বরিশালের উজিরপুর উপজেলায় চলমান এসএসসি পরীক্ষায় এক নজিরবিহীন জালিয়াতির ঘটনা উন্মোচিত হয়েছে। অন্যের হয়ে প্রক্সি দিতে এসে মো. তাফসির ইসলাম (১৯) নামে এক তরুণ হাতেনাতে ধরা পড়েছেন। অপরাধ প্রমাণিত হওয়ায় ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে তাঁকে এক বছরের বিনাশ্রম কারাদণ্ড এবং আর্থিক জরিমানা করা হয়েছে। আজ মঙ্গলবার (২৮ এপ্রিল, ২০২৬) উপজেলার শোলক ইউনিয়নের ধামুরা মাধ্যমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে এই দণ্ড প্রদান করা হয়।
Table of Contents
সন্দেহ থেকে আটক: যেভাবে ধরা পড়লেন তাফসির
মঙ্গলবার নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী এসএসসি পরীক্ষা শুরু হওয়ার পর ধামুরা মাধ্যমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে পরীক্ষার্থীদের তথ্য যাচাই করছিলেন কক্ষ পরিদর্শক ও কেন্দ্র সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। পরীক্ষা চলাকালীন মো. তাফসির ইসলামের আচরণ ও গতিবিধি সন্দেহজনক মনে হয় দায়িত্বরত শিক্ষকদের কাছে। গভীর পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, পরীক্ষার্থীর জন্য নির্ধারিত প্রবেশপত্রের ছবির সঙ্গে তাফসিরের চেহারার কোনো মিল নেই।
প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের মুখে তাফসির ভেঙে পড়েন এবং স্বীকার করেন যে, তিনি প্রকৃত পরীক্ষার্থী নন। তিনি জনৈক এক পরীক্ষার্থীর হয়ে টাকার বিনিময়ে বা অন্য কোনো চুক্তিতে প্রক্সি দিতে কেন্দ্রে এসেছিলেন। জালিয়াতি নিশ্চিত হওয়ার পর কেন্দ্র কর্তৃপক্ষ তাৎক্ষণিকভাবে উপজেলা প্রশাসনকে বিষয়টি অবহিত করে এবং অভিযুক্তকে আটক করে পুলিশি হেফাজতে নেওয়া হয়।
ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান ও আইনি শাস্তি
ঘটনাটি অবগত হওয়ার পরপরই উজিরপুর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মহেশ্বর মণ্ডল পরীক্ষা কেন্দ্রে উপস্থিত হয়ে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করেন। দণ্ডপ্রাপ্ত তাফসির ইসলাম উপজেলার বামরাইল ইউনিয়নের হস্তিশুন্ড এলাকার লিয়াকত সিকদারের ছেলে।
আদালতে সাক্ষ্যপ্রমাণ এবং আসামির নিজের স্বীকারোক্তির ভিত্তিতে অপরাধ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়। এরপর ‘পাবলিক পরীক্ষা (অপরাধ) আইন, ১৯৮০’ এর সংশ্লিষ্ট ধারায় তাফসিরকে এক বছরের বিনাশ্রম কারাদণ্ড প্রদান করা হয়। একই সঙ্গে প্রতীকী হিসেবে তাঁকে নগদ ১০০ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। সাজা ঘোষণার পরপরই দণ্ডপ্রাপ্ত তরুণকে কারাগারে প্রেরণের নির্দেশ দেওয়া হয়।
মূল পরীক্ষার্থীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থার প্রক্রিয়া
জালিয়াতির এই ঘটনায় শুধুমাত্র প্রক্সি দিতে আসা ব্যক্তিই নন, বরং যার হয়ে তিনি পরীক্ষা দিচ্ছিলেন সেই মূল পরীক্ষার্থীও বড় ধরণের আইনি ও প্রশাসনিক জটিলতায় পড়েছেন। কেন্দ্র সচিব সূত্রে জানা গেছে, ওই মূল পরীক্ষার্থীর সকল পরীক্ষা বাতিলসহ তাঁকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করার জন্য সংশ্লিষ্ট শিক্ষা বোর্ডে প্রতিবেদন পাঠানো হয়েছে। এ ধরণের জালিয়াতি শিক্ষা ব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও সৎ শিক্ষার্থীদের মেধার অবমূল্যায়ন ঘটায় বলে মনে করছে কর্তৃপক্ষ।
উজিরপুর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মহেশ্বর মণ্ডল সংবাদমাধ্যমকে জানান:
“পাবলিক পরীক্ষার পবিত্রতা রক্ষা করা প্রশাসনের অন্যতম দায়িত্ব। এ ধরণের জালিয়াতি বা অনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে আমাদের জিরো টলারেন্স নীতি বহাল থাকবে। পরীক্ষায় জালিয়াতি রোধে প্রতিটি কেন্দ্রে নজরদারি ও তদারকি আরও জোরদার করা হচ্ছে।”
জেলাজুড়ে সতর্কবার্তা ও প্রশাসনের তৎপরতা
উজিরপুরের এই ঘটনাটি বরিশাল জেলার অন্যান্য পরীক্ষা কেন্দ্রের জন্য একটি সতর্কবার্তা হিসেবে কাজ করছে। বরিশাল জেলা শিক্ষা অফিস জানিয়েছে, জেলার প্রতিটি কেন্দ্রে পরীক্ষার্থীর পরিচয় নিশ্চিত করতে প্রবেশপত্রের কিউআর কোড (যদি থাকে) এবং ছবি অধিকতর গুরুত্বের সাথে যাচাইয়ের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, এ ধরণের তাৎক্ষণিক এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি জালিয়াতি চক্রের তৎপরতা কমাতে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে।
ঘটনার সংক্ষিপ্ত সারণি:
| তথ্যের ধরন | বিবরণ |
| আসামি | মো. তাফসির ইসলাম (১৯) |
| পিতার নাম | লিয়াকত সিকদার |
| ঠিকানা | হস্তিশুন্ড, বামরাইল ইউনিয়ন, উজিরপুর |
| অপরাধের স্থান | ধামুরা মাধ্যমিক বিদ্যালয় কেন্দ্র |
| অপরাধের প্রকৃতি | এসএসসি পরীক্ষায় অন্যের হয়ে অংশগ্রহণ (প্রক্সি) |
| প্রদত্ত সাজা | ১ বছরের বিনাশ্রম কারাদণ্ড ও ১০০ টাকা জরিমানা |
| নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট | মহেশ্বর মণ্ডল (সহকারী কমিশনার, ভূমি) |
| আইনি ধারা | পাবলিক পরীক্ষা (অপরাধ) আইন, ১৯৮০ |
উজিরপুর উপজেলা প্রশাসন থেকে জানানো হয়েছে, নকলমুক্ত ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে পরীক্ষা সম্পন্ন করতে পরীক্ষা কেন্দ্রের আশেপাশে ১৪৪ ধারা কঠোরভাবে বলবৎ রাখা হবে এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর টহল অব্যাহত থাকবে।
