শীর্ষ সন্ত্রাসী টিটন হত্যাকাণ্ড: বছিলা পশুর হাটের ইজারা ও আন্ডারওয়ার্ল্ডের পুরনো বৈরিতার বলি

রাজধানীর বছিলা পশুর হাটের দরপত্র কেনা ও ইজারা সংক্রান্ত বিরোধের জেরে খুন হয়েছেন সরকারের তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী খন্দকার নঈম আহমেদ টিটন ওরফে নাঈম আহমেদ টিটন। গত মঙ্গলবার রাতে নিউমার্কেট এলাকায় প্রকাশ্য দিবালোকে সংঘটিত এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় অপরাধ জগতের অভ্যন্তরীণ কোন্দল এবং দীর্ঘদিনের প্রতিহিংসার বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। বুধবার (২৯ এপ্রিল) সকালে নিহতের বড় ভাই খন্দকার সাঈদ আক্তার রিপন বাদী হয়ে নিউমার্কেট থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছেন, যেখানে অজ্ঞাতনামা ৮-৯ জনকে আসামি করা হয়েছে।


হত্যাকাণ্ডের প্রেক্ষাপট ও মামলার বিবরণ

পুলিশ ও নিহতের পরিবার সূত্রে জানা গেছে, মঙ্গলবার রাত আনুমানিক ৮টার দিকে নিউমার্কেটের শাহনেওয়াজ হলের সামনে বটতলা এলাকায় টিটনকে লক্ষ্য করে কয়েক রাউন্ড গুলি ছোড়ে সন্ত্রাসীরা। গুলিবিদ্ধ অবস্থায় তাঁকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে নেওয়া হলে রাত ১১টার দিকে চিকিৎসকরা তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।

মামলার এজাহারে নিহতের ভাই রিপন উল্লেখ করেছেন যে, বছিলা পশুর হাটের ইজারা নিয়ে অপর শীর্ষ সন্ত্রাসী ইমামুল হাসান হেলাল ওরফে পিচ্চি হেলাল, বাদল ওরফে কিলার বাদল, শাহজাহান ও ডাগারি রনির সঙ্গে টিটনের তীব্র বিরোধ চলছিল। নিউমার্কেট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ আইয়ুব নিশ্চিত করেছেন যে, পরিবারের দেওয়া অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত শুরু হয়েছে।


অপরাধ জগতের উত্থান-পতন ও জামিনে মুক্তি

খন্দকার নঈম আহমেদ টিটন ছিলেন ২০০১ সালে সরকার ঘোষিত ২৩ শীর্ষ সন্ত্রাসীর তালিকার ২ নম্বর ব্যক্তি। প্রায় দুই দশক কারাভোগের পর ২০২৪ সালের ১৩ আগস্ট তিনি জামিনে মুক্তি পান। ডিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) এস এন মো. নজরুল ইসলাম জানান, টিটনের মতো হেভিওয়েট সন্ত্রাসীর হত্যাকাণ্ডটি অত্যন্ত সুপরিকল্পিত।

৫ আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর একে একে কিলার আব্বাস, আরমান, সানজিদুল ইসলাম ইমন, পিচ্চি হেলাল ও টিটনের মতো শীর্ষ অপরাধীরা কারাগার থেকে বেরিয়ে আসায় রাজধানীর আন্ডারওয়ার্ল্ডে আধিপত্য বিস্তারের নতুন লড়াই শুরু হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। মূলত পশুর হাটের ইজারা এবং পুরনো আধিপত্যের দ্বন্দ্বই এই খুনের প্রধান কারণ।


হত্যাকাণ্ডের সুনিপুণ নীল-নকশা ও কিলিং মিশন

পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে টিটন হত্যার একটি রোমহর্ষক ‘কিলিং মিশন’-এর চিত্র ফুটে উঠেছে। তদন্তকারী কর্মকর্তাদের মতে, কিলিং মিশনে ঘাতকদের তিনটি আলাদা দল কাজ করেছে:

  • অনুসরণকারী দল: টিটন সুলতানগঞ্জের বাসা থেকে বের হওয়ার পর থেকেই একটি দল তাঁকে অনুসরণ করতে থাকে।

  • মোটরসাইকেল টিম: দুই সদস্যের একটি দল মোটরসাইকেলে করে টিটনের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করছিল।

  • অ্যাম্বুশ টিম: নিউমার্কেট ১ নম্বর গেটের কাছে আগে থেকেই তিন সদস্যের একটি দল ওত পেতে ছিল।

তদন্তে উঠে এসেছে যে, এই মিশনে কিলার বাদল, শাহজাহান, ভাইগ্না রনি, সানি, সুমন, প্রিন্স, লম্বু আলম ও পারভেজ সরাসরি অংশ নিয়েছেন। টিটন যখন নিউমার্কেটের বটতলার কাছে পৌঁছান, তখন মোটরসাইকেলে থাকা দলটি তাঁকে লক্ষ্য করে গুলি চালিয়ে পালিয়ে যায়।


বছিলা হাটের বিরোধ ও ‘আপস বৈঠকের’ ফাঁদ

নিহত টিটনের পরিবারের দাবি, দীর্ঘ কারাবাসের পর টিটন স্বাভাবিক জীবনে ফেরার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। তিনি পশুর হাটের ইজারা বা ‘শিডিউল’ কিনে বৈধ ব্যবসা করতে চেয়েছিলেন। তবে এই ব্যবসাই তাঁর জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়।

২৬ এপ্রিল টিটন তাঁর ভাইকে জানিয়েছিলেন যে, বছিলা হাটের ইজারা নিয়ে পিচ্চি হেলাল ও বাদল বাহিনীর সঙ্গে তাঁর ঝামেলা চলছে। ২৭ এপ্রিল তিনি পুনরায় জানান যে, বিরোধ মিটিয়ে ফেলার জন্য তাঁকে একটি বৈঠকে ডাকা হয়েছে। পুলিশের ধারণা, এই আপস আলোচনার নামে মূলত তাঁকে বাসা থেকে বের করে আনা হয়েছিল এবং তাঁর গতিবিধি ঘাতকদের জানিয়ে দেওয়া হয়েছিল।


পুরনো প্রতিহিংসা: টিপু ও তারিক সাঈফ মামুন হত্যাকাণ্ড

টিটন হত্যাকাণ্ডের শেকড় অনেক গভীরে বলে মনে করছে পুলিশ। ১৯৯৯ সালে খিলক্ষেতের নিকুঞ্জ এলাকায় শীর্ষ সন্ত্রাসী জোসেফ আহমেদের ভাই টিপুকে ব্রাশফায়ার করে হত্যা করা হয়েছিল। ওই কিলিং মিশনে সানজিদুল ইসলাম ইমন ও লেদার লিটনের সঙ্গে টিটনও সরাসরি যুক্ত ছিলেন। একই সময়ে ইমন বাহিনীর হাতে ঢাকা মহানগর ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক অশ্রু এবং চিত্রনায়ক সোহেল চৌধুরীও প্রাণ হারিয়েছিলেন।

গত বছরের ১০ নভেম্বর পুরান ঢাকায় আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসী তারিক সাঈফ মামুনকে গুলি করে হত্যা করা হয়। তদন্তে দেখা গেছে, টিপু হত্যার প্রতিশোধ হিসেবে মামুনকে মারা হয়েছিল। পুলিশ এখন খতিয়ে দেখছে যে, টিটন হত্যাকাণ্ডও কি একই প্রতিহিংসার অংশ কি না। অর্থাৎ বছিলা হাটের ইজারা বিরোধের পাশাপাশি পুরনো রক্তের বদলা নেওয়ার বিষয়টিও তদন্তে বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে।


বর্তমান পরিস্থিতি ও পরবর্তী পদক্ষেপ

বুধবার বিকেলে ঢাকা মেডিকেল কলেজ মর্গ থেকে টিটনের মরদেহ গ্রহণ করেছেন তাঁর পরিবার। এ সময় নিহতের বড় ভাই রিপন সাংবাদিকদের কাছে পুনরায় পিচ্চি হেলালের সাথে বিরোধের কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, “টিটন আমাকে বলেছিল যে হেলালের সাথে হাটের ঝামেলা মিটে যাবে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা হলো না।”

বর্তমানে নিউমার্কেট ও বছিলা এলাকায় এই হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে চাপা উত্তেজনা বিরাজ করছে। পুলিশ খুনিদের শনাক্ত করতে সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করছে এবং বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালাচ্ছে। তবে প্রতিবেদনটি লেখা পর্যন্ত কাউকে গ্রেফতার করার খবর পাওয়া যায়নি। রাজধানীর আন্ডারওয়ার্ল্ডে শীর্ষ সন্ত্রাসীদের এই হানাহানি জনমনে নতুন করে ভীতির সঞ্চার করেছে।