তেহরানের সংশোধিত শান্তি প্রস্তাব: ইরান-যুক্তরাষ্ট্র কূটনৈতিক টানাপড়েনে নতুন মোড়

মধ্যপ্রাচ্যের ক্রমবর্ধমান সামরিক উত্তেজনা প্রশমন এবং দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত এড়াতে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে একটি সংশোধিত ও পরিমার্জিত শান্তি প্রস্তাব পাঠানোর চূড়ান্ত প্রস্তুতি নিচ্ছে ইরান। আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতাকারী দেশগুলোর মাধ্যমে এই কূটনৈতিক তৎপরতা চালানো হচ্ছে। এই প্রক্রিয়ায় অন্যতম মধ্যস্থতাকারী দেশ পাকিস্তান আশা প্রকাশ করেছে যে, আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই ইরানের এই নতুন প্রস্তাবটি ওয়াশিংটনের কাছে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হবে। বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এই প্রস্তাবটি উভয় দেশের বৈরী সম্পর্ক নিরসনে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ একটি পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।


ট্রাম্পের প্রত্যাখ্যান ও তেহরানের নীতি পরিবর্তন

এর আগে ইরান যে শান্তি প্রস্তাব পাঠিয়েছিল, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সেটি নিয়ে সরাসরি অসন্তোষ প্রকাশ করেন। সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাত দিয়ে সংবাদমাধ্যম সিএনএন জানিয়েছিল, ট্রাম্প আগের প্রস্তাবটি গ্রহণ করবেন না বলে স্পষ্ট ইঙ্গিত দিয়েছেন। মার্কিন প্রশাসনের মতে, ইরানের পূর্ববর্তী প্রস্তাবে সুনির্দিষ্ট ও কার্যকর পদক্ষেপের অভাব ছিল এবং তা ওয়াশিংটনের মূল উদ্বেগগুলো নিরসনে যথেষ্ট ছিল না।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের এই অনমনীয় অবস্থানের কারণেই ইরান তাদের প্রস্তাবনা সংশোধনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এই কূটনৈতিক অচলাবস্থা নিরসনে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বর্তমানে অত্যন্ত সক্রিয় ভূমিকা পালন করছেন। সূত্র অনুযায়ী, তাঁর রাশিয়া সফর শেষ করে মঙ্গলবার (২৮ এপ্রিল, ২০২৬) তেহরানে পৌঁছানোর কথা। সেখানে সরকারের উচ্চপর্যায়ের নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে ট্রাম্পের আপত্তির বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনার পর সংশোধিত প্রস্তাবের চূড়ান্ত রূপরেখা প্রণয়ন করা হবে।


ইরানের অভ্যন্তরীণ নেতৃত্ব ও প্রক্রিয়ার ধীরগতি

নতুন প্রস্তাব পাঠানোর ক্ষেত্রে ইরানের অভ্যন্তরীণ প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি কিছুটা জটিল আকার ধারণ করেছে। বিশেষ করে, ইরানের সুপ্রিম লিডার মোজতবা খামেনির সঙ্গে সরকারের অন্যান্য শীর্ষ কর্মকর্তাদের যোগাযোগ বর্তমানে অত্যন্ত সীমিত। নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের এই সমন্বয়হীনতার কারণে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়াটি স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক ধীরগতিতে এগোচ্ছে। তবে কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন যে, বর্তমান টালমাটাল ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি সামাল দিতে ইরানের হাতে সময় খুবই কম।

ইরানের আগের প্রস্তাবে প্রধান শর্ত ছিল যে—যেকোনো আনুষ্ঠানিক আলোচনার আগে অবশ্যই যুদ্ধ বা সামরিক উত্তেজনা পুরোপুরি বন্ধ করতে হবে। ইরান দাবি করেছিল, সামরিক সংঘাত বন্ধ হওয়ার পর তারা পারমাণবিক কার্যক্রমসহ অন্যান্য অমীমাংসিত বিষয় নিয়ে টেবিলে বসতে আগ্রহী। তবে যুক্তরাষ্ট্র পাল্টা শর্ত হিসেবে বিরাষ্ট্রীয় সশস্ত্র গোষ্ঠীকে ইরানের সহায়তা বন্ধ এবং পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণের বিষয়ে আগে স্পষ্ট প্রতিশ্রুতি দাবি করে আসছে।


ট্রাম্পের দাবি ও হরমুজ প্রণালি সংকট

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ ইরান সম্পর্কে বেশ কিছু চাঞ্চল্যকর দাবি করেছেন। মঙ্গলবার এক পোস্টে ট্রাম্প দাবি করেন, ইরান বর্তমানে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে ‘বিধ্বস্ত’ অবস্থায় রয়েছে। তিনি আরও দাবি করেন যে, ইরানের বর্তমান নেতৃত্বের সঠিক অবস্থান বা প্রকৃত প্রধান কে, তা খোদ ইরানি কর্তৃপক্ষই নিশ্চিতভাবে জানে না।

ট্রাম্পের বর্ণনামতে, ইরান সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রকে তাদের চরম সংকটের কথা জানিয়েছে এবং গুরুত্বপূর্ণ নৌ-পথ ‘হরমুজ প্রণালি’ উন্মুক্ত করার জন্য ওয়াশিংটনের সহায়তা চেয়েছে। ট্রাম্প তাঁর পোস্টে লেখেন:

“ইরান এইমাত্র আমাদের অবহিত করেছে যে তারা বিধ্বস্ত অবস্থায় আছে। তারা চায় যত দ্রুত সম্ভব আমরা যেন হরমুজ প্রণালি খুলি। ইরানিরা এখন তাদের নেতৃত্বের অবস্থা খুঁজছে। আমি আশা করি এতে তারা সফল হবে।”

উল্লেখ্য, হরমুজ প্রণালি বিশ্বব্যাপী জ্বালানি তেল পরিবহনের জন্য কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই পথ বন্ধ বা বিঘ্নিত হলে বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ ব্যাহত হয়, যা সরাসরি বিশ্ব অর্থনীতিতে বিরূপ প্রভাব ফেলে। ট্রাম্পের দাবি অনুযায়ী, ইরান এখন নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার তাগিদে এই পথ সচল রাখার জন্য ওয়াশিংটনের সঙ্গে সমঝোতায় আসতে চাইছে।


অনিশ্চয়তায় কূটনৈতিক ভবিষ্যৎ ও মধ্যস্থতা

বর্তমান আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিকে বিশ্লেষকরা ‘অত্যন্ত নাজুক’ বলে অভিহিত করেছেন। ইরানের পরবর্তী সংশোধিত প্রস্তাবে যদি ওয়াশিংটনের মূল উদ্বেগের জায়গাগুলো যেমন—পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিতকরণ এবং আঞ্চলিক অস্থিরতা নিরসনে নমনীয় কোনো শর্ত থাকে, তবেই আলোচনার পথ প্রশস্ত হতে পারে। অন্যথায়, ট্রাম্প প্রশাসনের কঠোর অবস্থান এবং ইরানের অভ্যন্তরীণ নেতৃত্বের অনিশ্চয়তা এই সংকটকে আরও গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী করতে পারে।

সব মিলিয়ে, ইরানের প্রস্তাবটি এখন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের গভীর পর্যবেক্ষণের বিষয়। পাকিস্তানসহ অন্যান্য মধ্যস্থতাকারী দেশগুলো এখনও আশাবাদী যে, একটি ভারসাম্যপূর্ণ প্রস্তাবের মাধ্যমে তেহরান ও ওয়াশিংটন পুনরায় আলোচনার টেবিলে ফিরবে, যা মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক শান্তি ও স্থিতিশীলতার জন্য অপরিহার্য।