খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ৬ই মে ২০২৬, ২:১৭ পিএম

শেরপুর জেলার সীমান্তবর্তী ঝিনাইগাতী উপজেলায় চলতি বোরো মৌসুমে ধানের বাম্পার ফলন হয়েছে। দিগন্তজোড়া মাঠে সোনালি ধানের প্রাচুর্য থাকলেও কৃষকের ঘরে আনন্দের পরিবর্তে বিরাজ করছে চরম হতাশা। শ্রমিকের আকাশচুম্বী মজুরি এবং বাজারে ধানের অস্বাভাবিক দরপতনের ফলে ধান উৎপাদনে বিনিয়োগ করা অর্থ ফেরত পাওয়া নিয়েই এখন বড় সংশয় দেখা দিয়েছে। মাঠ পর্যায়ের কৃষকদের দাবি, এক মণ ধান বিক্রি করেও একজন শ্রমিকের দৈনিক পারিশ্রমিক মেটানো সম্ভব হচ্ছে না।
Table of Contents
ঝিনাইগাতীর বিভিন্ন ইউনিয়নের কৃষকদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, গত কয়েক বছরে কৃষি উপকরণের দাম কয়েক গুণ বেড়েছে। উচ্চমূল্যের সার, কীটনাশক, সেচ এবং যান্ত্রিক চাষাবাদ পদ্ধতির কারণে প্রতি বিঘা জমিতে ধান উৎপাদনে যে ব্যয় হয়েছে, বর্তমান বাজারমূল্যে তা পুষিয়ে নেওয়া অসম্ভব হয়ে পড়েছে। বর্তমানে খোলা বাজারে প্রতি মণ ধান মাত্র ৭৫০ থেকে ৯০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। অথচ ধান কাটার জন্য একজন শ্রমিককে দৈনিক ১ হাজার ১০০ টাকা পর্যন্ত মজুরি দিতে হচ্ছে। ফলে ধান চাষ এখন লাভজনক হওয়ার পরিবর্তে ঋণের বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বর্তমানে উপজেলার সর্বত্র বোরো ধান কাটার মৌসুম চলছে। তবে সাম্প্রতিক অনিয়মিত ঝড়-বৃষ্টির কারণে নিচু এলাকার কৃষকেরা আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন। বৃষ্টির পানিতে নিচু জমির ধান তলিয়ে যাওয়ার উপক্রম হওয়ায় অতি দ্রুত ধান কাটার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। এই জরুরি অবস্থায় শ্রমিকের চাহিদা কয়েক গুণ বেড়ে যাওয়ায় মজুরিও সাধারণ সময়ের চেয়ে দ্বিগুণ হয়েছে। কালিনগড় ও মাঝলিকান্দ গ্রামের কৃষকদের মতে, একদিকে ফসল হারানোর ভয়, অন্যদিকে শ্রমিকের অত্যধিক দাম—এই দ্বিমুখী সংকটে পড়ে তারা দিশেহারা হয়ে পড়েছেন।
উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের দেওয়া তথ্যমতে, চলতি বোরো মৌসুমে ঝিনাইগাতীতে লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও ভালো ফলন আশা করা হচ্ছে। চাষাবাদ ও বাজারদরের বর্তমান পরিস্থিতি নিচের সারণিতে উপস্থাপন করা হলো:
| তথ্যের বিবরণ | পরিসংখ্যান/মূল্য |
| চাষকৃত জমির মোট আয়তন | ১৪,৬০০ হেক্টর |
| আবাদকৃত ধানের ধরন | উচ্চ ফলনশীল ও দেশীয় জাত |
| বাজারে ধানের বর্তমান দর (মণ প্রতি) | ৭৫০ – ৯০০ টাকা |
| একজন শ্রমিকের বর্তমান দৈনিক মজুরি | ১,০০০ – ১,১০০ টাকা |
| সরকারি ক্রয়মূল্য (মণ প্রতি) | ১,৪৪০ টাকা |
| ধান কাটার উপযুক্ত অবস্থা | ধান ৮০ শতাংশ পেকে গেলে |
ঝিনাইগাতী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. ফরহাদ হোসেন জানান, দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার পূর্বাভাস থাকায় কৃষকদের দ্রুত ধান কাটার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। সরকার এ বছর ১ হাজার ৪৪০ টাকা দরে ধান কেনার ঘোষণা দিলেও স্থানীয় পর্যায়ে সরকারি ক্রয় কার্যক্রম এখনো পুরোদমে শুরু হয়নি। কৃষকদের অভিযোগ, সরকারি ক্রয় কেন্দ্রগুলোতে ধান বিক্রির সুযোগ না পাওয়ায় তারা ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
কৃষকেরা জানিয়েছেন, ফলন ভালো হওয়া সত্ত্বেও যদি লোকসান গুনতে হয়, তবে আগামীতে ধান চাষের প্রতি সাধারণ মানুষের অনীহা তৈরি হবে। বিশেষ করে যারা ধার-দেনা বা ব্যাংক ঋণ নিয়ে চাষাবাদ করেছেন, তারা এখন মূলধন হারানোর ঝুঁকিতে রয়েছেন। প্রান্তিক চাষিদের দাবি, সরকারি ধান ক্রয় অভিযান দ্রুত শুরু করে সরাসরি কৃষকদের থেকে ধান সংগ্রহ করলে এই সংকট থেকে উত্তরণ সম্ভব হতে পারে। অন্যথায়, মাঠের সোনালি ফসল কৃষকের জীবনে কোনো সমৃদ্ধি বয়ে আনবে না।
মন্তব্য