বাগেরহাটের রামপাল উপজেলায় ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনায় নবদম্পতিসহ একই পরিবারের বহু সদস্যের মৃত্যুতে পুরো এলাকায় গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে। এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় মোট ১৪ জন প্রাণ হারিয়েছেন। নিহতদের মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে এবং তাঁদের জানাজা ও দাফনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। নবদম্পতির সুখের জীবনের শুরু হওয়ার আগেই এমন করুণ পরিণতি স্থানীয় মানুষের মনে গভীর বেদনা সৃষ্টি করেছে।
স্বজনদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে নিহতদের মরদেহ ময়নাতদন্ত ছাড়াই বৃহস্পতিবার রাতে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও রামপাল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে পরিবারের সদস্যদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। শুক্রবার ভোরে বরপক্ষের মরদেহগুলো বাগেরহাটের মোংলা উপজেলার শেহালাবুনিয়া গ্রামে পৌঁছালে সেখানে শোকাবহ পরিবেশের সৃষ্টি হয়। গ্রামজুড়ে কান্না ও আহাজারির শব্দে বাতাস ভারী হয়ে ওঠে। অপরদিকে কনের মরদেহ নেওয়া হয়েছে খুলনার কয়রা উপজেলার আমাদী ইউনিয়নের নাকসা গ্রামে, যেখানে তাঁর স্বজনরা শোকাহত অবস্থায় অপেক্ষা করছিলেন।
পুলিশ ও পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, খুলনার কয়রা উপজেলার নাকসা গ্রামের বাসিন্দা আবদুস সালাম মোড়লের মেয়ে মার্জিয়া আক্তার (মিতু) এর সঙ্গে মোংলা পৌরসভার ৮ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি আবদুর রাজ্জাকের ছোট ছেলে আহাদুর রহমান (ছাব্বির) এর বিয়ে হয় বুধবার রাতে। বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা শেষ হওয়ার পর বৃহস্পতিবার দুপুর প্রায় ১২টা ১৫ মিনিটে নববধূকে নিয়ে বরপক্ষ মোংলার উদ্দেশে রওনা দেয়।
বর ও কনেসহ দুই পরিবারের মোট ১৪ জন একটি মাইক্রোবাসে করে যাত্রা করছিলেন। পথিমধ্যে মোংলার নিকটবর্তী রামপাল উপজেলার বেলাইবিজ এলাকায় পৌঁছালে বিপরীত দিক থেকে আসা নৌবাহিনীর একটি বাসের সঙ্গে মাইক্রোবাসটির মুখোমুখি সংঘর্ষ ঘটে। সংঘর্ষ এতটাই তীব্র ছিল যে ঘটনাস্থলেই অধিকাংশ যাত্রীর মৃত্যু হয়। দুর্ঘটনায় মাইক্রোবাসের চালকসহ ১৪ জন নিহত হন এবং একজন গুরুতর আহত অবস্থায় খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
নিহতদের মধ্যে রয়েছেন বর আহাদুর রহমান, তাঁর বাবা আবদুর রাজ্জাক, ভাই আবদুল্লাহ সানি, বোন উম্মে সুমাইয়া (ঐশী), তাঁর শিশু সন্তান সামিউল ইসলাম ফাহিম, বড় ভাই আশরাফুল আলমের স্ত্রী ফারহানা সিদ্দিকা (পুতুল) এবং তাঁদের সন্তান আলিফ, আরফা ও ইরাম। এছাড়া কনে মার্জিয়া আক্তার (মিতু), তাঁর ছোট বোন লামিয়া আক্তার, দাদি রাশিদা বেগম, নানি আনোয়ারা বেগম এবং মাইক্রোবাসের চালক নাঈমও নিহতদের তালিকায় রয়েছেন।
জানা গেছে, বর আহাদুর রহমান মোংলা শহরে একটি মোবাইল ফোনের দোকান পরিচালনা করতেন। কনে মার্জিয়া আক্তার স্থানীয় নাকসা আলিম মাদ্রাসার আলিম প্রথম বর্ষের ছাত্রী ছিলেন। পরিবারের সদস্যদের ভাষ্যমতে, তাঁদের বিয়েকে ঘিরে উভয় পরিবারে আনন্দের পরিবেশ ছিল। কিন্তু কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে সেই আনন্দ চরম শোকে পরিণত হয়।
শুক্রবার সকালে শেহালাবুনিয়া গ্রামে বরপক্ষের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, শত শত মানুষ শোকাহত পরিবারের পাশে দাঁড়াতে সেখানে ভিড় করেছেন। স্বজনদের কান্না, আহাজারি এবং প্রতিবেশীদের সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা—সব মিলিয়ে পুরো এলাকা এক শোকাবহ পরিবেশে ডুবে যায়। নিহত চার নারীর মরদেহ বাড়ির ভেতরে রাখা হয়েছে এবং অন্য পাঁচজনের মরদেহ উপজেলা পরিষদ চত্বরে রাখা হয়, যাতে স্থানীয় মানুষ শেষবারের মতো তাঁদের শ্রদ্ধা জানাতে পারেন।
পরিবারের সদস্যদের দাফনের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে আশপাশের নয়টি মসজিদ থেকে খাটিয়া আনা হয়েছে বলে জানিয়েছেন নিহত আবদুর রাজ্জাকের ছোট ভাই সাজ্জাদ সরদার। স্বজনদের গোসল সম্পন্ন করার পর মরদেহগুলো একে একে খাটিয়ায় তোলা হয়। জুমার নামাজের পর মোংলা উপজেলা পরিষদ চত্বরে জানাজা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে এবং পরে তাঁদের মোংলা পৌর কবরস্থানে দাফন করা হবে।
নিহতদের জানাজা ও দাফনের পরিকল্পনা সংক্ষেপে নিচের সারণিতে তুলে ধরা হলো—
| বিষয় | তথ্য |
|---|---|
| মোট নিহত | ১৪ জন |
| একই পরিবারের নিহত | ৯ জন |
| দুর্ঘটনার স্থান | রামপাল উপজেলার বেলাইবিজ এলাকা |
| জড়িত যানবাহন | মাইক্রোবাস ও নৌবাহিনীর বাস |
| জানাজার সময় | জুমার নামাজের পর |
| দাফনের স্থান | মোংলা পৌর কবরস্থান |
স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, একসঙ্গে এতজন মানুষের প্রাণহানির ঘটনা এ অঞ্চলে খুবই বিরল। দুর্ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই মানুষের মধ্যে গভীর শোক ও বেদনার সৃষ্টি হয়েছে। নবদম্পতির স্বপ্নভঙ্গের এই করুণ ঘটনার স্মৃতি দীর্ঘদিন ধরে এলাকাবাসীর মনে গভীর দাগ রেখে যাবে বলে মনে করছেন অনেকেই।
