পেত্রোকে ট্রাম্পের সর্বশেষ কড়া হুঁশিয়ারি

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবার সরাসরি কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেত্রোকে লক্ষ্য করে এমন এক মন্তব্য করেছেন, যা লাতিন আমেরিকার কূটনীতিতে নতুন উত্তেজনার জন্ম দিয়েছে। ব্যবসায়ী নেতাদের সঙ্গে হোয়াইট হাউসে আয়োজিত এক গোলটেবিল বৈঠকে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প জানান, কলম্বিয়া নাকি যুক্তরাষ্ট্রে কোকেন পাঠানো অব্যাহত রেখেছে এবং পেত্রো ‘নিজের ভালোর জন্য সাবধান’ না থাকলে কঠিন পরিস্থিতির মুখে পড়তে পারেন।

প্রশ্নটা ছিল সহজ—ট্রাম্প কি সম্প্রতি কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্টের সঙ্গে কথা বলেছেন? কিন্তু উত্তরটি তৈরি করে দিল কূটনৈতিক ঝড়। ট্রাম্প ক্ষুব্ধ ভঙ্গিতে বলেন, পেত্রো যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি “শত্রুভাবাপন্ন”, তাই তাকে বিশেষ গুরুত্ব দেননি। পরে আরও কঠোর অবস্থান নেন তিনি। তাঁর ভাষায়, “যদি তিনি নিজের ভালোর কথা না ভাবেন, তাহলে পরবর্তী নিশানা তিনি নিজেই হতে পারেন। আমরা যারা মানুষ হত্যা করে, তাদের পছন্দ করি না।”

ট্রাম্পের এই মন্তব্য এসেছে এমন সময়, যখন তিনি ক্যারিবীয় সাগরে কথিত নিষেধাজ্ঞা ভঙ্গের অভিযোগে ভেনেজুয়েলা ও ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন সামরিক অভিযানের প্রসঙ্গ টানছিলেন। এরই মধ্যেই কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্টকে হুমকি দেওয়া পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করে তুলেছে।

কলম্বিয়ার ইতিহাসে প্রথম বামপন্থী প্রেসিডেন্ট হিসেবে পেত্রো দেশটির দীর্ঘস্থায়ী মাদকবিরোধী নীতি পুনর্মূল্যায়নের চেষ্টা করছেন। তাঁর সরকার মাদক উৎপাদন কমানোর বদলে অপরাধী চক্রগুলোকে নিশানা করার কৌশল নিয়েছে। পেত্রোর দাবি, তাঁর সময় ১৮ হাজারের বেশি মাদক পরীক্ষাগার ধ্বংস করা হয়েছে। অথচ ট্রাম্পের অভিযোগ—পেত্রো নাকি কোকেন উৎপাদন বন্ধে ব্যর্থ।

এই মতবিরোধে দুই দেশের সম্পর্কে তৈরি হয়েছে তীব্র টানাপোড়েন। একসময় মার্কিন সামরিক ও অর্থনৈতিক সহায়তার অন্যতম বড় গ্রহীতা ছিল কলম্বিয়া। কিন্তু ট্রাম্প ক্ষমতায় ফিরে আসার পর সম্পর্ক ক্রমশ খারাপ হয়েছে। অভিবাসননীতি নিয়েও দুই নেতা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একে অপরকে আক্রমণ করেছেন। অবৈধ অভিবাসীদের বিতাড়ন নিয়ে পেত্রোর কঠোর বক্তব্যের জবাবে ট্রাম্প কলম্বিয়ার ওপর ২৫ থেকে ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপের হুমকি দেন।

সম্প্রতি জাতিসংঘ অধিবেশনে যোগ দিতে নিউইয়র্কে যাওয়ার পর পেত্রো ট্রাম্পের সমালোচনা করেন। এর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ট্রাম্প প্রশাসন তাঁর ভিসা বাতিল করে এবং পরের মাসে জারি করে নিষেধাজ্ঞা—যার ফলে যুক্তরাষ্ট্রে থাকা তাঁর সম্পদ জব্দ হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।

অন্যদিকে, পেত্রো যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক বোমা হামলাকে “হত্যা” বলে আখ্যা দিয়েছেন। এই হামলাগুলোতে ক্যারিবীয় সাগর ও প্রশান্ত মহাসাগরে অন্তত ৮৭ জন নিহত হয়েছেন বলে অভিযোগ। জাতিসংঘও এসব হামলাকে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড হিসেবে নিন্দা করেছে।

ট্রাম্পের হুমকির জবাবও দিয়েছেন পেত্রো। এক্স-এ তিনি লিখেছেন, “যদি কোনো দেশ মার্কিনদের টনকে টন কোকেন সেবন বন্ধ করতে সাহায্য করে থাকে, তবে সেটা কলম্বিয়া।” তিনি আরও সতর্ক করেন, মিত্র দেশের ওপর হামলা চালানো মানে দুই শতাব্দীর কূটনৈতিক সম্পর্ককে বিপদের মুখে ঠেলে দেওয়া।

শেষে তিনি সরাসরি আমন্ত্রণ জানান ট্রাম্পকে—কলম্বিয়ায় গিয়ে দেখতে যে প্রতিদিন কীভাবে মাদক পরীক্ষাগার ধ্বংস করা হচ্ছে।

একদিকে তীব্র বাকযুদ্ধ, অন্যদিকে কূটনৈতিক সম্পর্কের অবনতি—দুই দেশের সম্পর্ক এখন এক নতুন অস্থিতির মুখে দাঁড়িয়ে। ট্রাম্পের সামরিক হুমকি ও পেত্রোর পাল্টা মন্তব্য দক্ষিণ আমেরিকাজুড়ে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। মাদকবিরোধী যুদ্ধ, অভিবাসন সংকট, আঞ্চলিক রাজনীতি—সব মিলিয়ে দুই নেতার ব্যক্তিগত বিরোধ এখন আকার নিয়েছে বড় ধরনের ভূরাজনৈতিক উত্তেজনায়।