আবদুস সামাদ আজাদ স্মরণ

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে আবদুস সামাদ আজাদ এক প্রাজ্ঞ, দৃঢ়চেতা ও সংগ্রামী নেতৃত্বের প্রতীক হিসেবে চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবন, দেশপ্রেম, আন্দোলন-সংগ্রাম এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় তাঁর অবদান জাতির ইতিহাসে বিশেষ মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত।

তিনি ১৯২২ সালের ১৫ জানুয়ারি সুনামগঞ্জ জেলার জগন্নাথপুর উপজেলার ভুরাখালি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা মোহাম্মদ শরীয়তুল্লাহ। শৈশব থেকেই তিনি মেধাবী ও নেতৃত্বগুণসম্পন্ন ছিলেন। ১৯৪৩ সালে সুনামগঞ্জ সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ম্যাট্রিকুলেশন এবং ১৯৪৮ সালে সিলেটের মুরারী চাঁদ কলেজ থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন।

ছাত্রজীবনেই তাঁর রাজনৈতিক যাত্রা শুরু হয়। ১৯৪০ সালে সুনামগঞ্জ মহকুমা মুসলিম ছাত্র ফেডারেশনের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের মাধ্যমে তিনি নেতৃত্বের পথে এগিয়ে যান। পরবর্তী সময়ে ১৯৪৪ থেকে ১৯৪৮ সাল পর্যন্ত সিলেট জেলা ছাত্র ফেডারেশনের সভাপতি হিসেবে বিভিন্ন আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন এবং একাধিকবার কারাবরণ করেন।

পঞ্চাশের দশকের শুরুতে তিনি কিছু সময় শিক্ষকতা ও বীমা পেশায় যুক্ত থাকলেও তাঁর মূল ধারা ছিল রাজনীতি। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণের কারণে তিনি কারাবন্দি হন, যা তাঁর ভাষা ও মাতৃভাষার প্রতি গভীর ভালোবাসার প্রতিফলন।

১৯৫৩ সালে তিনি পূর্ব পাকিস্তান যুবলীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি নির্বাচিত হন। ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে সুনামগঞ্জ থেকে প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হয়ে তিনি জনগণের আস্থা অর্জন করেন। পরবর্তীতে ১৯৫৫ সালে তিনি আওয়ামী লীগে যোগ দিয়ে কেন্দ্রীয় পর্যায়ে শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। রাজনৈতিক মতপার্থক্যের কারণে পরে তিনি মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বাধীন কৃষক শ্রমিক পার্টিতে যোগ দেন।

১৯৫৮ সালে সামরিক শাসন জারির পর তিনি গ্রেপ্তার হন এবং দীর্ঘ চার বছর কারাবন্দি থাকেন। ১৯৬৪ সালের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা প্রতিরোধেও তাঁর সাহসী ভূমিকা ছিল, যার জন্য তাঁকে আবারও কারাবরণ করতে হয়। ১৯৬৯ সালে তিনি পুনরায় আওয়ামী লীগে ফিরে এসে সিলেট জেলা শাখার সভাপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

১৯৭০ সালের নির্বাচনে তিনি জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে তিনি মুজিবনগর সরকারের অন্যতম সংগঠক হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। স্বাধীনতার পূর্বমুহূর্তে তিনি পররাষ্ট্র বিষয়ক দায়িত্বে যুক্ত হন এবং স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সরকারের অধীনে কৃষি বিষয়ক দায়িত্ব পালন করেন।

নিচে তাঁর জীবনের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাবলির সংক্ষিপ্ত সময়রেখা দেওয়া হলো—

সময়কালঘটনা
১৯২২জন্ম সুনামগঞ্জে
১৯৪০ছাত্র ফেডারেশনের সভাপতি
১৯৫২ভাষা আন্দোলনে অংশগ্রহণ ও কারাবরণ
১৯৫৪প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য নির্বাচিত
১৯৫৮সামরিক শাসনে গ্রেপ্তার
১৯৬৯আওয়ামী লীগে পুনরায় যোগদান
১৯৭০জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত
১৯৭১মুক্তিযুদ্ধে সংগঠক ও সরকারে দায়িত্ব
১৯৭৩সংসদ সদস্য নির্বাচিত
১৯৯১–২০০১একাধিকবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত
২০০৫মৃত্যুবরণ

স্বাধীন বাংলাদেশে তিনি একাধিকবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন এবং জনসেবায় নিজেকে নিবেদিত রাখেন। ১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর তিনি পুনরায় কারাবন্দি হন এবং ১৯৭৮ সাল পর্যন্ত কারাগারে থাকেন।

দীর্ঘ সংগ্রাম, ত্যাগ ও দেশপ্রেমে পরিপূর্ণ জীবন শেষে ২০০৫ সালের ২৭ এপ্রিল ঢাকায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন। আবদুস সামাদ আজাদ শুধু একজন রাজনীতিবিদ নন, তিনি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ এবং জাতীয় রাজনীতির এক অটল স্তম্ভ হিসেবে ইতিহাসে অমর হয়ে থাকবেন।