তেহরান-মস্কো সামরিক সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর ও কৌশলগত: আরাকচি

ইরান ও রাশিয়ার মধ্যকার ক্রমবর্ধমান সামরিক ও কৌশলগত সম্পর্ক নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে নতুন করে জল্পনা শুরু হয়েছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন লক্ষ্যবস্তু শনাক্ত করতে রাশিয়া ইরানকে গোয়েন্দা তথ্য দিয়ে সহায়তা করছে—এমন গুঞ্জনের প্রেক্ষাপটে মুখ খুলেছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি। রোববার (৮ মার্চ) মার্কিন সংবাদমাধ্যম এনবিসি-কে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে তিনি দুই দেশের এই নিবিড় সম্পর্কের কথা পুনর্ব্যক্ত করেন। আরাকচি স্পষ্ট জানিয়েছেন যে, তেহরান ও মস্কোর মধ্যকার সামরিক সহযোগিতা কোনো সাময়িক বিষয় নয়, বরং এটি একটি দীর্ঘস্থায়ী কৌশলগত অংশীদারিত্ব।

কৌশলগত অংশীদারিত্ব ও গোয়েন্দা তথ্যের গুঞ্জন

সাক্ষাৎকারে আরাকচির কাছে সরাসরি জানতে চাওয়া হয়েছিল যে, সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী রাশিয়া কি ইরানকে মার্কিন সেনাদের অবস্থান শনাক্ত করতে এবং নির্ভুল হামলা (Precision-guided attacks) চালাতে সহায়তা করছে? জবাবে ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী এই তথ্য সরাসরি অস্বীকার না করে বরং কৌশলী উত্তর দেন। তিনি বলেন, দুই দেশের মধ্যে সামরিক সহযোগিতার এক দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে এবং এটি অত্যন্ত গোপন বা নতুন কিছু নয়।

যদিও সুনির্দিষ্ট সামরিক তথ্য তার কাছে নেই বলে তিনি দাবি করেন, তবে তিনি উল্লেখ করেন যে রাশিয়া বিভিন্ন দিক থেকে ইরানকে নিয়মিত সহযোগিতা করে যাচ্ছে। তার মতে, একটি কৌশলগত অংশীদারিত্বের অধীনে দুই দেশ একে অপরের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বৃদ্ধিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে থাকে।

দীর্ঘমেয়াদী সামরিক সম্পর্কের ভিত্তি

ইরান ও রাশিয়ার মধ্যকার এই সম্পর্ক কেবল আধুনিক যুগের নয়, বরং গত কয়েক দশক ধরে এটি শক্তিশালী হয়েছে। সিরিয়া সংকট থেকে শুরু করে বর্তমান বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতিতে উভয় দেশই পশ্চিমাদের বিরুদ্ধে একতাবদ্ধ অবস্থানে রয়েছে। আরাকচি তার সাক্ষাৎকারে এই বিষয়টির ওপরই জোর দিয়েছেন। তিনি বিশ্বাস করেন, রাশিয়ার প্রযুক্তিগত সহায়তা এবং ইরানের আঞ্চলিক প্রভাব একে অপরের পরিপূরক হিসেবে কাজ করছে।

ইরান ও রাশিয়ার সামরিক সহযোগিতার মূল ক্ষেত্রসমূহ

সহযোগিতার ক্ষেত্রবিবরণ ও লক্ষ্য
গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়আধুনিক রাডার ও স্যাটেলাইট প্রযুক্তির মাধ্যমে শত্রু শনাক্তকরণ।
অত্যাধুনিক প্রযুক্তিরাশিয়ার কাছ থেকে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও মিসাইল প্রযুক্তির উন্নয়ন।
যৌথ মহড়াপারস্য উপসাগর ও কাসপিয়ান সাগরে নৌ ও বিমান বাহিনীর সম্মিলিত অনুশীলন।
প্রতিরক্ষা সরঞ্জামড্রোন এবং প্রিসিশন-গাইডেড মিসাইল তৈরিতে পারস্পরিক কারিগরি সহায়তা।
কৌশলগত অবস্থানমধ্যপ্রাচ্যে পশ্চিমা আধিপত্য মোকাবিলায় অভিন্ন ভূ-রাজনৈতিক নীতি।

মার্কিন উদ্বেগের কারণ ও আঞ্চলিক প্রভাব

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা দীর্ঘকাল ধরে ইরান ও রাশিয়ার এই দহরম-মহরম নিয়ে উদ্বিগ্ন। বিশেষ করে ইউক্রেন যুদ্ধ এবং মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান অস্থিতিশীল পরিস্থিতির মধ্যে রাশিয়ার প্রযুক্তি যদি ইরানের হাতে পৌঁছায়, তবে তা ওই অঞ্চলে মোতায়েনকৃত মার্কিন সেনাদের জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। এনবিসি-র সাংবাদিক যখন নির্দিষ্টভাবে মার্কিন সেনাদের ওপর হামলার বিষয়ে রাশিয়ার সহায়তার কথা বলেন, তখন আরাকচি বিষয়টিকে রাশিয়ার সাথে ইরানের “অত্যন্ত দৃঢ় সম্পর্ক” হিসেবে অভিহিত করেন।

তিনি বলেন, “যতদূর আমি জানি, রাশিয়ার সাথে আমাদের খুব ভালো অংশীদারিত্ব আছে। তারা আমাদের বিভিন্ন দিক থেকে সাহায্য করছে, তবে আমার কাছে অপারেশনাল বা সুনির্দিষ্ট বিস্তারিত কোনো সামরিক তথ্য নেই।” তার এই বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি আসলে বুঝিয়ে দিয়েছেন যে, সামরিক তথ্য জনসম্মুখে প্রকাশ না করলেও দুই দেশের মধ্যে পর্দার অন্তরালে অত্যন্ত গভীর সমন্বয় বিদ্যমান।

উপসংহার ও ভবিষ্যৎ গতিপথ

আব্বাস আরাকচির এই সাক্ষাৎকার এটিই প্রমাণ করে যে, ইরান ও রাশিয়া তাদের সামরিক বন্ধনকে আরও উচ্চতায় নিয়ে যেতে বদ্ধপরিকর। এটি কেবল একটি দ্বিপাক্ষিক চুক্তি নয়, বরং বিশ্বব্যবস্থায় পশ্চিমাদের চ্যালেঞ্জ জানানোর একটি সম্মিলিত প্রয়াস। ভবিষ্যতে এই সম্পর্ক আরও জোরালো হবে বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি। ইরান মনে করে, রাশিয়ার সাথে এই নিবিড় বন্ধন তাদের জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং আঞ্চলিক শক্তিসাম্য বজায় রাখতে অপরিহার্য। ফলে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা বা পশ্চিমা চাপ সত্ত্বেও এই কৌশলগত অংশীদারিত্ব অব্যাহত থাকবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।