দক্ষিণ কেরানীগঞ্জে বাসস্ট্যান্ডের দখল ও চাঁদাবাজিতে ককটেল বিস্ফোরণ: আহত ৬

ঢাকার দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের তেঘরিয়া বাসস্ট্যান্ডের নিয়ন্ত্রণ এবং নিয়মিত চাঁদাবাজিকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের মধ্যে ভয়াবহ সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। বুধবার (৬ মে, ২০২৬) দুপুরে ঢাকা-মাওয়া এক্সপ্রেসওয়ে সংলগ্ন এই এলাকায় সংঘর্ষ চলাকালীন দফায় দফায় ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনায় পুরো এলাকায় চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। এই সহিংসতায় অন্তত ৬ জন আহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে বর্তমানে ওই এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।

সংঘর্ষের সূত্রপাত ও ককটেল আতঙ্ক

প্রত্যক্ষদর্শী ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, বুধবার দুপুরে তেঘরিয়া বাসস্ট্যান্ডে আধিপত্য বিস্তার নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে প্রথমে কথা কাটাকাটি হয়। মুহূর্তের মধ্যেই তা লাঠিসোটা ও দেশীয় অস্ত্র নিয়ে সংঘর্ষে রূপ নেয়। সংঘর্ষের একপর্যায়ে দুর্বৃত্তরা ককটেল বিস্ফোরণ ঘটালে সাধারণ যাত্রী ও পথচারীরা দিগ্বিদিক ছুটতে শুরু করেন। বিস্ফোরণের বিকট শব্দ ও ধোঁয়ায় পুরো বাসস্ট্যান্ড এলাকা আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে।

সহিংসতায় আহতদের মধ্যে ৪ জনের পরিচয় পাওয়া গেছে। তারা হলেন:

  • মো. মালেক গাজী (৫৩)

  • মো. শাহীন (৩০)

  • মো. সাজ্জাদ হোসেন (২২)

  • মাহমুদ হাসান (২৭)

আহতদের দ্রুত উদ্ধার করে স্থানীয় হাসপাতাল ও উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, জনাকীর্ণ স্থানে ককটেল ফাটিয়ে জনমনে ভীতি সৃষ্টির অপরাধে জড়িতদের শনাক্ত করতে কাজ চলছে।

চাঁদাবাজির প্রেক্ষাপট ও পাল্টাপাল্টি অভিযোগ

তেঘরিয়া বাসস্ট্যান্ডের চাঁদাবাজি নিয়ে বিরোধ দীর্ঘদিনের। অভিযোগ রয়েছে, ঢাকা-মাওয়া এক্সপ্রেসওয়েতে অবৈধভাবে বাস থামিয়ে যাত্রী ওঠানামা করানোর সুযোগ করে দিয়ে প্রতিটি বাস থেকে মোটা অঙ্কের টাকা আদায় করা হয়। মাসিক কয়েক লক্ষ টাকার এই অবৈধ আয়ের নিয়ন্ত্রণ নিয়েই স্থানীয় প্রভাবশালী দুটি পক্ষ নিয়মিত দ্বন্দ্বে লিপ্ত থাকে।

বাসস্ট্যান্ডের কর্মচারী মো. মিজানের অভিযোগ, রিফাত মোল্লা নামক এক ব্যক্তির অনুসারীরা দীর্ঘ দিন ধরে বাস প্রতি ১০০ টাকা হারে চাঁদা আদায় করে আসছিল। এই অবৈধ আদায়ের প্রতিবাদ করায় বুধবার দুপুরে রিফাত মোল্লার লোকজন বাসস্ট্যান্ডের কাউন্টারে ভাঙচুর চালায়। কাউন্টার কর্মীরা তাদের বাধা দিতে গেলে সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়।

অন্যদিকে, অভিযুক্ত রিফাত মোল্লা তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা চাঁদাবাজির অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি দাবি করেন, রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে স্থানীয় কিছু বিএনপি নেতা পরিকল্পিতভাবে তাঁর কর্মচারীদের ওপর হামলা চালিয়েছে। রিফাত মোল্লার ভাষ্যমতে, মো. বিশালের নেতৃত্বে একদল সন্ত্রাসী তাঁর কর্মচারীদের মারধর করে দুটি মোটরসাইকেল ছিনিয়ে নিয়েছে। তিনি আরও অভিযোগ করেন, থানায় অভিযোগ দিতে গেলে পুলিশের উপস্থিতিতেই তাঁকে লাঞ্ছিত করে থানা থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে।

রাজনৈতিক অবস্থান ও প্রশাসনের পদক্ষেপ

সংঘর্ষের খবর পেয়ে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানা বিএনপির সভাপতি অ্যাডভোকেট নিপুণ রায় চৌধুরী। তিনি সংবাদমাধ্যমকে বলেন, “তেঘরিয়া বাসস্ট্যান্ডে চাঁদাবাজি বন্ধে আমরা অনেক আগেই পুলিশকে অনুরোধ করেছিলাম। রিফাত মোল্লা কোনো রাজনৈতিক দলের পরিচয় ব্যবহার করে চাঁদাবাজি করলে তা বরদাশত করা হবে না।” তিনি আরও স্পষ্ট করেন যে, রিফাত মোল্লা বা তাঁর পরিবার বিএনপির কোনো পর্যায়ের রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত নয় এবং সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে দল কঠোর অবস্থান নেবে।

দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাইফুল ইসলাম জানান, বাসস্ট্যান্ডের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দুই পক্ষের পুরনো বিরোধের জের ধরেই এই সংঘর্ষ। ঘটনাস্থল থেকে আলামত সংগ্রহ করা হয়েছে এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।

তিনি আরও জানান, এই ঘটনায় মো. বিশাল বাদী হয়ে একটি মামলা দায়ের করেছেন। ওসি বলেন, “কারা ককটেল বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে এবং কাউন্টার ভাঙচুর করেছে, তা তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হয়ে দোষীদের আইনের আওতায় আনা হবে। বাসস্ট্যান্ডে কোনো ধরণের চাঁদাবাজি ও অবৈধ পার্কিং চলতে দেওয়া হবে না।” বর্তমানে বাসস্ট্যান্ড এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করলেও যান চলাচল স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করছে পুলিশ। পরিবহন শ্রমিক ও যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে এলাকায় গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।