বরিশালের গৌরনদী উপজেলায় লাইসেন্স ছাড়া বিপুল পরিমাণ জ্বালানি তেল মজুত ও বাজারে অতিরিক্ত দামে বিক্রির অভিযোগে এক ব্যবসায়ীকে ভ্রাম্যমাণ আদালত ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করেছে। একই অভিযানে মোট ৩২০০ লিটার ডিজেল, পেট্রোল ও অকটেন জব্দ করা হয়, যা অননুমোদিতভাবে সংরক্ষণ ও বিক্রির উদ্দেশ্যে রাখা হয়েছিল বলে প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
শনিবার (১৮ এপ্রিল) বিকেল থেকে সন্ধ্যা সাড়ে ৬টা পর্যন্ত সরিকল বাজার এলাকায় এই অভিযান পরিচালিত হয়। গোপন তথ্যের ভিত্তিতে জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থা (এনএসআই) বরিশাল জেলা কার্যালয় অভিযানটি সমন্বয় করে। অভিযানে নেতৃত্ব দেন উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. মেহেদী হাসান। পাশাপাশি গৌরনদী উপজেলা প্রশাসন ও থানা পুলিশের একটি যৌথ দল অভিযানে অংশ নেয়।
Table of Contents
কীভাবে ধরা পড়ে অবৈধ জ্বালানি চক্র
এনএসআই সূত্রে জানা যায়, সরিকল বাজার এলাকায় মেসার্স রহমান ইলেকট্রনিকস নামের একটি দোকান দীর্ঘদিন ধরে জ্বালানি তেল মজুত ও বিক্রির আড়াল হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছিল। প্রতিষ্ঠানটির স্বত্বাধিকারী আব্দুর রহমান কোনো ধরনের বৈধ লাইসেন্স ছাড়াই জ্বালানি সংগ্রহ করে বাজারে অতিরিক্ত দামে বিক্রি করতেন বলে অভিযোগ ওঠে।
গোপন নজরদারির মাধ্যমে জানা যায়, তিনি বরিশাল নগরীর পোর্ট রোড এলাকার খান এন্টারপ্রাইজের মাধ্যমে মেঘনা অয়েল ডিপো থেকে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি সংগ্রহ করেন। পরে তা গৌরনদীতে এনে অননুমোদিতভাবে সংরক্ষণ করা হচ্ছিল।
জব্দকৃত জ্বালানির বিস্তারিত
অভিযানে উদ্ধার করা জ্বালানির একটি অংশ বিভিন্ন প্লাস্টিক ড্রাম ও অননুমোদিত ট্যাংকে মজুত ছিল, যা জননিরাপত্তার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ বলে মনে করছে প্রশাসন।
| জ্বালানির ধরন | পরিমাণ |
|---|---|
| ডিজেল | ২৪০০ লিটার |
| পেট্রোল | ৬০০ লিটার |
| অকটেন | ২০০ লিটার |
| মোট | ৩২০০ লিটার |
অভিযান চলাকালে এসব জ্বালানি নিরাপত্তাহীনভাবে সংরক্ষিত অবস্থায় পাওয়া যায়, যা বড় ধরনের অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি তৈরি করতে পারত বলে কর্মকর্তারা জানান।
ভ্রাম্যমাণ আদালতের সিদ্ধান্ত
অভিযান শেষে ভ্রাম্যমাণ আদালত ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইনে ব্যবসায়ী আব্দুর রহমানকে ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড প্রদান করেন। একই সঙ্গে জব্দকৃত জ্বালানি তেল ন্যায্যমূল্যে বিক্রির নির্দেশ দেওয়া হয়, যাতে সাধারণ ভোক্তারা ক্ষতিগ্রস্ত না হন।
এছাড়া সরিকল বাজারের বাজার ব্যবস্থাপনা স্বচ্ছ রাখতে স্থানীয় বাজার কমিটির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদককে তদারকির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
প্রশাসনের কঠোর অবস্থান
উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. মেহেদী হাসান বলেন, লাইসেন্সবিহীনভাবে জ্বালানি তেল মজুত ও বিক্রি সম্পূর্ণ অবৈধ। প্রাথমিক তদন্তেই অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে, তাই তাৎক্ষণিকভাবে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
তিনি আরও জানান, জনস্বার্থে এ ধরনের অভিযান নিয়মিতভাবে চালানো হবে এবং কোনো অবস্থাতেই অসাধু ব্যবসায়ীদের ছাড় দেওয়া হবে না।
এনএসআই কর্মকর্তারা জানান, বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে জ্বালানির দাম বাড়ানোর একটি চক্র সক্রিয় রয়েছে বলে তারা তথ্য পেয়েছেন। এসব চক্র চিহ্নিত করে নজরদারি আরও জোরদার করা হয়েছে।
স্থানীয় প্রতিক্রিয়া ও উদ্বেগ
স্থানীয় ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের মতে, দীর্ঘদিন ধরে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী জ্বালানি সংকটের সুযোগ নিয়ে অতিরিক্ত দামে বিক্রি করে আসছিলেন। এতে সাধারণ ভোক্তারা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছিলেন।
তারা প্রশাসনের এই পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, এ ধরনের অভিযান নিয়মিত না হলে বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরবে না। একই সঙ্গে তারা জ্বালানি বাজারে আরও কঠোর মনিটরিংয়ের দাবি জানান।
গৌরনদীর এই অভিযান শুধু একজন ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নয়, বরং পুরো জ্বালানি বাজার ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা ফেরানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। প্রশাসনের কঠোর অবস্থান প্রমাণ করছে যে, অবৈধ মজুত ও বাজার অস্থিরতার বিরুদ্ধে নজরদারি আরও জোরদার করা হচ্ছে।
সব মিলিয়ে এই ঘটনা স্থানীয় বাজার ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং আইনের শাসন নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তাকে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে।
