অন্যায়ের বিরুদ্ধে এক নিঃশব্দ প্রতিবাদী: ড. মজিবর রহমান দেবদাস

বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের ইতিহাসে অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করা বীরদের কথা আমরা যতটা জানি, মেধা ও মনন দিয়ে অন্যায়ের প্রতিবাদ করা মহানুভবদের কথা ততটা আলোচিত হয় না। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত বিভাগের প্রাক্তন শিক্ষক ড. মজিবর রহমান দেবদাস এমনই এক বিস্ময়কর ব্যক্তিত্ব, যিনি একাত্তরের অমানবিক নির্যাতনের শিকার হয়েও আমৃত্যু নিজের আদর্শ ও প্রতিবাদী চেতনা থেকে বিচ্যুত হননি। তাঁর জীবনকাহিনি কেবল একজন শিক্ষকের গল্প নয়, বরং চরম প্রতিকূলতার মাঝেও মানবিক মূল্যবোধকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরার এক অনন্য ইতিহাস।

শিক্ষাজীবন ও কর্মজীবনের প্রারম্ভ

মজিবর রহমান ১৯৩০-এর দশকে জয়পুরহাটে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফলিত গণিতে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করার পর উচ্চশিক্ষার জন্য অস্ট্রেলিয়া যান। ১৯৬৪ সালে মেলবোর্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি এমএসসি ডিগ্রি অর্জন করেন। দেশে ফিরে ১৯৬৭ সালে তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত বিভাগে সিনিয়র লেকচারার হিসেবে যোগদান করেন। একজন নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষক ও প্রাজ্ঞ গণিতবিদ হিসেবে স্বল্প সময়ের মধ্যেই তিনি শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মাঝে অত্যন্ত জনপ্রিয় ও সমাদৃত হয়ে ওঠেন।

১৯৭১: নাম পরিবর্তন ও প্রতিবাদের ভাষা

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী সারা দেশে নারকীয় তান্ডব চালায়। সেই সময় ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা যখন আক্রান্ত হচ্ছিলেন এবং অনেকে প্রাণ বাঁচাতে নিজেদের পরিচয় গোপন করছিলেন, তখন মজিবর রহমান সম্পূর্ণ বিপরীত ও দুঃসাহসী এক সিদ্ধান্ত নেন। তিনি পাকিস্তানি বাহিনীর সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষের প্রতিবাদ জানাতে নিজের নামের শেষে ‘দেবদাস’ পদবি যুক্ত করেন। মুসলিম পরিবারে জন্ম নিয়েও ধর্মীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে মানবতার পক্ষে দাঁড়ানোর এমন দৃষ্টান্ত ইতিহাসে বিরল।

কারাবরণ ও অমানবিক নির্যাতন

১৯৭১ সালের ১০ মে তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত বিভাগের প্যাডে একটি সংক্ষিপ্ত কিন্তু অত্যন্ত শক্তিশালী পত্র লেখেন। সেখানে তিনি উল্লেখ করেন যে, বিশ্ববিদ্যালয়টি বর্তমানে একটি সেনাশিবিরে পরিণত হয়েছে এবং শিক্ষার স্বাভাবিক পরিবেশ না ফেরা পর্যন্ত তিনি আর বিভাগে ফিরবেন না। এই সাহসিকতার মূল্য তাঁকে দিতে হয়েছিল অত্যন্ত নির্মমভাবে। পাকিস্তানি বাহিনী তাঁকে গ্রেপ্তার করে জোহা হলের টর্চার সেলে নিয়ে যায়। সেখানে টানা পাঁচ মাস তাঁর ওপর চলে অমানুষিক শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন। এই নির্যাতনের ফলে তিনি ভারসাম্যহীন হয়ে পড়েন। প্রখ্যাত লেখক নাজিম মাহমুদ তাঁর এই অবস্থাকে ‘জ্যান্ত শহীদ’ হিসেবে অভিহিত করেছিলেন।

ড. মজিবর রহমান দেবদাসের সংক্ষিপ্ত জীবনপঞ্জি

বিষয়তথ্য
জন্মস্থানমহীপুর, জয়পুরহাট।
উচ্চশিক্ষামেলবোর্ন বিশ্ববিদ্যালয়, অস্ট্রেলিয়া (১৯৬৪)।
পেশাশিক্ষক, গণিত বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।
যোগদান১ মে ১৯৬৭ (সিনিয়র লেকচারার)।
প্রতিবাদী নামমজিবর রহমান দেবদাস।
নির্যাতনের সময়কাল১০ মে ১৯৭১ থেকে প্রায় পাঁচ মাস।
রাষ্ট্রীয় সম্মাননাএকুশে পদক (২০১৫)।
মৃত্যু১৮ মে ২০২০।

উত্তর-প্রজন্মের অবহেলা ও দীর্ঘ লড়াই

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ড. মজিবর রহমান দেবদাস আবার তাঁর প্রিয় প্রাঙ্গণ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরে আসতে চেয়েছিলেন। কিন্তু আমলাতান্ত্রিক জটিলতা আর সাম্প্রদায়িক সংকীর্ণতা তাঁর পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাঁকে ‘মজিবর রহমান’ নামে যোগ দিতে বললেও তিনি তাঁর প্রতিবাদী সত্তা ‘দেবদাস’ নাম ত্যাগ করতে অস্বীকৃতি জানান। তিনি আইনি প্রক্রিয়ায় এফিডেভিট করে নিজের নাম স্থায়ীভাবে পরিবর্তন করেন। এর ফলে তিনি দীর্ঘকাল কর্মহীন ও অবহেলিত জীবন অতিবাহিত করেন। জয়পুরহাটের নিজ গ্রামে তিনি লোকচক্ষুর আড়ালে অনেকটা নিভৃতেই দিন কাটান।

বিশ্বখ্যাত গণিতবিদ জন ন্যাশ মানসিক অসুস্থতা জয় করে যেমন বিজ্ঞানে অবদান রেখে নোবেল পেয়েছিলেন, আমাদের ড. মজিবর রহমান দেবদাসও ছিলেন মেধার দিক থেকে সমপর্যায়ের। অথচ স্বাধীনতার দীর্ঘ সময় পরও তিনি উপযুক্ত রাষ্ট্রীয় মর্যাদা পাননি। অবশেষে ২০১৫ সালে বাংলাদেশ সরকার তাঁকে সমাজসেবায় অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ‘একুশে পদক’ প্রদান করে। ২০২০ সালের ১৮ মে এই নিঃশব্দ যোদ্ধা ও মহান শিক্ষক না ফেরার দেশে চলে যান। ড. মজিবর রহমান দেবদাসের ত্যাগ ও সাহসিকতা বাংলাদেশের বুদ্ধিবৃত্তিক সংগ্রামের ইতিহাসে এক চিরস্থায়ী অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে।