প্রেমের ফাঁদে ফেলে ব্ল্যাকমেইল: নরসিংদীতে হানি ট্র্যাপ চক্রের ৪ সদস্য গ্রেপ্তার

নরসিংদী জেলায় নারীদের ব্যবহার করে সাধারণ মানুষকে প্রেমের ফাঁদে ফেলা, অপহরণ ও শারীরিক নির্যাতনের পর আপত্তিকর ভিডিও ধারণ করে অর্থ আদায়কারী একটি সংঘবদ্ধ ‘হানি ট্র্যাপ’ চক্রের চার সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে জেলা গোয়েন্দা শাখা (ডিবি)। মঙ্গলবার (৫ মে, ২০২৬) রাতে নরসিংদী শহরের সাহেপ্রতাপ ও রেলস্টেশন এলাকায় বিশেষ অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। বুধবার (৬ মে) বিকেলে জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে এই চক্রের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের বিস্তারিত তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে।

গ্রেপ্তারকৃতদের পরিচয় ও পূর্ব অপরাধের খতিয়ান

পুলিশের অভিযানে গ্রেপ্তারকৃত চারজন হলেন— শারমিন আক্তার ওরফে বৃষ্টি (২৪), স্মৃতি আক্তার (২০), মো. কাইয়ুম (২৫) ও ফয়সাল মিয়া (৩৪)। গ্রেপ্তারের সময় ফয়সাল মিয়ার কাছ থেকে এক ভুক্তভোগীর ব্যবহৃত মোবাইল ফোন উদ্ধার করা হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ শেষে ফয়সাল মিয়া ইতিমধ্যে আদালতে নিজের অপরাধ স্বীকার করে জবানবন্দি প্রদান করেছেন।

তদন্তে উঠে এসেছে যে, এই চক্রের সদস্যরা দীর্ঘদিনের পেশাদার অপরাধী। গ্রেপ্তারকৃত স্মৃতি আক্তারের বিরুদ্ধে এর আগেও অপহরণ ও চুরির মামলা ছিল। অন্যদিকে, চক্রের অন্যতম মূল হোতা ফয়সাল মিয়ার বিরুদ্ধে পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইন, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, মাদক এবং চুরিসহ নরসিংদী ও চট্টগ্রামের বিভিন্ন থানায় অন্তত সাতটি মামলা চলমান রয়েছে।

অপরাধ সংগঠনের সুপরিকল্পিত প্রক্রিয়া

গ্রেপ্তারকৃতদের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে এই চক্রের ভয়াবহ অপরাধ পদ্ধতি সম্পর্কে চাঞ্চল্যকর তথ্য মিলেছে। চক্রটি মূলত কয়েকটি সুনির্দিষ্ট ধাপে তাদের ‘হানি ট্র্যাপ’ বা প্রেমের ফাঁদ পরিচালনা করত:

  • টার্গেট নির্ধারণ: চক্রের নারী সদস্যরা প্রথমে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে বিত্তশালী বা সহজ-সরল ব্যক্তিদের খুঁজে বের করত। এরপর তাদের সাথে প্রেমের অভিনয় করে সখ্যতা গড়ে তুলত।

  • নিভৃত স্থানে আমন্ত্রণ: সম্পর্কের গভীরতা প্রমাণের অজুহাতে নারী সদস্যরা ভুক্তভোগীদের দেখা করার জন্য নির্জন কোনো স্থান বা তাদের পূর্বনির্ধারিত ডেরায় ডেকে আনত।

  • অপহরণ ও নির্যাতন: ভুক্তভোগী নির্দিষ্ট স্থানে পৌঁছানোর সাথে সাথে চক্রের পুরুষ সদস্যরা তাকে অস্ত্রের মুখে জিম্মি করত। এরপর শুরু হতো শারীরিক নির্যাতন।

  • বিবস্ত্র করে ভিডিও ধারণ: অপরাধের সবচেয়ে কুৎসিত অংশ ছিল ভুক্তভোগীকে জোরপূর্বক বিবস্ত্র করে চক্রের নারী সদস্যদের সাথে আপত্তিকর অবস্থায় ভিডিও বা স্থিরচিত্র ধারণ করা।

  • ব্ল্যাকমেইল ও অর্থ আদায়: পরবর্তীতে ধারণকৃত ওই ভিডিও ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে ভুক্তভোগীর কাছে মোটা অংকের টাকা দাবি করা হতো। টাকা দিতে অস্বীকার করলে ভুক্তভোগীকে প্রাণনাশের হুমকিও দেওয়া হতো।

পুলিশি অভিযান ও আইনি পদক্ষেপ

নরসিংদী জেলা গোয়েন্দা পুলিশের পরিদর্শক (নিরস্ত্র) এরশাদ উল্লাহ জানান, সম্প্রতি শহরের নাগরিয়াকান্দা এলাকায় এক যুবক এই ভয়ংকর চক্রের শিকার হয়ে সর্বস্ব হারানোর পর বিষয়টি পুলিশের নজরে আসে। ভুক্তভোগীর দায়ের করা মামলার ভিত্তিতে তদন্তে নামে জেলা ডিবি পুলিশ। অত্যন্ত স্বল্প সময়ের মধ্যে সাহেপ্রতাপ ও রেলস্টেশন এলাকায় ঝটিকা অভিযান চালিয়ে চক্রের চার সক্রিয় সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়।

আদালতের মাধ্যমে আসামিদের সাত দিনের রিমান্ড আবেদন জানানো হয়েছে। পুলিশ ধারণা করছে, এই চক্রের সাথে আরও অনেক সদস্য জড়িত থাকতে পারে। তাদের শনাক্ত করতে এবং গ্রেপ্তারে গোয়েন্দা পুলিশের বিশেষ অভিযান বর্তমানে অব্যাহত রয়েছে।

নাগরিকদের প্রতি পুলিশের বিশেষ সতর্কতা

এই চক্রের গ্রেপ্তারের পর নরসিংদী জেলা পুলিশ সাধারণ নাগরিকদের তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহারে আরও সতর্ক হওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপরিচিত কারো সাথে সখ্যতা গড়ার ক্ষেত্রে বিশেষ সাবধানতা অবলম্বনের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়:

১. সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপরিচিত কাউকে ব্যক্তিগত তথ্য প্রদান বা নিবিড় সখ্যতা গড়ে তোলা থেকে বিরত থাকতে হবে। ২. স্বল্প সময়ের পরিচয়ে অপরিচিত কারো ডাকে নির্জন কোনো স্থানে দেখা করতে যাওয়া অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। ৩. যদি কেউ এমন পরিস্থিতির শিকার হন, তবে লোকলজ্জার ভয় না পেয়ে দ্রুত নিকটস্থ থানা অথবা জাতীয় জরুরি সেবা নম্বর ৯৯৯-এ যোগাযোগ করে সহায়তা নিতে হবে।

নরসিংদী জেলা পুলিশ প্রশাসন জানিয়েছে, অপরাধীদের কঠোর শাস্তির মাধ্যমে জেলাকে এ ধরনের সংঘবদ্ধ অপরাধমুক্ত করতে তারা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। ইতিমধ্যে এই চক্রের হাতে প্রতারিত হওয়া অনেক ভুক্তভোগী পুলিশের সাথে যোগাযোগ করতে শুরু করেছেন বলে জানা গেছে। তদন্ত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে দ্রুত আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করা হবে।