নাগেশ্বরীতে পাথরবোঝাই ট্রাক ও মাইক্রোবাসের সংঘর্ষ: বাবা-মেয়েসহ নিহত ৫

কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরী উপজেলায় একটি পাথরবোঝাই ট্রাক ও যাত্রীবাহী মাইক্রোবাসের মধ্যে ভয়াবহ মুখোমুখি সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় একই পরিবারের বাবা-মেয়েসহ মোট ৫ জন প্রাণ হারিয়েছেন। গত মঙ্গলবার, ২৮ এপ্রিল ২০২৬ তারিখ দিবাগত রাত আনুমানিক সাড়ে ১১টার দিকে নাগেশ্বরী পৌরসভার বাঁশেরতল এলাকায় কুড়িগ্রাম-ভূরুঙ্গামারী সড়কে এই দুর্ঘটনাটি সংঘটিত হয়। হতাহতরা সবাই রংপুর থেকে উন্নত চিকিৎসা গ্রহণ শেষে মাইক্রোবাসযোগে নিজ বাড়িতে ফিরছিলেন। একই এলাকার ৫ জনের আকস্মিক মৃত্যুতে ভূরুঙ্গামারী উপজেলার সংশ্লিষ্ট গ্রামগুলোতে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে।


দুর্ঘটনার বিবরন ও হতাহতদের পরিচয়

স্থানীয় সূত্র ও পুলিশ জানায়, মঙ্গলবার সকালে ভূরুঙ্গামারী উপজেলার কয়েকজন বাসিন্দা একটি মাইক্রোবাস ভাড়া করে চিকিৎসার উদ্দেশ্যে রংপুরে যান। সারাদিন ডাক্তার দেখিয়ে রাতে তারা বাড়ির পথে রওনা হয়েছিলেন। মাইক্রোবাসটি নাগেশ্বরীর বাঁশেরতল এলাকায় পৌঁছালে বিপরীত দিক থেকে আসা একটি দ্রুতগামী পাথরবোঝাই ট্রাকের সঙ্গে সেটির মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। সংঘর্ষের তীব্রতায় মাইক্রোবাসটি দুমড়েমুচড়ে যায় এবং ঘটনাস্থলেই ৩ জন আরোহী মারা যান। পরবর্তীতে গুরুতর আহতদের উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়ার পথে আরও ২ জনের মৃত্যু হয়।

নিহতদের তালিকা:

  • শামীম হোসেন (৩২): ভূরুঙ্গামারী উপজেলার আসাদ মোড় এলাকার বাসিন্দা।

  • সাদিয়া আক্তার (৮): শামীম হোসেনের কন্যা।

  • তামান্না আক্তার (২৮): একই পরিবারের সদস্য এবং বাবু মিয়ার স্ত্রী।

  • নুরনবী মিয়া (২৮): জাহিদুল ইসলামের পুত্র।

  • লিমন মিয়া (২৮): ধলডাঙ্গা গ্রামের সাইফুর রহমানের পুত্র এবং মাইক্রোবাসের চালক।

বুধবার (২৯ এপ্রিল) দুপুরে মরদেহগুলো নিজ নিজ গ্রামে পৌঁছালে সেখানে এক হৃদয়বিদারক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। বিশেষ করে একই পরিবারের বাবা ও মেয়ের একসাথে প্রয়াণে এলাকায় শোকাতুর পরিবেশ বিরাজ করছে।


আহতদের অবস্থা ও চিকিৎসা ব্যবস্থা

এই দুর্ঘটনায় মাইক্রোবাসের আরও ৯ জন যাত্রী গুরুতর আহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা অত্যন্ত সংকটাপন্ন বলে জানা গেছে। আহতদের তাৎক্ষণিকভাবে উদ্ধার করে প্রথমে নাগেশ্বরী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এবং পরে কুড়িগ্রাম সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখান থেকে উন্নত চিকিৎসার জন্য বেশ কয়েকজনকে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়েছে।

আহতরা হলেন: হামিদুল ইসলাম (২৫), শান্তা (২০), সমের আলী (৬০), জবা (৩৫), বাবু মিয়া (৪২), মনির মিয়া (৪৫), মুন মিয়া (১০), শিউলি বেগম (৪০) এবং সিয়াম মিয়া (৩৫)। চিকিৎসকদের উদ্ধৃতি দিয়ে জানানো হয়েছে যে, আহতদের আঘাতের গুরুত্ব বিবেচনায় নিহতের সংখ্যা আরও বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।


প্রশাসনিক ও আইনি পদক্ষেপ

দুর্ঘটনার পর ঘাতক ট্রাকটিকে পুলিশ জব্দ করতে সক্ষম হলেও এর চালক ও সহকারী পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছে। নাগেশ্বরী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবদুল্লাহ হিল জামান জানিয়েছেন, “পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে ট্রাকটি আটক করেছে। পলাতক চালককে শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। এই ঘটনায় নিয়মিত মামলার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।”

অন্যদিকে, ভূরুঙ্গামারী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আজিম উদ্দিন ৪ জন নিহতের প্রাথমিক তথ্য পাওয়ার কথা জানিয়েছেন। তবে ঘটনাস্থল নাগেশ্বরী থানার অধীনে হওয়ায় পরবর্তী আইনি কার্যক্রম সেখান থেকেই পরিচালিত হচ্ছে। শিলখুড়ি ইউনিয়ন পরিষদের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য মো. কোরবান আলী বাবু জানান, চিকিৎসা নিতে গিয়ে এভাবে লাশ হয়ে ফিরে আসা পুরো গ্রামের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা আহতদের সুচিকিৎসা নিশ্চিত করতে সার্বক্ষণিক তদারকি করছেন।


স্থানীয় জনরোষ ও সড়ক নিরাপত্তা

কুড়িগ্রাম-ভূরুঙ্গামারী সড়কে রাতের বেলা পাথরবোঝাই ট্রাকগুলোর বেপরোয়া গতি নিয়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে দীর্ঘদিনের ক্ষোভ রয়েছে। এলাকাবাসীর অভিযোগ, ট্রাফিক আইন অমান্য করে দ্রুতগতিতে গাড়ি চালানোই এই ধরণের ভয়াবহ দুর্ঘটনার মূল কারণ। সড়কটিকে নিরাপদ করতে এবং ঘাতক চালকের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে সাধারণ মানুষ সোচ্চার হয়েছেন। বিশেষ করে দূরবর্তী স্থানে চিকিৎসা নিতে যাওয়া রোগীদের যাতায়াত নিরাপদ করার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন স্থানীয় সচেতন মহল।


জানাজা ও দাফন

নিহত ৫ জনের মরদেহ প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া শেষে বুধবার বিকেলে জানাজা সম্পন্ন করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। স্থানীয় কবরস্থানে তাদের দাফনের প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়েছে। ভূরুঙ্গামারী উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে শোকসন্তপ্ত পরিবারগুলোর প্রতি সমবেদনা জানানো হয়েছে এবং সম্ভবপর সরকারি সহায়তা প্রদানের আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।