বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান প্রবেশদ্বার চট্টগ্রাম বন্দরে চলমান শ্রমিক ধর্মঘট এবং সরবরাহ খাতের বিদ্যমান নানাবিধ সংকট নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন দেশের শীর্ষ অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দ। গত মঙ্গলবার রাজধানীর গুলশানে আমেরিকান চেম্বার অব কমার্স ইন বাংলাদেশ (অ্যামচেম) আয়োজিত ‘সরবরাহ খাতের প্রেক্ষাপট নির্মাণ: প্রতিবন্ধকতা, সম্ভাবনা ও ভবিষ্যৎ করণীয়’ শীর্ষক এক অংশীজন আলোচনা সভায় বক্তারা এসব কথা বলেন।
বন্দর অচলাবস্থা ও বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় সক্ষমতা
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান এম মাসরুর রিয়াজ তাঁর বক্তব্যে বলেন, লজিস্টিকস বা সরবরাহ ব্যবস্থা একটি দেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড। চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) বিদেশি অপারেটরকে ইজারা দেওয়ার প্রতিবাদে শ্রমিকদের কর্মবিরতি বন্দর কার্যক্রমে কার্যত স্থবিরতা সৃষ্টি করেছে। মাসরুর রিয়াজের মতে, দেশের অর্থনীতির বিশাল আকারের তুলনায় আমাদের বন্দরগুলোর সক্ষমতা ও দক্ষতা এখনো অপ্রতুল।
তিনি সতর্ক করে বলেন, ভবিষ্যতে বে টার্মিনাল বা মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরের মতো বড় প্রকল্পগুলোতে যদি পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) ভিত্তিতে বিদেশি বিনিয়োগ ও আন্তর্জাতিক মানের অপারেটর যুক্ত না করা যায়, তবে বাংলাদেশ বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়বে। ২০৩০ সালের মধ্যে ৭৬০ বিলিয়ন ডলারের জিডিপি লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হলে বন্দর ও লজিস্টিকস খাতের আমূল পরিবর্তন অপরিহার্য।
সরবরাহ খাতের চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনার রূপরেখা
আলোচনায় উঠে আসে যে, লজিস্টিকস ব্যয় মাত্র ১ শতাংশ কমাতে পারলে দেশের রপ্তানি আয় ৭ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো সম্ভব। বিশেষ করে স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণের পর বৈশ্বিক বাজারে টিকে থাকতে হলে লজিস্টিকস দক্ষতার কোনো বিকল্প নেই। সরবরাহ খাতের বর্তমান পরিস্থিতি ও বিশেষজ্ঞদের সুপারিশ নিচে একটি টেবিলের মাধ্যমে তুলে ধরা হলো:
| খাতের নাম | বিদ্যমান চ্যালেঞ্জ ও সীমাবদ্ধতা | বিশেষজ্ঞদের প্রস্তাবিত সমাধান |
| বন্দর ব্যবস্থাপনা | শ্রমিক ধর্মঘট ও এনসিটি পরিচালনায় অচলাবস্থা। | পিপিপি মডেলে বিদেশি অপারেটর নিয়োগ ও আধুনিকায়ন। |
| বিমান লজিস্টিকস | উচ্চ ব্যয় (সড়কপথের চেয়ে ২০-২৫% বেশি) ও সরাসরি ফ্লাইটের অভাব। | যুক্তরাষ্ট্রে সরাসরি কার্গো ফ্লাইট চালু ও গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং উন্নত করা। |
| নীতিমালা | জাতীয় লজিস্টিকস নীতি অনুমোদনে ধীরগতি। | প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীনে লজিস্টিকস বিভাগ গঠন। |
| ডিজিটালাইজেশন | ম্যানুয়াল খালাস প্রক্রিয়া ও শুল্কায়নে দীর্ঘসূত্রতা। | শুল্ক আইন ২০২৩ কার্যকর ও ডিজিটাল পেমেন্ট নিশ্চিত করা। |
| রপ্তানি বাণিজ্য | এলডিসি উত্তরণ পরবর্তী প্রতিযোগিতা ও সক্ষমতার অভাব। | লজিস্টিকস ব্যয় কমিয়ে রপ্তানি প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকা। |
প্রযুক্তির ব্যবহার ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার
অ্যামচেম বাংলাদেশের সভাপতি সৈয়দ এরশাদ আহমেদ তাঁর উদ্বোধনী বক্তব্যে বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), অটোমেশন এবং ডিকার্বনাইজেশন এখন বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার অবিচ্ছেদ্য অংশ। বাংলাদেশ এই ট্রেন্ডগুলো গ্রহণে পিছিয়ে থাকলে দীর্ঘমেয়াদী সংকটে পড়বে। অন্যদিকে, বিশ্বব্যাংকের জ্যেষ্ঠ পরিবহন বিশেষজ্ঞ নুসরাত নাহিদ ববি নতুন সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন যেন লজিস্টিকস খাতকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। তাঁর মতে, ‘জাতীয় লজিস্টিকস নীতি ২০২৫’ দ্রুত অনুমোদন এবং এর অধীনে একটি বিশেষায়িত বিভাগ গঠন করা সময়ের দাবি।
এছাড়া, সিটিব্যাংক এনএর বাংলাদেশ কান্ট্রি অফিসার মো. মইনুল হক এবং সিএফ গ্লোবালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাহবুবুল আনাম লজিস্টিকস খাতের ব্যয় কমানোর জন্য ইলেকট্রনিক নথি দাখিল ও ই-কমার্স উপযোগী দ্রুত খালাস প্রক্রিয়া চালুর ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
পরিশেষে বলা যায়, চট্টগ্রাম বন্দরের এই অচলাবস্থা কেবল একটি আঞ্চলিক সমস্যা নয়, বরং এটি জাতীয় অর্থনীতির নিরাপত্তার প্রশ্ন। সঠিক সময়ে যথাযথ সংস্কার ও প্রযুক্তির সমন্বয় না ঘটলে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়বে।
