এএম

মধ্যপ্রাচ্যে বিদ্যমান সামরিক সংঘাত নিরসনে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে উত্থাপিত একটি নতুন সমঝোতা প্রস্তাবকে ‘মার্কিনিদের আকাঙ্ক্ষার তালিকা’ হিসেবে অভিহিত করে তা সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে তেহরান। বুধবার (৬ মে, ২০২৬) মার্কিন সংবাদমাধ্যম এক্সিওস এবং আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে এই কূটনৈতিক উত্তেজনার বিষয়টি বিস্তারিতভাবে উঠে আসে। ইরানের সংসদ সদস্য (এমপি) এবং প্রভাবশালী নীতিনির্ধারক ইব্রাহিম রেজাই এই প্রস্তাবকে বাস্তবতাবিবর্জিত বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। তাঁর মতে, ওয়াশিংটন রণক্ষেত্রে যা অর্জন করতে পারেনি, আলোচনার টেবিলে বসে তা আদায়ের চেষ্টা করা বৃথা।
Table of Contents
মার্কিন সংবাদমাধ্যম এক্সিওস এক বিশেষ প্রতিবেদনে দাবি করেছে যে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান একটি দীর্ঘমেয়াদী সমঝোতা স্মারকে পৌঁছানোর জন্য পর্দার আড়ালে কাজ করছে। প্রস্তাবিত এই পরিকল্পনার প্রাথমিক লক্ষ্য হলো একটি টেকসই যুদ্ধবিরতির মাধ্যমে বর্তমান সংঘাতের চূড়ান্ত অবসান ঘটানো। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, এই প্রক্রিয়ার শুরুতে ৩০ দিনের একটি ‘গ্রেস পিরিয়ড’ বা অন্তর্বর্তীকালীন সময় নির্ধারণের কথা বলা হয়েছে। এই সময়সীমার মধ্যে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও গুরুত্বপূর্ণ চারটি বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনার প্রস্তাব দেয় ওয়াশিংটন:
নিষেধাজ্ঞা ও অর্থ মুক্তি: ইরানের ওপর আরোপিত বিভিন্ন স্তরের মার্কিন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং ব্যবস্থায় জব্দ থাকা ইরানি অর্থ ফেরত প্রদান।
পারমাণবিক কর্মসূচি: ইরানের পারমাণবিক কার্যক্রমের ওপর নির্দিষ্ট সীমা আরোপ এবং আন্তর্জাতিক তদারকি নিশ্চিতকরণ।
নৌ-নিরাপত্তা: বিশ্ব জ্বালানি বাণিজ্যের অন্যতম প্রবেশদ্বার ‘হরমুজ প্রণালি’ সকল দেশের জাহাজ চলাচলের জন্য উন্মুক্ত রাখা এবং এর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
স্থায়ী সংঘাত নিরসন: অঞ্চলটিতে দীর্ঘমেয়াদী সামরিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা।
যুক্তরাষ্ট্রের এই কূটনৈতিক উদ্যোগের খবর প্রকাশিত হওয়ার পরপরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) তীব্র প্রতিক্রিয়া জানান ইরানি এমপি ইব্রাহিম রেজাই। তিনি মার্কিন গণমাধ্যমের এই দাবিকে সরাসরি নাকচ করে দিয়ে একে ওয়াশিংটনের একপাক্ষিক মানসিকতার প্রতিফলন হিসেবে বর্ণনা করেন। ইব্রাহিম রেজাই তাঁর বার্তায় উল্লেখ করেন:
“এক্সিওসের প্রতিবেদনে যে বার্তার উল্লেখ করা হয়েছে, তা বাস্তব পরিস্থিতির চেয়ে মার্কিনিদের অলীক আকাঙ্ক্ষার তালিকা হিসেবেই বেশি প্রতীয়মান। যুক্তরাষ্ট্র এই যুদ্ধে পরাজয়ের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে এমন কিছুই পাবে না, যা তারা ইতিপূর্বে সামনাসামনি আলোচনার টেবিলে অর্জন করতে সমর্থ হয়নি।”
রেজাইয়ের এই অনমনীয় অবস্থান থেকে এটি স্পষ্ট যে, তেহরান মার্কিন এই প্রস্তাবকে কোনো দ্বিপাক্ষিক সমঝোতা নয়, বরং একটি একতরফা শর্ত হিসেবে দেখছে। তাঁর মতে, যুদ্ধক্ষেত্রে চাপে পড়ে যুক্তরাষ্ট্র এখন আলোচনার ছলে কৌশলগত সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করছে।
ইরানের আধা-সরকারি বার্তাসংস্থা তাসনিম নিউজ জানিয়েছে যে, মার্কিন এই প্রস্তাবের বিষয়ে ইরান সরকার এখন পর্যন্ত দাপ্তরিকভাবে কোনো আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দেয়নি। তবে সরকারের ঘনিষ্ঠ এবং নীতিনির্ধারণী মহলে এই প্রস্তাব নিয়ে যে তীব্র অসন্তোষ ও অনাস্থা রয়েছে, তা একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার বক্তব্যে ফুটে উঠেছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই ইরানি কর্মকর্তা তাসনিম নিউজকে বলেন:
“যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবিত শর্তাবলির বেশ কিছু অংশ ইরানের জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তার পরিপন্থী, যা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। ওয়াশিংটন যদি এখনও মনে করে যে তারা হুমকির ভাষায় তেহরানকে কোনো সিদ্ধান্তে বাধ্য করতে পারবে, তবে তারা ভুল করছে। এ ধরনের অযাচিত চাপ বর্তমান পরিস্থিতিকে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য আরও ভয়াবহ ও জটিল করে তুলবে।”
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যেকার দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক অচলাবস্থা এবং সামরিক স্নায়ুযুদ্ধ বর্তমানে এক চরম অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, পারমাণবিক ইস্যু এবং হরমুজ প্রণালির মতো কৌশলগত অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে উভয় দেশের অনমনীয় মনোভাবই যেকোনো টেকসই সমাধানের পথে প্রধান অন্তরায়। একদিকে যুক্তরাষ্ট্র সমঝোতার মাধ্যমে উত্তেজনা প্রশমনের দাবি করছে, অন্যদিকে ইরান দাবি করছে কোনো শর্ত ছাড়াই তাদের ওপর থেকে সকল অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করতে হবে।
আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ সংস্থা রয়টার্স এবং তাসনিম নিউজের তথ্যমতে, ইরান সরকার এখনও চূড়ান্ত মৌনতা অবলম্বন করলেও ইব্রাহিম রেজাইয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের তাৎক্ষণিক প্রত্যাখ্যানের ফলে এটি স্পষ্ট যে, মার্কিন প্রস্তাবটি শুরুতেই হোঁচট খেয়েছে। হুমকি এবং আলোচনার এই দ্বিমুখী কূটনৈতিক লড়াই মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে উত্তেজনার পারদ আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। তেহরান তাদের পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে তা স্পষ্ট না করলেও, রেজাইয়ের এই মন্তব্যকে ইরানের জাতীয় প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্রনীতির একটি শক্তিশালী প্রতিফলন হিসেবেই দেখছে বিশ্ব সম্প্রদায়। ওয়াশিংটনের এই প্রস্তাবিত পথ তেহরানের কাছে গ্রহণযোগ্যতা না পেলে অঞ্চলটিতে চলমান অস্থিরতা আরও দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।
মন্তব্য