উল্লাপাড়ায় অনন্য দৃষ্টান্ত: এক মঞ্চে সকল প্রার্থীর নির্বাচনী অঙ্গীকার

আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬-কে কেন্দ্র করে সিরাজগঞ্জ-৪ (উল্লাপাড়া) আসনে এক অভূতপূর্ব রাজনৈতিক সহাবস্থানের চিত্র ফুটে উঠেছে। নির্বাচনী সহিংসতা ও উত্তাপের চিরাচরিত প্রথা ভেঙে এই আসনের প্রতিদ্বন্দ্বী সকল প্রার্থী একই মঞ্চে উপস্থিত হয়ে নিজ নিজ নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করেছেন। বৃহস্পতিবার (২২ জানুয়ারি) বেলা ১১টায় উল্লাপাড়া উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে আয়োজিত এই বিশেষ অনুষ্ঠানে প্রার্থীরা কেবল তাদের উন্নয়নের রূপরেখাই তুলে ধরেননি, বরং সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের স্বার্থে আচরণবিধি মেনে চলার দৃঢ় শপথ গ্রহণ করেছেন।

সম্প্রীতির মঞ্চ ও প্রশাসনের উদ্যোগ

উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও সহকারী রিটার্নিং অফিসার এটিএম আরিফের সভাপতিত্বে এই ব্যতিক্রমী অনুষ্ঠানটি সম্পন্ন হয়। ‘এক মঞ্চে সব প্রার্থীর উপস্থিতিতে নির্বাচনী ইশতেহার পাঠ ও আচরণবিধি প্রতিপালনের ঘোষণা’ শীর্ষক এই আয়োজনের মূল উদ্দেশ্য ছিল প্রার্থীদের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ তৈরি এবং ভোটারদের মধ্যে আস্থার পরিবেশ সৃষ্টি করা। প্রশাসনের এমন সৃজনশীল পদক্ষেপ রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সাধারণ ভোটারদের কাছে ব্যাপক প্রশংসিত হয়েছে।

সিরাজগঞ্জ-৪ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীরা এক নজরে:

প্রার্থীর নামরাজনৈতিক দলপ্রধান রাজনৈতিক পরিচয়
এম আকবর আলীবাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)সাবেক সংসদ সদস্য ও প্রবীণ নেতা।
মাওলানা রফিকুল ইসলাম খানবাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীকেন্দ্রীয় ও স্থানীয় প্রভাবশালী নেতা।
মুফতি আব্দুর রহমানইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশধর্মীয় ও সামাজিক ব্যক্তিত্ব।
মো. হিলটন প্রামাণিকজাতীয় পার্টিতরুণ ও প্রতিশ্রুতিশীল সংগঠক।
মো. আব্দুল হাকিমবাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টিমেহনতি মানুষের অধিকারের কণ্ঠস্বর।

ইশতেহারের মূল বিষয়বস্তু ও অঙ্গীকার

অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে পাঁচজন প্রার্থীই উল্লাপাড়ার অবকাঠামোগত উন্নয়ন, বেকারত্ব দূরীকরণ এবং কৃষিভিত্তিক শিল্পের প্রসারের ওপর জোর দেন। বিএনপি প্রার্থী এম আকবর আলী গণতান্ত্রিক অধিকার ও সুশাসনের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান নৈতিকতার ভিত্তিতে আধুনিক উল্লাপাড়া গড়ার প্রতিশ্রুতি দেন। জাতীয় পার্টি ও ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থীরা যথাক্রমে উন্নয়ন ও সাম্যের কথা বলেন এবং কমিউনিস্ট পার্টির প্রার্থী শ্রমজীবী মানুষের ন্যায্য অধিকারের ইশতেহার পাঠ করেন। তবে বক্তব্যের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক ছিল—সকল প্রার্থীই নির্বাচন পরবর্তী জয়- পরাজয় মেনে নেওয়া এবং এলাকায় শান্তি বজায় রাখার সম্মিলিত অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন।

প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের উপস্থিতি ও গুরুত্ব

অনুষ্ঠানটিতে প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তারা উপস্থিত থেকে এই সম্প্রীতির মুহূর্তটিকে তদারকি করেন। এ সময় উপস্থিত ছিলেন উল্লাপাড়ার সহকারী কমিশনার (ভূমি) শারমিন আক্তার রিমা, উপজেলা শিক্ষা অফিসার মোস্তাফিজুর রহমান, উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মো. মাহবুবুর রহমান ভূঁইয়া এবং মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা নিলুফা ইয়াসমিনসহ অন্যান্য দায়িত্বশীল ব্যক্তিবর্গ। প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়, প্রার্থীদের এই অংশগ্রহণ নির্বাচনী মাঠে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে এবং সাধারণ ভোটাররা কোনো ভয়ভীতি ছাড়াই কেন্দ্রে আসার সাহস পাবেন।

উপসংহার

উল্লাপাড়ার এই ‘সম্প্রীতির মঞ্চ’ বাংলাদেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতির জন্য একটি মডেল হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। যখন প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীরা একে অপরের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে একই মঞ্চে দাঁড়ান, তখন মাঠপর্যায়ের কর্মীদের মধ্যে হানাহানি ও সংঘাতের প্রবণতা অনেকাংশেই হ্রাস পায়। রাজনৈতিক এই পরিশীলিত আচরণ আসন্ন নির্বাচনকে একটি সত্যিকারের উৎসবে পরিণত করবে—এমনটাই উল্লাপাড়াবাসীর প্রত্যাশা।