শিক্ষাঙ্গনে নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ: ৫১৭ প্রতিষ্ঠানে উচ্চপ্রযুক্তির সিসিটিভি প্রকল্প

দেশের মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষার্থীদের জন্য একটি ভয়হীন ও নিরাপদ শিক্ষার পরিবেশ গড়ে তুলতে সরকার এক যুগান্তকারী ও সময়োপযোগী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বুলিং, র‍্যাগিং এবং ইভটিজিংয়ের মতো সামাজিক ব্যাধি নির্মূলের লক্ষ্যে প্রাথমিকভাবে দেশের ৫১৭টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে উচ্চপ্রযুক্তির সিসিটিভি (CCTV) ক্যামেরা নেটওয়ার্কের আওতায় আনা হচ্ছে।

গত ২৯ এপ্রিল (বুধবার) মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) এক দাপ্তরিক পত্রের মাধ্যমে এই কার্যক্রমের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা প্রদান করে। এর আগে, গত ২৭ এপ্রিল শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে ‘শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নির্বাচন নির্দেশিকা-২০২৫’ অনুমোদন করা হয় এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসকদের কাছে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা পাঠানো হয়।

প্রকল্পের মূল প্রেক্ষাপট ও লক্ষ্য

বর্তমান সরকারের ডিজিটাল বাংলাদেশ থেকে স্মার্ট বাংলাদেশে উত্তরণের যাত্রায় শিক্ষা খাতে প্রযুক্তির সংমিশ্রণ অপরিহার্য। সেই লক্ষ্যকে সামনে রেখে ‘লার্নিং এক্সিলারেশন ইন সেকেন্ডারি এডুকেশন’ বা সংক্ষেপে ‘লেইস’ (LAISE) প্রকল্পের আওতায় এই উদ্যোগটি গ্রহণ করা হয়েছে। প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য হলো—মাধ্যমিক পর্যায়ের কিশোর-কিশোরীদের শারীরিক ও মানসিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অনেক সময় লোকচক্ষুর অন্তরালে বুলিং বা ইভটিজিংয়ের মতো ঘটনা ঘটে, যা শিক্ষার্থীদের মানসিক বিকাশে বাধা সৃষ্টি করে। ডিজিটাল এই নজরদারি ব্যবস্থার মাধ্যমে এ ধরনের অপরাধমূলক প্রবণতা কমিয়ে আনা এবং একটি শৃঙ্খলাবদ্ধ ও শিক্ষাবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি করা সম্ভব হবে।

আওতাভুক্ত প্রতিষ্ঠানের পরিসংখ্যান

পাইলট বা পরীক্ষামূলক এই প্রকল্পের আওতায় মোট ৫১৭টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নির্বাচন করা হয়েছে। এই তালিকার মধ্যে রয়েছে:

  • ৩৬২টি মাধ্যমিক বিদ্যালয় * ১৫৫টি মাদ্রাসা দেশব্যাপী প্রতিটি উপজেলা এবং মেট্রোপলিটন থানা এলাকা থেকে একটি করে শ্রেষ্ঠ বা প্রয়োজনীয় প্রতিষ্ঠানকে এই ডিজিটাল নজরদারি ব্যবস্থার জন্য মনোনীত করা হবে। এর ফলে তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত এই প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত হবে।

কারিগরি বিন্যাস ও নজরদারি ব্যবস্থা

প্রকল্পের পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রতিটি নির্বাচিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মোট ১৬টি উচ্চপ্রযুক্তির সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা হবে। আধুনিক এই ক্যামেরাগুলোর স্থাপন বিন্যাস হবে অত্যন্ত সুপরিকল্পিত:

  1. শ্রেণিকক্ষ নজরদারি: শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিতকরণ এবং ক্লাসরুমের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা বজায় রাখতে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের ১০টি শ্রেণিকক্ষে ক্যামেরা স্থাপন করা হবে।

  2. আঙিনা ও সাধারণ পরিসর: প্রতিষ্ঠানের প্রবেশপথ, খেলার মাঠ এবং বারান্দাসহ আঙিনার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে অবশিষ্ট ৬টি ক্যামেরা বসানো হবে।

এই ক্যামেরাগুলো একটি কেন্দ্রীয় সার্ভারের সাথে যুক্ত থাকবে, যার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সার্বক্ষণিকভাবে কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করতে পারবেন।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নির্বাচনের কঠোর মানদণ্ড

প্রকল্পের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে শিক্ষা মন্ত্রণালয় অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট ও কঠোর কিছু শর্তারোপ করেছে। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে সিসিটিভি পাওয়ার যোগ্য হতে হলে নিচের মানদণ্ডগুলো পূরণ করতে হবে:

  • এমপিওভুক্তিকরণ: প্রতিষ্ঠানটিকে অবশ্যই সরকারি অথবা বেসরকারি এমপিওভুক্ত (MPO) হতে হবে।

  • বিদ্যুৎ ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা: যেসব প্রতিষ্ঠানে আগে থেকে কোনো সিসিটিভি ব্যবস্থা নেই এবং যেখানে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সংযোগের সুবিধা রয়েছে, কেবল তারাই এই সুবিধার অন্তর্ভুক্ত হবে।

  • ঝুঁকি বিবেচনা: যে সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অতীতে বুলিং, র‍্যাগিং বা ইভটিজিংয়ের অভিযোগ রয়েছে, তাদের অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।

  • অবকাঠামোগত সুরক্ষা: সীমানা প্রাচীর নেই এমন অরক্ষিত প্রতিষ্ঠানগুলো নিরাপত্তার খাতিরে তালিকার শীর্ষে থাকবে।

তবে বিশেষায়িত প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত যেমন—রেলওয়ে, সিটি কর্পোরেশন কিংবা ক্যান্টনমেন্ট বোর্ডের আওতাধীন প্রতিষ্ঠানসমূহ এই নির্দিষ্ট পাইলট প্রকল্পের আওতাভুক্ত হবে না।

বাস্তবায়ন কমিটি ও নির্বাচন প্রক্রিয়া

সঠিক প্রতিষ্ঠান নির্বাচনে স্থানীয় প্রশাসনকে সরাসরি সম্পৃক্ত করা হয়েছে। এ লক্ষ্যে দুটি পৃথক কমিটি কাজ করবে:

  • উপজেলা পর্যায়: উপজেলা নির্বাহী অফিসারের (ইউএনও) নেতৃত্বে তিন সদস্যবিশিষ্ট একটি স্থানীয় কমিটি যোগ্য প্রতিষ্ঠান নির্বাচন করবে।

  • মেট্রোপলিটন এলাকা: অতিরিক্ত জেলা প্রশাসকের (শিক্ষা) নেতৃত্বে গঠিত কমিটি সংশ্লিষ্ট থানার জন্য নির্ধারিত একটি বিদ্যালয় বা মাদ্রাসা চূড়ান্ত করবে।

উক্ত কমিটিগুলো আগামী কয়েক কার্যদিবসের মধ্যে নির্ধারিত মানদণ্ড যাচাই করে তাদের চূড়ান্ত তালিকা ‘লেইস’ প্রকল্প কার্যালয়ে প্রেরণ করবে।

অর্থায়ন ও দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা

এই বৃহৎ প্রকল্পটি বিশ্বব্যাংকের ঋণ সহায়তায় বাস্তবায়িত হচ্ছে। প্রকল্পের সময়কাল নির্ধারণ করা হয়েছে সেপ্টেম্বর ২০২৮ পর্যন্ত। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের মতে, এটি একটি পরীক্ষামূলক পদক্ষেপ। এই পাইলট প্রকল্পের সফলতা এবং এর সামাজিক প্রভাব বিশ্লেষণ করে পরবর্তীতে দেশের প্রতিটি মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে কেন্দ্রীয় ডিজিটাল নজরদারি নেটওয়ার্কের আওতায় আনার সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা সরকারের রয়েছে।

এর মাধ্যমে কেবল অপরাধ দমনই নয়, বরং শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি এবং পাঠদানের গুণগত মান তদারকি করাও সহজতর হবে। এটি বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় নিরাপদ ও আধুনিক অবকাঠামো গঠনে একটি মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।