ময়মনসিংহে আট বছর বয়সী এক শিশুকে অপহরণ ও ধর্ষণের দায়ে কবির হোসেন রুবেল মিয়া (৩৫) নামের এক যুবককে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড প্রদান করেছেন আদালত। দীর্ঘ নয় বছরের বিচারিক প্রক্রিয়া এবং সাক্ষ্য-প্রমাণ বিশ্লেষণ শেষে ময়মনসিংহের শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনাল এই ঐতিহাসিক রায় ঘোষণা করেন। কারাদণ্ডের পাশাপাশি আসামিকে আর্থিক জরিমানাও করা হয়েছে। আদালতের ভাষ্যমতে, এই ট্রাইব্যুনাল গঠিত হওয়ার পর এটিই কোনো আসামিকে দেওয়া প্রথম যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের রায়।
Table of Contents
ঘটনার প্রেক্ষাপট: ভয়ভীতি ও পাশবিকতা
মামলার নথিপত্র এবং রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ঘটনার সূত্রপাত ঘটে ২০১৬ সালের ৩১ আগস্ট। সেদিন সন্ধ্যায় ভুক্তভোগী শিশুটি (৮) নগরীর রাস্তা দিয়ে বাড়ি ফিরছিল। পথিমধ্যে ময়মনসিংহ নগরীর আকুয়া চৌরঙ্গী মোড় এলাকার বাসিন্দা কবির হোসেন রুবেল মিয়া শিশুটির পথরোধ করেন।
অভিযোগ অনুযায়ী, রুবেল মিয়া পেছন থেকে শিশুটির মুখ চেপে ধরেন এবং একটি ধারালো চাকু দেখিয়ে তাকে প্রাণে মেরে ফেলার ভয় দেখান। এরপর শিশুটিকে একটি নির্জন স্থানে নিয়ে গিয়ে জোরপূর্বক ধর্ষণ করেন। পাশবিক এই নির্যাতনের পর বিষয়টি কাউকে জানালে শিশুটিকে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়। পরবর্তীতে শিশুটি রক্তাক্ত ও গুরুতর আহত অবস্থায় বাড়িতে ফিরে পরিবারের সদস্যদের কাছে ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ প্রদান করে।
আইনি পদক্ষেপ ও দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া
ঘটনার পরপরই ভুক্তভোগী শিশুর বাবা বাদী হয়ে ময়মনসিংহের কোতোয়ালি মডেল থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। পুলিশ তদন্ত শেষে আসামির বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিল করলে মামলাটি নিষ্পত্তির জন্য শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালে পাঠানো হয়।
নয় বছর ধরে চলা এই দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়ায় আদালত সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক, তদন্তকারী পুলিশ কর্মকর্তা এবং প্রত্যক্ষদর্শীসহ প্রয়োজনীয় সংখ্যক সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ ও জেরা সম্পন্ন করেন। দীর্ঘ এই সময়ে প্রসিকিউশন পক্ষ আসামির বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগগুলো সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে সক্ষম হয়।
আদালতের রায় ও দণ্ডাদেশ
বুধবার (২৯ এপ্রিল, ২০২৬) দুপুরে ময়মনসিংহ জেলা ও দায়রা জজ শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক সুদীপ্তা সরকার জনাকীর্ণ আদালতে এই রায় ঘোষণা করেন। রায়ে আদালত নিম্নলিখিত দণ্ডসমূহ আরোপ করেন:
যাবজ্জীবন কারাদণ্ড: মূল অপরাধের দায়ে আসামিকে আমৃত্যু বা যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড প্রদান করা হয়েছে।
আর্থিক জরিমানা: কারাদণ্ডের পাশাপাশি ২০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড করা হয়েছে।
অনাদায়ে অতিরিক্ত সাজা: জরিমানার অর্থ পরিশোধ করতে ব্যর্থ হলে আসামিকে আরও ৬ মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে।
আদালত পরিদর্শক মোস্তাছিনুর রহমান জানান, রায় ঘোষণার সময় আসামি কবির হোসেন রুবেল মিয়া কাঠগড়ায় উপস্থিত ছিলেন। রায় ঘোষণার পরপরই সাজা পরোয়ানা মূলে তাকে কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়।
রায়ের ঐতিহাসিক গুরুত্ব ও প্রভাব
ময়মনসিংহে শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনাল প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর এটিই প্রথম যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের ঘটনা, যা এই অঞ্চলের বিচারিক ইতিহাসে একটি বিশেষ মাইলফলক। রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি (পিপি) মজিবুর রহমান এই রায়কে স্বাগত জানিয়ে বলেন, “অপরাধের গুরুত্ব এবং সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে বিজ্ঞ আদালত সঠিক সিদ্ধান্ত দিয়েছেন। এই রায়ের মাধ্যমে সমাজে একটি কঠোর বার্তা পৌঁছাবে যে শিশুদের ওপর পাশবিকতা চালালে কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না।”
আইনি বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশে শিশু ধর্ষণের মতো সংবেদনশীল মামলাগুলোতে অনেক সময় বিচার দীর্ঘায়িত হওয়ার কারণে ন্যায়বিচার বিঘ্নিত হয়। তবে ময়মনসিংহের এই রায়টি প্রমাণ করে যে, সঠিক তদন্ত এবং যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অপরাধীকে আইনের আওতায় আনা সম্ভব। ৯ বছর পর পাওয়া এই রায়ে ভুক্তভোগীর পরিবার সন্তোষ প্রকাশ করেছে। এই রায় শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং নারীর প্রতি
