পারস্য উপসাগর ও ওমান উপসাগরের মধ্যবর্তী অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ হরমুজ প্রণালি। বিশ্ব অর্থনীতির এই জীবনরেখাকে কেন্দ্র করে ইরান ও প্রতিবেশী আরব রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে নতুন করে চরম উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে। ইরান এই আন্তর্জাতিক জলপথ ব্যবহারের বিপরীতে প্রতিটি তেলের জাহাজের ওপর বিশেষ ‘টোল’ বা মাশুল আরোপের যে প্রস্তাব দিয়েছে, তা আনুষ্ঠানিকভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে উপসাগরীয় দেশগুলোর জোট গালফ কো-অপারেশন কাউন্সিল (জিসিসি)। গতকাল মঙ্গলবার সৌদি আরবের জেদ্দায় আয়োজিত এক জরুরি বৈঠকে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, যা মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাকে নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে ঠেলে দিয়েছে।
Table of Contents
জিসিসির সিদ্ধান্ত: ঐকমত্য ও আইনি ভিত্তি
জেদ্দায় অনুষ্ঠিত বৈঠকে জিসিসিভুক্ত ছয়টি রাষ্ট্র—সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত, কাতার, বাহরাইন ও ওমান—একযোগে ইরানের নতুন শর্তাবলির কড়া সমালোচনা করেছে। বৈঠক শেষে জোটের মহাসচিব জাসেম মোহামেদ আলবুদাইউই এক আনুষ্ঠানিক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে ইরানের পদক্ষেপকে ‘সম্পূর্ণ অবৈধ’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন।
বিবৃতিতে বলা হয়, হরমুজ প্রণালি কোনো একক দেশের ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়; এটি একটি আন্তর্জাতিক নৌপথ। আন্তর্জাতিক আইন ও রীতিনীতি লঙ্ঘন করে ইরান এখানে চলাচলকারী কোনো জাহাজ থেকে অর্থ আদায়ের অধিকার রাখে না। জিসিসিভুক্ত কোনো সদস্য রাষ্ট্র বা তাদের পতাকাবাহী কোনো জাহাজ তেহরানকে এ ধরনের কোনো অর্থ বা মাশুল প্রদান করবে না বলে সাফ জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। এই সিদ্ধান্তে জিসিসির দেশগুলো তাদের সার্বভৌমত্ব এবং আন্তর্জাতিক সমুদ্রসীমা সংক্রান্ত কনভেনশনের প্রতি অবিচল থাকার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছে।
সংকটের সূত্রপাত: ইরানের শর্ত ও আইআরজিসি’র নিয়ন্ত্রণ
চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান-যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে ক্রমবর্ধমান স্নায়ুযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ইরান প্রথমবার হরমুজ প্রণালি সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দেয়। তেহরানের পক্ষ থেকে ঘোষণা করা হয়েছিল যে, যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলি সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেলে যেকোনো জাহাজ সেখানে আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু হতে পারে।
পরবর্তীতে বাণিজ্যিক ও কূটনৈতিক চাপের মুখে ইরান কিছুটা নমনীয় হওয়ার ভান করলেও নতুন এক প্রশাসনিক কাঠামো সামনে আনে। ইরানের এই নতুন প্রস্তাবনায় বলা হয়:
ব্যারেল প্রতি মাশুল: প্রণালি অতিক্রমকারী প্রতিটি তেলবাহী জাহাজকে প্রতি ব্যারেল তেলের জন্য ১ মার্কিন ডলার হারে টোল দিতে হবে।
বিপ্লবী রক্ষীবাহিনীর অনুমতি: প্রতিটি জাহাজকে জলপথে প্রবেশের আগে ইরানের এলিট ফোর্স ‘ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর’ (আইআরজিসি)-এর কাছ থেকে সরাসরি ছাড়পত্র নিতে হবে।
এই শর্তগুলো মূলত ইরানকে জলপথের ওপর একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ দেওয়ার একটি কৌশল হিসেবে দেখছেন জিসিসি নেতারা। তাঁদের মতে, এটি মূলত বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে জিম্মি করে অর্থ উপার্জনের একটি অপচেষ্টা।
হরমুজ প্রণালি: বিশ্ব অর্থনীতির ধমনী
প্রায় ১৬৭ কিলোমিটার দীর্ঘ এই প্রণালিটি কেন এত গুরুত্বপূর্ণ, তা নিচের পরিসংখ্যানগুলো থেকে স্পষ্ট হয়: ১. তেল সরবরাহ: বৈশ্বিক জ্বালানি চাহিদার প্রায় ২১ শতাংশ তেল এই সরু পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। প্রতিদিন গড়ে ২১ মিলিয়ন ব্যারেলের বেশি অপরিশোধিত তেল ও অন্যান্য জ্বালানি এই পথ দিয়ে বিশ্ববাজারে যায়। ২. গ্যাস রপ্তানি: বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় এলএনজি রপ্তানিকারক দেশ কাতার এই পথ দিয়েই তাদের গ্যাস সরবরাহ করে। ৩. বাজারের ওপর প্রভাব: হরমুজ প্রণালিতে ছোট কোনো অস্থিরতা তৈরি হলেও বিশ্ববাজারে তেলের দাম হু হু করে বেড়ে যায়। ইরানের বর্তমান প্রস্তাব কার্যকর হলে তেলের দামের ওপর এর সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়বে, যা বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতিকে আরও ত্বরান্বিত করতে পারে।
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া ও ভবিষ্যৎ শঙ্কা
জাতিসংঘের সমুদ্র আইন বিষয়ক কনভেনশন (UNCLOS) অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক জলপথ হিসেবে হরমুজ প্রণালিতে ‘ট্রানজিট প্যাসেজ’ বা অবাদ যাতায়াতের অধিকার সুরক্ষিত। একক কোনো দেশ এখানে কর বা মাশুল আরোপ করতে পারে না। জিসিসি দেশগুলোর এই সরাসরি প্রত্যাখ্যান ইরানের জন্য একটি বড় কূটনৈতিক ধাক্কা।
এখন দেখার বিষয় তেহরান তাদের দাবিতে অনড় থাকে কি না। যদি ইরান জোরপূর্বক টোল আদায়ের চেষ্টা করে বা জাহাজ আটকাতে আইআরজিসি ব্যবহার করে, তবে পারস্য উপসাগরে মোতায়েন করা মার্কিন ও ব্রিটিশ নৌবাহিনীর সঙ্গে সরাসরি সশস্ত্র সংঘাত শুরু হতে পারে। সামরিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ইরানের এই পদক্ষেপ মধ্যপ্রাচ্যে একটি নতুন বড় ধরণের যুদ্ধের সূত্রপাত করতে পারে, যা শেষ পর্যন্ত বিশ্ব অর্থনীতিকে ভয়াবহ সংকটে ফেলবে। জেদ্দায় গৃহীত এই সিদ্ধান্ত মূলত ইরানের অর্থনৈতিক ও সামরিক চাপের মুখে আরব রাষ্ট্রগুলোর সম্মিলিত প্রতিরোধের একটি শক্তিশালী বহিঃপ্রকাশ।
