ফরিদপুর জেলার বোয়ালমারী উপজেলায় একটি মোটরসাইকেল উদ্ধারকে কেন্দ্র করে রবিউল ইসলাম (৩৬) নামক এক যুবককে সুপরিকল্পিতভাবে হত্যার অভিযোগ উঠেছে। ঘটনার পর বিষয়টিকে সাধারণ সড়ক দুর্ঘটনা হিসেবে চালিয়ে দেওয়ার অপচেষ্টা করা হলেও পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে এটি একটি সুনিশ্চিত হত্যাকাণ্ড হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে। চাঞ্চল্যকর এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় পুলিশ অভিযান চালিয়ে এখন পর্যন্ত চারজনকে আটক করতে সক্ষম হয়েছে। বুধবার (৬ মে, ২০২৬) বোয়ালমারী থানা পুলিশের পক্ষ থেকে সংবাদমাধ্যমকে এই তথ্য নিশ্চিত করা হয়।
Table of Contents
হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে পারিবারিক ও আর্থিক বিরোধ
নিহত রবিউল ইসলাম মাগুরা জেলার মহম্মদপুর উপজেলার সিন্ধাইন গ্রামের গোলাম সরোয়ার শেখের পুত্র। পেশায় একজন ট্রাক্টর চালক রবিউলের সংসারে স্ত্রী ও ১১ বছর বয়সী একটি সন্তান রয়েছে। এই হত্যাকাণ্ডের মূলে রয়েছে বোয়ালমারী উপজেলার ময়না ইউনিয়নের হাটখোলারচর গ্রামের শহিদুল শেখের সাথে মহম্মদপুর উপজেলার জনৈক সাইদ মোল্লার মেয়ের প্রায় দুই বছর আগে সংগঠিত একটি প্রেমঘটিত বিবাহ। পরিবারের অমতে বিয়ে করার পর থেকেই ওই দম্পতির মধ্যে কলহ বিরাজ করছিল, যার জেরে সম্প্রতি শহিদুলের স্ত্রী তার বাবার বাড়িতে চলে যান।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট ও স্থানীয় সূত্র জানায়, শহিদুল তার শ্যালকের একটি মোটরসাইকেল নিজ হেফাজতে নিয়ে অন্যত্র বন্ধক রাখেন। এই মোটরসাইকেলটি ফেরত দেওয়া নিয়ে উভয় পরিবারের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ ও উত্তেজনা চলছিল। মঙ্গলবার (৫ মে) দুপুরে সাইদ মোল্লা তার প্রতিবেশী রবিউল ইসলামকে সাথে নিয়ে জামাতা শহিদুলের বাড়িতে যান মোটরসাইকেলটি উদ্ধার করতে। সেখানে শহিদুলের সাথে তাদের তীব্র বাগবিতণ্ডা হয় এবং তারা মোটরসাইকেল ছাড়াই ফিরে যান।
পরিকল্পিত ফাঁদ ও অপহরণের ঘটনাক্রম
পুলিশের ধারণা অনুযায়ী, মঙ্গলবার বিকেলেই শহিদুল একটি পরিকল্পিত হত্যার ব্লু-প্রিন্ট তৈরি করেন। তিনি মোবাইল ফোনে তার শ্বশুর সাইদ মোল্লাকে জানান যে, তিনি মোটরসাইকেলটি ফেরত দেবেন এবং তাদের পুনরায় আসতে বলেন। তারা হাটখোলারচর গ্রামে পৌঁছালে শহিদুল কৌশলে শ্বশুরকে স্থানীয় এক মাতুব্বরের বাড়িতে বসিয়ে রেখে রবিউল ইসলামকে আলোচনার নাম করে নির্জন স্থানে ডেকে নিয়ে যান।
বেশ কিছুক্ষণ পার হওয়ার পর শহিদুল তার শ্বশুরকে কল দিয়ে বলেন, “আপনি বাড়ি চলে যান, কাল সকালে মোটরসাইকেল পৌঁছে দেওয়া হবে।” শ্বশুরের মনে সন্দেহ তৈরি না হলেও তখন থেকেই রবিউল ইসলাম নিখোঁজ হয়ে যান। রবিউলের পরিবারের সদস্যরা দীর্ঘ সময় তার কোনো খোঁজ না পেয়ে উৎকণ্ঠায় পড়েন।
দুর্ঘটনাকবলিত গাড়ি ও মরদেহ উদ্ধার
মঙ্গলবার রাত আনুমানিক সাড়ে ৯টার দিকে হাটখোলারচর গ্রামের সাতৈর-মহম্মদপুর সড়কের বটতলা এলাকায় একটি প্রাইভেটকার নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে খাদে পড়ে থাকতে দেখেন পথচারীরা। স্থানীয়রা উদ্ধার কাজ চালাতে গিয়ে গাড়ির পাশেই রক্তাক্ত অবস্থায় একটি মরদেহ পড়ে থাকতে দেখে পুলিশকে খবর দেন। পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে মরদেহের পকেটে থাকা মোবাইল ফোনের মাধ্যমে নিশ্চিত করে যে, এটিই নিখোঁজ রবিউল ইসলাম।
প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্যমতে, দুর্ঘটনাকবলিত গাড়িটিতে ৪-৫ জন যুবক ছিলেন। স্থানীয় জনতা সেখান থেকে শাহাজাদা (২৩) ও তপু সাহা (২২) নামে দুই যুবককে হাতেনাতে আটক করে পুলিশের কাছে সোপর্দ করে, বাকিরা পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। স্থানীয়দের ধারণা, রবিউলকে অন্য কোথাও হত্যার পর মরদেহটি ওই স্থানে ফেলে পালানোর সময় ঘাতকদের বহনকারী গাড়িটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে খাদে পড়ে যায়। পুরো বিষয়টি সড়ক দুর্ঘটনা হিসেবে সাজানোর লক্ষ্যেই মরদেহটি রাস্তার পাশে ফেলে রাখা হয়েছিল।
পুলিশি তদন্ত ও বর্তমান পরিস্থিতি
ঘটনার পর থেকে মূল অভিযুক্ত শহিদুল শেখ ও তার পরিবারের সদস্যরা ঘরবাড়ি ছেড়ে পলাতক রয়েছেন। তাদের ব্যক্তিগত মোবাইল ফোনগুলোও বন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। ফরিদপুর জেলার মধুখালী সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার মো. আজম খান ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে জানান, নিহতের শরীরে একাধিক আঘাতের চিহ্ন রয়েছে এবং এটি নিশ্চিতভাবেই একটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। উদ্ধারকৃত প্রাইভেটকারটির মালিকানা এবং হত্যাকাণ্ডে সেটির ব্যবহার নিয়ে নিবিড় তদন্ত চলছে।
বোয়ালমারী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আনোয়ার হোসেন জানিয়েছেন, মরদেহটি ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে পাঠানো হয়েছে। আটককৃত চারজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে এবং মূল ঘাতকদের গ্রেপ্তারে চিরুনি অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। নিহত রবিউলের পিতা গোলাম সরোয়ার শেখ তার পুত্রের খুনিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন। বর্তমানে ওই এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করে নজরদারি জোরদার করা হয়েছে।
