বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান বলেছেন, মুক্তিযোদ্ধাদের ত্যাগ ও আদর্শের পথ ধরেই বাংলাদেশ তার গণতান্ত্রিক যাত্রা অব্যাহত রাখবে। তিনি উল্লেখ করেন, দেশের সাম্প্রতিক বিশেষ পরিস্থিতির সময়েও বাংলাদেশ সেনাবাহিনী দায়িত্বশীলতা, পেশাদারিত্ব এবং জনগণের প্রতি অঙ্গীকারের পরিচয় দিয়ে জাতীয় স্থিতিশীলতা রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
বৃহস্পতিবার ঢাকা সেনানিবাসে যুদ্ধাহত বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মানে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী আয়োজিত এক বিশেষ ইফতার ও দোয়া মাহফিলে সেনাপ্রধান এসব কথা বলেন। পবিত্র রমজান উপলক্ষে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা বহু যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা, সেনাবাহিনীর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা এবং সামরিক বাহিনীর সদস্যরা অংশগ্রহণ করেন।
সেনাপ্রধান বলেন, গত প্রায় ১৮ মাস দেশ একটি বিশেষ ও গুরুত্বপূর্ণ সময় অতিক্রম করেছে। এ সময় বাংলাদেশ সেনাবাহিনী গভীর দায়িত্ববোধ ও পেশাদার মনোভাব নিয়ে কাজ করেছে এবং সর্বদা জনগণের পাশে থেকে রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার চেষ্টা করেছে। তিনি আরও বলেন, “বাংলাদেশ আজ একটি সুস্পষ্ট গণতান্ত্রিক ধারায় প্রবেশ করেছে। এই পথচলা অব্যাহত থাকবে এবং আমাদের সশস্ত্র বাহিনী সব সময় দেশের জনগণ ও সংবিধানের প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধ থাকবে।”
তিনি মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা স্মরণ করে বলেন, স্বাধীনতার জন্য ১৯৭১ সালে বীর মুক্তিযোদ্ধারা যে ত্যাগ স্বীকার করেছেন, তা জাতির জন্য চিরকাল প্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে। তাঁদের আত্মত্যাগের কারণেই আজকের স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশের ভিত্তি সুদৃঢ় হয়েছে।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধারা ১৯৭১ সালের রণাঙ্গনের স্মৃতিচারণা করেন। তাঁরা মুক্তিযুদ্ধের কঠিন দিনগুলোর অভিজ্ঞতা তুলে ধরে নতুন প্রজন্মের কাছে স্বাধীনতার ইতিহাস ও চেতনা পৌঁছে দেওয়ার গুরুত্বের কথা বলেন। একই সঙ্গে তাঁরা দেশের বিভিন্ন সংকটময় সময়ে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর দায়িত্বশীল ভূমিকার প্রশংসা করেন।
সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান তাঁর বক্তব্যে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানসহ বিভিন্ন গণতান্ত্রিক আন্দোলনে শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানান এবং তাঁদের আত্মার মাগফেরাত কামনা করেন। তিনি বলেন, জাতির অগ্রযাত্রা যেন গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার এবং মানবিক মূল্যবোধের ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকে—এটাই সবার প্রত্যাশা।
ইফতার মাহফিলে অংশ নেওয়া যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধারা বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর এই উদ্যোগকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে উল্লেখ করেন। তাঁদের মতে, এই ধরনের আয়োজন মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি রাষ্ট্র ও সমাজের শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতার বহিঃপ্রকাশ।
অনুষ্ঠানের শুরুতে দেশ ও জাতির কল্যাণ, সমৃদ্ধি এবং শহীদদের আত্মার শান্তি কামনায় বিশেষ মোনাজাত অনুষ্ঠিত হয়। এতে উপস্থিত সবাই মহান আল্লাহর কাছে বাংলাদেশের শান্তি, উন্নয়ন এবং গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রা অব্যাহত থাকার জন্য প্রার্থনা করেন।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে মুক্তিযোদ্ধাদের অবদান অনন্য। তাঁদের অবদানের প্রতি সম্মান জানিয়ে রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান নিয়মিতভাবে নানা কর্মসূচি গ্রহণ করে থাকে। নিচে মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কিত কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য তুলে ধরা হলো—
| বিষয় | তথ্য |
|---|---|
| মুক্তিযুদ্ধের সময়কাল | ২৬ মার্চ – ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ |
| শহীদ বীর মুক্তিযোদ্ধা | প্রায় ৩০ লাখ |
| নির্যাতিত নারী | প্রায় ২ লাখ |
| স্বাধীনতার চূড়ান্ত বিজয় | ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ |
| মুক্তিযোদ্ধাদের স্বীকৃতি | রাষ্ট্রীয়ভাবে বীর মুক্তিযোদ্ধা সম্মাননা |
অনুষ্ঠানে সেনাবাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের পাশাপাশি বিপুলসংখ্যক যুদ্ধাহত বীর মুক্তিযোদ্ধা উপস্থিত ছিলেন। তাঁদের উপস্থিতিতে আয়োজনটি এক আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি করে, যেখানে স্বাধীনতার ইতিহাস, ত্যাগ এবং ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রা নিয়ে আশাবাদের প্রতিফলন ঘটে।
