বাংলাদেশে গত এক সপ্তাহ ধরে চলমান বৈরী আবহাওয়ায় বজ্রপাতে প্রাণহানির সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। ঢাকা ও চট্টগ্রামসহ দেশের প্রায় সব বিভাগে টানা বৃষ্টিপাত ও বজ্রঝড় অব্যাহত রয়েছে। আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্যমতে, এই প্রাকৃতিক দুর্যোগে এখন পর্যন্ত সারাদেশে প্রায় ৫৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। যদিও দুর্যোগের পূর্বাভাস ও আগাম সতর্কবার্তা প্রদান করা হয়েছে, তবুও মৃত্যুঝুঁকি কমানো সম্ভব হয়নি। চলমান এই পরিস্থিতিতে মঙ্গলবার (২৮ এপ্রিল, ২০২৬) থেকে পরবর্তী ৪৮ ঘণ্টার জন্য দেশজুড়ে কালবৈশাখী ঝড়ের নতুন সতর্কবার্তা জারি করা হয়েছে।
Table of Contents
কালবৈশাখীর সতর্কবার্তা ও সমুদ্রবন্দরে সংকেত
আবহাওয়া অধিদপ্তরের বিশেষ বুলেটিনে জানানো হয়েছে, রংপুর, রাজশাহী, ময়মনসিংহ, ঢাকা, খুলনা, বরিশাল, চট্টগ্রাম এবং সিলেট বিভাগের ওপর দিয়ে উত্তর-পশ্চিম দিক থেকে ঘণ্টায় ৬০ থেকে ৮০ কিলোমিটার বেগে কালবৈশাখী ঝড় বয়ে যেতে পারে। এই সময়ে প্রবল বিজলি চমকানোসহ বজ্রবৃষ্টির উচ্চ সম্ভাবনা রয়েছে।
এদিকে, বঙ্গোপসাগরে উত্তর মৌসুমি বায়ু ও বায়ুমণ্ডলের অস্থিরতার কারণে সাগরে তীব্র গতির বাতাস বিদ্যমান রয়েছে। এর ফলে উত্তর বঙ্গোপসাগরে অবস্থানরত মাছ ধরার নৌকা ও ট্রলারসমূহকে সাবধানে চলাচল করতে বলা হয়েছে। আবহাওয়া অধিদপ্তর চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, মোংলা ও পায়রা সমুদ্রবন্দরকে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেত দেখিয়ে যেতে নির্দেশ দিয়েছে। তবে স্বস্তির খবর এই যে, আগামী ১০ দিনের মধ্যে বঙ্গোপসাগরে কোনো লঘুচাপ বা ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা নেই বলে নিশ্চিত করেছেন আবহাওয়াবিদরা।
২০২৬ সালের এপ্রিলের আবহাওয়া ও তাপমাত্রার গতিপ্রকৃতি
সাধারণত এপ্রিল মাস বাংলাদেশের জন্য চরম উত্তপ্ত একটি মাস হিসেবে গণ্য হয়। এই মাসে গড় তাপমাত্রা ৩৩.২ ডিগ্রি সেলসিয়াস থাকে এবং বিশেষ ক্ষেত্রে ৩৬ থেকে ৪২ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত উন্নীত হয়। তবে ২০২৬ সালের এপ্রিল মাস বিগত বছরগুলোর তুলনায় অনেকটাই ব্যতিক্রম ও সহনশীল। আবহাওয়াবিদ ড. মুহাম্মাদ আবুল কালাম মল্লিকের মতে, এবার শুধুমাত্র ২২শে এপ্রিল রাজশাহীতে ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছিল। এর বাইরে অবশিষ্ট সময় বজ্রবৃষ্টির আধিক্যের কারণে পরিবেশ স্বস্তিদায়ক ছিল।
তিনি উল্লেখ করেন, প্রাক-বর্ষা মৌসুমে এবার বজ্রমেঘ তৈরির প্রবণতা স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি। সাধারণত এপ্রিল মাসে গড়ে ৯টি কালবৈশাখী হওয়ার কথা থাকলেও এবার ইতিমধ্যেই ১০টির বেশি ঝড় সংঘটিত হয়েছে। বুধবার থেকে রাজশাহী ও খুলনা বিভাগে বজ্রমেঘের ঘনত্ব আরও বাড়তে পারে, যা বড় ধরনের তাণ্ডব চালানোর সক্ষমতা রাখে।
কালবৈশাখী বনাম প্রাক-বর্ষার বজ্রঝড়
আবহাওয়াবিজ্ঞানের সংজ্ঞায় মার্চ, এপ্রিল ও মে—এই তিন মাসকে ‘প্রাক-বর্ষা’ বা প্রি-মনসুন মৌসুম বলা হয়। আবহাওয়াবিদ মল্লিকের তথ্য অনুযায়ী, এই মৌসুমে সংঘটিত বজ্রঝড়কে স্থানীয়ভাবে কালবৈশাখী বলা হয়, যা মোট বজ্রঝড়ের প্রায় ৩৮ শতাংশ। অন্যদিকে জুন থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বর্ষাকালে যে বজ্রবৃষ্টি হয়, তাকে কালবৈশাখী বলা হয় না; সেটি কেবলই বজ্রঝড় হিসেবে পরিচিত। পরিসংখ্যান বলছে, প্রাক-বর্ষা মৌসুমে মেঘ থেকে ভূমিতে বা ভূমি থেকে মেঘে বিদ্যুৎ ক্ষরণের তীব্রতা বেশি থাকে, যার ফলে এই সময়ে বজ্রপাতে প্রাণহানির হার সবচেয়ে বেশি।
মে মাসের পূর্বাভাস: তাপপ্রবাহ ও ঘূর্ণিঝড়ের আশঙ্কা
আগামী মে মাসের প্রথম সপ্তাহের পর থেকে দেশজুড়ে তাপমাত্রার পরিবর্তন আসার সম্ভাবনা রয়েছে। আবহাওয়াবিদ মল্লিক পূর্বাভাস দিয়েছেন যে, মে মাসের মাঝামাঝি সময় থেকে তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বৃদ্ধি পেতে পারে। বাতাসে জলীয় বাষ্পের আধিক্য এবং বাতাসের গতিবেগ কম থাকলে জনজীবনে অস্বস্তি বা গরমের তীব্রতা বাড়তে পারে। এই উত্তপ্ত পরিস্থিতি জুন মাস পর্যন্ত অব্যাহত থাকতে পারে।
মে মাস ঐতিহাসিকভাবেই ঘূর্ণিঝড়প্রবণ মাস। এই মাসে বঙ্গোপসাগরে এক থেকে দুইটি লঘুচাপ সৃষ্টি হতে পারে, যার মধ্যে একটি নিম্নচাপ বা ঘূর্ণিঝড়ে রূপ নেওয়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তবে নিকটতম ১০ দিনের মধ্যে বড় কোনো সামুদ্রিক দুর্যোগের আশঙ্কা নেই। বর্তমানে ঢাকা, ময়মনসিংহ, খুলনা, বরিশাল, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের অধিকাংশ জায়গায় এবং রংপুর ও রাজশাহীর কিছু এলাকায় অস্থায়ীভাবে দমকা বা ঝড়ো হাওয়াসহ হালকা থেকে মাঝারি ধরনের বৃষ্টিপাত হতে পারে। এর পরবর্তী সময়ে বৃষ্টিপাতের প্রবণতা কমে গেলে তাপমাত্রার পারদ ক্রমশ ঊর্ধ্বমুখী হওয়ার পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
