গয়না খুলে অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীর লাশ হাসপাতালে ফেলে পালালেন স্বামী

রাজশাহীতে যৌতুকের নির্মম দাবি ও ধারাবাহিক নির্যাতনের শিকার হয়ে হাসিনা খাতুন (২১) নামের এক অন্তঃসত্ত্বা গৃহবধূর মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। গত মঙ্গলবার (৫ মে, ২০২৬) দিবাগত রাতে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। অভিযোগ উঠেছে, হাসিনা মারা যাওয়ার পর শোকাতুর হওয়ার পরিবর্তে স্বামী মো. রাতুল ও তার সহযোগীরা মৃতদেহের শরীর থেকে স্বর্ণালংকার খুলে নিয়ে দ্রুত হাসপাতাল থেকে চম্পট দেন। এই অমানবিক ঘটনার পর থেকে অভিযুক্ত স্বামীসহ শ্বশুরবাড়ির সকল সদস্য আত্মগোপনে রয়েছেন।

পারিবারিক বিবাদ ও যৌতুকের দাবি

নিহত হাসিনা খাতুন নওগাঁ জেলার সাপাহার উপজেলার আন্দারদিঘি গ্রামের হাসান আলীর সন্তান। মাত্র সাত মাস আগে রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার রাজাবাড়ি মোল্লাপাড়া গ্রামের মো. রাতুলের সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়। বিয়ের সময় পরিবারের পক্ষ থেকে সুন্দর ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখা হলেও স্বল্প সময়ের মধ্যেই হাসিনার জীবনে নেমে আসে চরম অশান্তি। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, মৃত্যুকালে হাসিনা দুই মাসের অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন।

হাসিনার স্বজনদের দাবি, বিয়ের পর থেকেই রাতুল যৌতুকের জন্য তাঁর ওপর শারীরিক ও মানসিক চাপ সৃষ্টি করতে শুরু করেন। বিশেষ করে বাবার বাড়ি থেকে নগদ ১ লক্ষ টাকা এনে দেওয়ার জন্য হাসিনাকে প্রায়ই অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ ও মারধর করা হতো। রাতুল নিজে মাদকাসক্ত হওয়ার পাশাপাশি মাদক কারবারের সঙ্গেও সরাসরি যুক্ত ছিলেন বলে অভিযোগ উঠেছে। নিহতের পরিবারের দাবি, ওই যৌতুকের টাকা দিয়ে রাতুল মূলত ফেনসিডিলের ব্যবসা প্রসারের পরিকল্পনা করেছিলেন।

নির্যাতনের অসহনীয় পর্যায় ও আত্মহনন

শ্বশুরবাড়ির ক্রমাগত নির্যাতন ও যৌতুকের অনায্য দাবি সহ্য করতে না পেরে গত সোমবার দিবাগত রাতে হাসিনা খাতুন নিজ ঘরে কীটনাশক পান করেন। বিষয়টি পরিবারের সদস্যদের নজরে এলে তাঁকে দ্রুত গোদাগাড়ী উপজেলার প্রেমতলী স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে অবস্থার অবনতি ঘটলে চিকিৎসকদের জরুরি পরামর্শে উন্নত চিকিৎসার জন্য রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে নিবিড় পর্যবেক্ষণে থাকা অবস্থায় মঙ্গলবার দিবাগত রাতে তিনি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন।

হাসিনার খালাতো ভাই রবিউল ইসলাম এক বীভৎস অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে জানান, হাসপাতালে ভর্তি থাকাকালীন রাতুল, তাঁর দুই বন্ধু এবং হাসিনার এক বোন উপস্থিত ছিলেন। কিন্তু হাসিনার মৃত্যুর খবর শোনার পরপরই রাতুল ও তাঁর বন্ধুরা কোনো আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন না করে বরং মরদেহের কান ও গলায় থাকা গয়নাগুলো ছিঁড়ে বা খুলে নেন। এরপর নির্লজ্জভাবে লাশটি হাসপাতালের ওয়ার্ডে রেখেই সকলে গা-ঢাকা দেন।

আইনি পদক্ষেপ ও পুলিশের বক্তব্য

এই লোমহর্ষক ঘটনার পর বুধবার (৬ মে) নিহতের বোন মেহেরুন্নেসা বাদী হয়ে গোদাগাড়ী থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দাখিল করেছেন। গোদাগাড়ী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আতিকুর রহমান গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেছেন যে, অভিযোগের ভিত্তিতে আত্মহত্যায় প্ররোচনা প্রদানের দায়ে একটি মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। তিনি আরও জানান, ঘটনার পর থেকে অভিযুক্ত স্বামী রাতুল ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা এলাকা ছেড়ে পালিয়েছেন। পলাতকদের গ্রেপ্তারে পুলিশের একাধিক দল অভিযান শুরু করেছে।

ওসি আতিকুর রহমান আরও উল্লেখ করেন, “হাসিনার মরদেহ বর্তমানে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের হিমঘরে সংরক্ষিত আছে। আইনগত প্রক্রিয়া শেষে বৃহস্পতিবার ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হবে। ময়নাতদন্তের পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন পাওয়ার পর শরীরে কোনো আঘাতের চিহ্ন আছে কি না বা মৃত্যুর অন্য কোনো কারণ আছে কি না তা স্পষ্ট হওয়া যাবে। এরপরই মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হবে।”

সামাজিক অস্থিরতা ও জনরোষ

হাসিনার এমন মর্মান্তিক মৃত্যুতে তাঁর পৈত্রিক নিবাস নওগাঁর আন্দারদিঘি গ্রামে শোকের মাতম চলছে। যৌতুকের বলি হয়ে একজন তরুণী ও তাঁর গর্ভস্থ সন্তানের প্রাণহানির ঘটনায় স্থানীয় মানুষের মধ্যে তীব্র জনরোষ সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে রাতুলের মতো মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জোরালো হচ্ছে।

হাসপাতাল সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, কীটনাশক পানের পর সঠিক সময়ে চিকিৎসা শুরু করতে না পারায় বিষক্রিয়া শরীরে ছড়িয়ে পড়েছিল, যা প্রাণহানির প্রধান কারণ। তবে মৃত্যুর পর একজন স্বামীর এমন চরম অমানবিক আচরণ চিকিৎসক ও হাসপাতাল কর্মীদেরও স্তম্ভিত করেছে। বর্তমানে পুলিশ অভিযুক্তদের অবস্থান শনাক্ত করতে তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তা নিচ্ছে। নিহতের পরিবার এই ঘটনাকে নিছক আত্মহত্যা না বলে পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড হিসেবে গণ্য করে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের আওতায় ন্যায়বিচারের দাবি জানিয়েছেন।