বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে ঋণসংক্রান্ত জটিল সমস্যার মুখোমুখি। বিশেষ করে ব্যাংক খাতের অপ্রদত্ত ঋণ বা নন-পারফর্মিং লোন (Non-Performing Loan – NPL) দেশের আর্থিক স্থিতিশীলতার ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশের মোট ঋণের প্রায় ৩৫ শতাংশ অপ্রদত্ত অবস্থায় রয়েছে। ব্যাংকিং অনুমোদন প্রক্রিয়ায় অনিয়ম ও দুর্নীতি এই সংকটকে আরও জটিল করেছে।
মূল সমস্যাটি উদ্ভূত হয়েছে ব্যাংক-কেন্দ্রিক অর্থায়ন ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার কারণে। বিশ্বব্যাপী দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের জন্য সরকারী ও কর্পোরেট বন্ড বাজার এবং পুঁজিবাজারকে প্রধান উৎস হিসেবে বিবেচনা করা হয়। যুক্তরাষ্ট্র, জাপান এবং ইউরোপীয় দেশগুলোতে শক্তিশালী বন্ড বাজার অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক। একইভাবে, ভারত, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার মতো উন্নয়নশীল দেশগুলো গত দুই দশকে শক্তিশালী স্থানীয় বন্ড বাজার গড়ে তুলেছে, যা তাদের অবকাঠামো উন্নয়ন ও শিল্পায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
বাংলাদেশের বন্ড বাজার এখনও ক্ষীণ এবং ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এর আকার প্রায় ৩০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় কম। বাজার সীমাবদ্ধতার প্রধান কারণগুলো নিম্নরূপ:
| সীমাবদ্ধতা | ব্যাখ্যা | প্রভাব |
|---|---|---|
| জটিল ও ব্যয়বহুল প্রক্রিয়া | অনুমোদন, ক্রেডিট রেটিং, ট্রাস্টি ও লিস্টিং প্রক্রিয়া সময় ও খরচ বৃদ্ধি করে | নতুন ইস্যুয়ার আগ্রহ কমে যায় |
| বিনিয়োগকারীর আস্থা অভাব | পূর্বের অমর্যাদাকর ঋণ পরিশোধের অভিযোগ | বাজারে নেতিবাচক সিগনাল এবং অবিশ্বাস বৃদ্ধি |
| Institutional investor-এর অভাব | পেনশন ফান্ড, বীমা ও মিউচুয়াল ফান্ডের অবকাঠামো দুর্বল | দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ সীমিত থাকে |
| সরকারি সেভিংস সার্টিফিকেটের উচ্চ সুদ | বিনিয়োগকারীরা বেশি সুদযুক্ত বিকল্প বেছে নেয় | বন্ডে বিনিয়োগ সীমিত থাকে |
বাংলাদেশকে ব্যাংক-কেন্দ্রিক অর্থনীতি থেকে সরিয়ে বৈচিত্র্যময় অর্থায়ন কাঠামোর দিকে অগ্রসর হতে হবে। এর জন্য প্রক্রিয়া সরল ও ব্যয়-সাশ্রয়ী করতে হবে, কঠোর নিয়ন্ত্রক বিধি কার্যকর করতে হবে এবং পেনশন ও বীমা খাতের সংস্কার প্রয়োজন। এছাড়া, সেভিংস সার্টিফিকেটের সুদের হার বাজারভিত্তিক করা হলে বন্ডে বিনিয়োগ বৃদ্ধি পাবে।
নতুন ধারনাগুলোও সম্ভাবনাময়। সুকুক বন্ড, গ্রীন বন্ড ও সামাজিক বন্ড বর্তমানে বৈশ্বিকভাবে জনপ্রিয়। জলবায়ু ও টেকসই উন্নয়ন সংক্রান্ত এজেন্ডার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বাংলাদেশ যদি গ্রীন বন্ড বাজার তৈরি করে, তাহলে দেশীয় ও বৈদেশিক বিনিয়োগ আকৃষ্ট করা সম্ভব হবে।
যদি পরবর্তী সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করে, তাহলে একটি শক্তিশালী বন্ড বাজার গড়ে তোলা সম্ভব। এতে ব্যাংকিং খাতের ওপর চাপ কমবে, এবং দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীল বিনিয়োগের নতুন সম্ভাবনা উন্মুক্ত হবে।
