আয় সুরক্ষা বীমার সম্ভাবনা ও বাস্তবতা

বাংলাদেশের শ্রমবাজার ২০২৬ সালে এসে ক্রমাগত চাপের মুখে রয়েছে। সাম্প্রতিক বিভিন্ন পরিসংখ্যান ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, চাকরি হারানো, শিক্ষিত বেকারত্ব বৃদ্ধি এবং শিল্পখাতে অস্থিরতা মিলিয়ে দেশের কর্মসংস্থান পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠেছে।

সাম্প্রতিক অর্থবছরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩–২৪ অর্থবছরে প্রায় ২০ লক্ষ মানুষ কর্মসংস্থান হারিয়েছেন বলে বিশ্বব্যাংক ও সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সময়ে ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের জুলাই পর্যন্ত প্রায় ২৪৫টি কারখানা বন্ধ হয়ে যায়, যার ফলে প্রায় ১ লক্ষ শ্রমিক সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হন।

অর্থনীতিবিদদের মতে, বৈশ্বিক বাজারে চাহিদা হ্রাস, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং রপ্তানিনির্ভর শিল্পের চাপ এই পরিস্থিতিকে দীর্ঘায়িত করছে। এর পাশাপাশি শ্রমবাজারে দক্ষতার ঘাটতিও একটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০২৪ সালের শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী, দেশে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা প্রায় ৯ লক্ষ। উচ্চ শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর মধ্যে বেকারত্বের হার ১৩.৫ শতাংশ, যা অন্যান্য স্তরের তুলনায় বেশি। ২০২৪–২৫ অর্থবছরের অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর প্রান্তিকে বেকারত্বের হার দাঁড়ায় ৪.৬৩ শতাংশে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই আনুষ্ঠানিক হার বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণভাবে প্রতিফলিত করে না, কারণ আংশিক কর্মসংস্থান ও অনিয়মিত আয়ের বিষয়গুলো এতে অন্তর্ভুক্ত নয়।

বেকারত্ব ও শিল্পখাত পরিস্থিতি (সারসংক্ষেপ)

সূচকতথ্য
২০২৩–২৪ অর্থবছরে চাকরি হারানোপ্রায় ২০ লক্ষ জন
২০২৪–২৫ সময়ে কারখানা বন্ধ২৪৫টি
ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিকপ্রায় ১ লক্ষ জন
শিক্ষিত বেকারপ্রায় ৯ লক্ষ জন
উচ্চ শিক্ষিত বেকারত্ব হার১৩.৫ শতাংশ
বেকারত্ব হার (২০২৪ শেষ প্রান্তিক)৪.৬৩ শতাংশ

বাংলাদেশে বীমা খাতের পেনিট্রেশন হার এখনো খুবই কম, জিডিপির প্রায় ০.৩৩ থেকে ০.৪০ শতাংশের মধ্যে সীমিত। তুলনামূলকভাবে ভারতে এই হার প্রায় ৪ শতাংশ এবং পাকিস্তানে প্রায় ০.৬০ শতাংশ। এই ব্যবধান বীমা খাতের সীমিত বিস্তারের ইঙ্গিত দেয়।

একই সঙ্গে দাবি নিষ্পত্তির হারও উদ্বেগজনক। ২০২৫ সালের প্রথম নয় মাসে মোট সংগৃহীত প্রিমিয়ামের মাত্র ৪৮ শতাংশ দাবি হিসেবে পরিশোধ করা হয়েছে। এর মধ্যে জীবন বীমায় ৩৫.১৮ শতাংশ এবং সাধারণ বীমায় মাত্র ৭.৫৫ শতাংশ দাবি নিষ্পত্তি হয়েছে।

খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, এই নিম্ন দাবি নিষ্পত্তির হার গ্রাহকের আস্থা কমিয়ে দিচ্ছে, যা নতুন বীমা পণ্য চালুর ক্ষেত্রে একটি বড় বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

এই প্রেক্ষাপটে আয় সুরক্ষা বীমা একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা হিসেবে সামনে এসেছে। এটি এমন একটি বীমা ব্যবস্থা, যেখানে চাকরি হারানো বা আয়ের উৎস বন্ধ হয়ে গেলে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য মাসিক আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হয়। বর্তমান শ্রমবাজারের বাস্তবতায় এটি শ্রমিক ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির জন্য একটি সম্ভাব্য সুরক্ষা ব্যবস্থা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

সরকার ইতোমধ্যে কিছু সীমিত পরিসরে উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। তৈরি পোশাক খাতের প্রায় ৪০ লক্ষ শ্রমিককে অন্তর্ভুক্ত করে কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনা বা মৃত্যুর ক্ষেত্রে সুরক্ষার জন্য একটি কর্মসূচি চালু রয়েছে। পাশাপাশি রপ্তানিমুখী শিল্পের শ্রমিকদের জন্য একটি সহায়তা কর্মসূচির আওতায় সর্বোচ্চ তিন মাস পর্যন্ত মাসিক ৫ হাজার টাকা নগদ সহায়তা প্রদান করা হচ্ছে।

বিশ্বব্যাপী আয় সুরক্ষা বীমার বাজারও দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। ২০২৪ সালে এই বাজারের আকার ছিল প্রায় ৪৩.৫২ বিলিয়ন ডলার, যা ২০৩২ সালের মধ্যে প্রায় ৫৯.১০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে বলে পূর্বাভাস রয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের শ্রমবাজারে আয় সুরক্ষা বীমা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করতে হলে বীমা খাতের প্রতি আস্থা বৃদ্ধি, দ্রুত দাবি নিষ্পত্তি, নীতিগত সংস্কার এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির মতো পদক্ষেপ প্রয়োজন। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে এটি ভবিষ্যতে দেশের সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশে পরিণত হতে পারে।