কুমিল্লায় ১০২ মিলিমিটার বৃষ্টিতে নজিরবিহীন জলাবদ্ধতা: বেঞ্চে পা তুলে এসএসসি পরীক্ষা

কুমিল্লা মহানগরীসহ জেলার বিভিন্ন এলাকায় মঙ্গলবার (২৭ এপ্রিল, ২০২৬) সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত সংঘটিত প্রলয়ঙ্করী বৃষ্টিপাতে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে জেলায় ১০২ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। এই আকস্মিক ও ভারী বর্ষণের ফলে নগরীর বিস্তীর্ণ এলাকা হাঁটু থেকে কোমর সমান পানিতে তলিয়ে গিয়ে এক ভয়াবহ জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। সবচেয়ে প্রতিকূল পরিস্থিতির শিকার হয়েছে চলতি বছরের এসএসসি পরীক্ষার্থীরা, যাদের অনেক কেন্দ্রে অত্যন্ত কষ্টসাধ্য পরিবেশে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে হয়েছে।


নগরীর জলাবদ্ধতা ও জনদুর্ভোগের চিত্র

মঙ্গলবার সকাল থেকে শুরু হওয়া অবিরাম বর্ষণ দুপুর ১২টা পর্যন্ত স্থায়ী হয়। এতে কুমিল্লা নগরীর গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও বাণিজ্যিক এলাকাগুলো প্লাবিত হয়ে পড়ে। বিশেষ করে আদালত সড়ক, লাকসাম সড়ক, সালাউদ্দিন মোড়, মনোহরপুর, রেইসকোর্স এবং ঈদগাহ সড়কসহ অধিকাংশ প্রধান সংযোগ সড়ক পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় যানবাহন চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। অনেক স্থানে বৃষ্টির পানি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও বসতবাড়িতে ঢুকে পড়ায় আসবাবপত্র ও মালামালের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।

কৃষি বিভাগের প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে জানানো হয়েছে, অসময়ের এই অতিবৃষ্টির ফলে ফসলের ব্যাপক ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষ করে নিচু এলাকার ফসলি জমি তলিয়ে যাওয়ায় কৃষকরা দুশ্চিন্তায় পড়েছেন। মগবাড়ি এলাকার ব্যবসায়ী আবদুস সালাম জানান, ড্রেনেজ ব্যবস্থা পর্যাপ্ত না হওয়ায় নিমিষেই দোকানে পানি ঢুকে সব মালামাল ভিজে গেছে। তিনি দ্রুত পানি নিষ্কাশন ও দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার জন্য সিটি কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানান।


পরীক্ষাকেন্দ্রে নজিরবিহীন সংকট

ভারী বৃষ্টিপাতের ফলে চলমান এসএসসি পরীক্ষার কেন্দ্রগুলোতে এক নজিরবিহীন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। অনেক কেন্দ্রের নিচতলার হলরুমে পানি ঢুকে পড়ায় স্বাভাবিকভাবে বসে পরীক্ষা দেওয়া অসম্ভব হয়ে পড়ে। ফলে শিক্ষার্থীরা বেঞ্চের ওপর পা তুলে বসে পরীক্ষা দিতে বাধ্য হয়। এমনকি দায়িত্বরত শিক্ষকদেরও চেয়ারে পা তুলে বসে পর্যবেক্ষণ কাজ সম্পন্ন করতে দেখা গেছে।

জলাবদ্ধতার পাশাপাশি বিদ্যুৎ বিভ্রাট পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। ঝড় ও বৃষ্টি শুরু হওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই বিভিন্ন এলাকার বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। ঈশ্বরপাঠশালা স্কুল কেন্দ্রসহ বেশ কিছু কেন্দ্রে মোমবাতি ও চার্জার লাইটের মৃদু আলোয় শিক্ষার্থীরা পরীক্ষা দেয়। কোনো কোনো কেন্দ্রে পানি জমে যাওয়ায় আসন বিন্যাস ওলটপালট হয়ে যায়, ফলে অনেক শিক্ষার্থীকে দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থেকে পরীক্ষা দিতে হয়েছে। পরীক্ষা শেষে অনেক শিক্ষার্থীকে দেখা যায় কোমর সমান পানি মাড়িয়ে এবং ভিজে একাকার হয়ে কেন্দ্র ত্যাগ করতে। অভিভাবকরা অভিযোগ করেন, দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় কেন্দ্রের বিকল্প বিদ্যুৎ ব্যবস্থা ও পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা পর্যাপ্ত ছিল না।


আবহাওয়া পরিস্থিতি ও কৃষি বিভাগের আশঙ্কা

কুমিল্লা আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, মঙ্গলবার সকাল থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত ১০২ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত একটি উল্লেখযোগ্য মাত্রা। সাগরে সৃষ্ট নিম্নচাপ বা স্থানীয় বায়ুমণ্ডলের অস্থিরতার কারণে এই পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। আবহাওয়ার এই প্রতিকূল অবস্থা আগামী আরও কয়েকদিন অব্যাহত থাকতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। কৃষি কর্মকর্তারা মনে করছেন, এই অতিবৃষ্টির ফলে বোরো ধানসহ মৌসুমী শাকসবজির ক্ষতি হতে পারে। জমিতে পানি জমে থাকার ফলে ফসলে পচন ধরার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।


সিটি কর্পোরেশনের পদক্ষেপ ও আশ্বাস

জলাবদ্ধতা নিরসনে কুমিল্লা সিটি কর্পোরেশন জরুরি ভিত্তিতে কাজ শুরু করেছে। সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক ইউসুফ মোল্লা টিপু জানান, পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনা করে তাৎক্ষণিকভাবে ড্রেন ও খালের মুখ পরিষ্কারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বিকেলে তিনি গণমাধ্যমকে জানান, নগরীর পানি যে সকল ড্রেন ও খালের মাধ্যমে নিষ্কাশিত হয়, সেগুলোর প্রতিবন্ধকতা সরাতে পরিচ্ছন্নতা কর্মীরা নিরলস কাজ করছেন। খালের মুখগুলো পরিষ্কার করা হলে জলাবদ্ধতা দ্রুতই কমে আসবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

তবে নগরবাসীর দীর্ঘদিনের অভিযোগ, অপরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যবস্থা এবং ড্রেনে বর্জ্য ফেলার কারণে সামান্য বৃষ্টিতেই কুমিল্লা নগরীতে এ ধরণের ভোগান্তি নিয়মিত ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিকেল পর্যন্ত নগরীর অনেক নিচু এলাকায় পানি জমে থাকতে দেখা গেছে, যা অপসারিত হতে দীর্ঘ সময় লাগতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।


এক নজরে ক্ষয়ক্ষতির চিত্র:

  • বৃষ্টির পরিমাণ: ১০২ মিলিমিটার (সকাল থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত)।

  • আক্রান্ত এলাকা: আদালত সড়ক, লাকসাম সড়ক, রেইসকোর্সসহ কুমিল্লা নগরীর অধিকাংশ এলাকা।

  • পরীক্ষার্থীদের দুর্ভোগ: হাঁটু সমান পানিতে পরীক্ষা প্রদান, বিদ্যুৎহীন কেন্দ্রে মোমবাতির আলোয় পরীক্ষা।

  • ক্ষয়ক্ষতি: ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও বাসাবাড়িতে পানি প্রবেশ, ফসলের ক্ষতির আশঙ্কা।

প্রশাসন এবং আবহাওয়া অধিদপ্তর জনসাধরণকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছে এবং জলাবদ্ধতা মোকাবিলায় সম্মিলিত প্রচেষ্টার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।