বরিশাল কেন্দ্রীয় কারাগারে অন্তরীণ নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন ছাত্রলীগের নেতা মো. শাহরুখ খান তাঁর পিতার মৃত্যুর পর প্যারোলে মুক্তি পাননি। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্যারোলে মুক্তির আবেদন মঞ্জুর না করায় শেষ পর্যন্ত পিতার মরদেহ কারাগারের মূল ফটকে নিয়ে আসা হয়। সেখানেই কড়া নিরাপত্তার মধ্যে শাহরুখ খানকে তাঁর পিতার নিথর দেহ দেখার সুযোগ করে দেয় কারা কর্তৃপক্ষ। প্রশাসনের এমন সিদ্ধান্তে শাহরুখের পরিবারের সদস্য ও স্বজনদের মধ্যে গভীর অসন্তোষ ও হতাশা লক্ষ্য করা গেছে।
Table of Contents
ঘটনার প্রেক্ষাপট ও শাহরুখের গ্রেপ্তার
গত শুক্রবার রাতে বরিশাল মহানগরের নিউ সার্কুলার রোড এলাকার নিজ বাসভবন থেকে গ্রেপ্তার করা হয় মো. শাহরুখ খানকে। শাহরুখ বরিশাল মহানগর ছাত্রলীগের ১৫ নম্বর ওয়ার্ডের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। গ্রেপ্তারের পর তাঁকে বরিশাল কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানো হয়। পারিবারিক ও আইনি সূত্রে জানা গেছে, ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর গত ৫ আগস্টের পর থেকে শাহরুখের বিরুদ্ধে মোট আটটি মামলা দায়ের করা হয়েছিল। গ্রেপ্তারের পর তাঁর বিরুদ্ধে আরও তিনটি নতুন মামলা যুক্ত করা হয়, যার ফলে বর্তমানে তিনি মোট ১১টি মামলার আসামি হিসেবে কারাবন্দি রয়েছেন।
পিতার মৃত্যু ও প্যারোলের আবেদন
বুধবার (২৯ এপ্রিল, ২০২৬) সকালে বরিশাল মহানগরের বটতলা টেম্পোস্ট্যান্ডের লাইনম্যান হিসেবে কর্মরত শাহরুখের পিতা আবুল বাশার খান (৫৮) হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। পিতার মৃত্যুর খবর পাওয়ার পর পরিবারের পক্ষ থেকে শাহরুখ খানকে জানাজায় অংশ নেওয়া এবং শেষবারের মতো দেখার সুযোগ দেওয়ার লক্ষ্যে ‘প্যারোলে মুক্তি’র আইনি প্রক্রিয়া শুরু করা হয়।
শাহরুখের ভাই সালমান খান সাগর জানান, তাঁরা দ্রুত জেলা প্রশাসকের দপ্তরে প্যারোলে মুক্তির জন্য লিখিত আবেদন জমা দেন। অভিযোগ রয়েছে, আবেদন জমা দেওয়ার পর জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে তাঁদের প্রায় দেড় ঘণ্টা অপেক্ষা করিয়ে রাখা হয়। পরবর্তীতে একজন ম্যাজিস্ট্রেট এসে তাঁদের সরাসরি কারাগারে যাওয়ার পরামর্শ দিয়ে জানান যে, কারাগার কর্তৃপক্ষকে এ বিষয়ে নির্দেশনা দেওয়া হবে।
প্রশাসনের সিদ্ধান্ত ও জেলগেটে লাশের আগমন
সালমান খান সাগর আরও অভিযোগ করেন যে, জেলা প্রশাসকের দপ্তর থেকে আশ্বাস পাওয়ার পর তাঁরা কারাগারে পৌঁছালে কারা কর্মকর্তারা জানান, জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্যারোলে মুক্তির বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক নির্দেশনা তাঁদের কাছে পৌঁছায়নি। দীর্ঘ সময় কোনো সুরাহা না হওয়ায় এবং প্যারোল না মেলায় বিকেল পৌনে ৪টার দিকে আবুল বাশার খানের মরদেহ বহনকারী অ্যাম্বুলেন্সটি সরাসরি বরিশাল কেন্দ্রীয় কারাগারের ফটকে নিয়ে যাওয়া হয়।
কারা কর্তৃপক্ষের অনুমতি সাপেক্ষে লাশের সঙ্গে পরিবারের তিনজন সদস্যকে ভেতরে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়। শাহরুখ খানকে কারাগারের অভ্যন্তরীণ এলাকা থেকে ফটকের কাছে নিয়ে আসা হয়। সেখানে মাত্র ৫ মিনিটের জন্য তাঁকে তাঁর পিতার মরদেহ দেখার সুযোগ দেওয়া হয়। অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত এই সময়ের পর মরদেহটি পুনরায় কারাগার থেকে বের করে আনা হয়।
কর্তৃপক্ষের বক্তব্য ও আইনি পর্যবেক্ষণ
শাহরুখের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মিজানুর রহমান মিন্টু গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেছেন যে, তাঁর মক্কেলের প্যারোলে মুক্তির আবেদন যথাযথভাবে জেলা প্রশাসক বরাবর পেশ করা হয়েছিল। কিন্তু প্রশাসনিক জটিলতা বা অন্য কোনো কারণে সেই আবেদনটি গ্রহণ করা হয়নি বা মঞ্জুর করা হয়নি।
এই বিষয়ে বরিশালের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট উপমা ফারিসা জানান, প্যারোলে মুক্তির আবেদনটি জেলা প্রশাসক বরাবর করা হয়েছিল। জেলা প্রশাসক কার্যালয়ে উপস্থিত না থাকায় আবেদনটির একটি অনুলিপি তাঁকে হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে পাঠানো হয়। বিষয়টি পর্যালোচনা করে জেলা প্রশাসক প্যারোলে মুক্তির পরিবর্তে জেলগেটে মরদেহ দেখার এবং সাক্ষাতের সিদ্ধান্ত প্রদান করেন। অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আরও উল্লেখ করেন যে, এই সিদ্ধান্তের বিষয়টি তিনি তাৎক্ষণিকভাবে স্বজনদের জানিয়ে দিয়েছিলেন।
অন্যদিকে, বরিশাল কেন্দ্রীয় কারাগারের জেলার মোহাম্মদ মাহবুব কবিরের সাথে মোবাইল ফোনের মাধ্যমে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি, ফলে কারা কর্তৃপক্ষের বিস্তারিত ভাষ্য পাওয়া সম্ভব হয়নি।
জানাজা ও দাফন সম্পন্ন
কারাগারের ফটকে দেখার প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর আবুল বাশার খানের মরদেহ পুনরায় নিউ সার্কুলার রোডে নিয়ে আসা হয়। বাদ আসর নগরের গাজীবাড়ি মসজিদে তাঁর প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এরপর মরদেহটি বরিশাল সদর উপজেলার করাপুর ইউনিয়নের পপুলার এলাকায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে দ্বিতীয় জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে আবুল বাশার খানের দাফন সম্পন্ন করা হয়।
কারাবন্দি সন্তানের সামনে পিতার মরদেহ নিয়ে আসার এই দৃশ্যটি স্থানীয় পর্যায়ে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি করেছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিরাপত্তা বা রাজনৈতিক কারণে প্যারোল না দেওয়ার বিষয়টি যেমন আলোচিত হচ্ছে, তেমনি মানবিক দিক বিবেচনায় পরিবারের পক্ষ থেকে ক্ষোভ প্রকাশ করা অব্যাহত রয়েছে।
