১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে নৃশংসভাবে হত্যা এবং ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পট পরিবর্তন বা ‘রেজিম চেইঞ্জ’ একই ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ার অংশ বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ)-এর শীর্ষ নেতারা। দলটির জ্যেষ্ঠ নেতাদের দাবি, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে পরাজিত শক্তির উত্তরসূরি ও রাজনৈতিক মিত্ররা আজও বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল করতে এবং মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনা ধ্বংস করতে সেই পরাজয়ের প্রতিশোধ নিচ্ছ।
রাজধানীর বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে অবস্থিত জাসদ কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের কর্নেল তাহের মিলনায়তনে ১৫ আগস্ট স্মরণে এক বিশেষ আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভা শুরুর প্রাক্কালে উপস্থিতি নেতাকর্মীরা জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে বিনম্র শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। এরপর ১৫ আগস্টের সব শহীদ এবং দেশের বিভিন্ন গণতান্ত্রিক আন্দোলনে প্রাণ উৎসর্গকারীদের স্মরণে দাঁড়িয়ে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়।
আলোচনা সভায় প্রধান বক্তা ও অন্যান্য দলীয় নেতারা বলেন, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট কেবল বাংলাদেশের ইতিহাসে নয়, বরং বিশ্ব রাজনীতির ইতিহাসেও একটি অন্যতম কলঙ্কিত ও কালো অধ্যায়। স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতিকে সপরিবারে নির্মমভাবে হত্যা করার মাধ্যমে দেশের গণতান্ত্রিক ও অসাম্প্রদায়িক ধারাকে স্তব্ধ করে দেওয়ার ষড়যন্ত্র করা হয়েছিল। বক্তাদের মতে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ক্ষমতার যে পরিবর্তন ঘটেছে, তার মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করেছে সেই পরাজিত ও চিরশত্রু শক্তিগুলোই, যারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করতে চায়।
জাসদ নেতারা আরও উল্লেখ করেন, দলের সভাপতি হাসানুল হক ইনুকে অতীতে জিয়াউর রহমানের সামরিক আদালতে দণ্ডিত করা থেকে শুরু করে পরবর্তী সময়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচারের মুখোমুখি করার বিষয়গুলো মূলতঃ একই রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র ও ধারাবাহিক নিপীড়নের অংশ। এটি জাসদসহ দেশের প্রগতিশীল ও মুক্তিযুদ্ধমুখী রাজনৈতিক দলগুলোকে দুর্বল করার একটি অপপ্রয়াস।
সভার সভাপতিত্ব করেন জাসদ কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সভাপতি শফিউদ্দিন মোল্লা। এতে দলের প্রগতিশীল ধারার অবস্থান এবং বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে বক্তব্য দেন জাসদ কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য সাইফুজ্জামান বাদশা, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আবদুল্লাহিল কাইয়ূম, দপ্তর সম্পাদক সাজ্জাদ হোসেন, জাতীয় যুব জোটের সভাপতি শরিফুল কবির স্বপন এবং বাংলাদেশ ছাত্রলীগ (বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র)-এর কেন্দ্রীয় সংসদের সহ-সভাপতি গোলাম কিবরিয়া।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণে দেখা যায়, ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর ১৫ আগস্টকে জাতীয় শোক দিবস হিসেবে ঘোষণা করে এবং সরকারি ছুটি চালুর বিধান করে। তবে ২০০১ সালে বিএনপি-রাজনৈতিক জোট সরকার ক্ষমতায় এসে এই জাতীয় শোক দিবস ও ছুটি বাতিল করে। পরবর্তীতে ২০০৮ সালে হাইকোর্ট বিএনপি সরকারের সেই আদেশ অবৈধ ঘোষণা করলে পুনরায় দিবসটি জাতীয় শোক দিবস ও সরকারি ছুটি হিসেবে পালিত হয়ে আসছিল। পরবর্তীতে ২০২৪ সালে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার হাইকোর্টের সেই রায় স্থগিত করতে উচ্চ আদালতে আপিল করে, যার ফলশ্রুতিতে দেশের বর্তমান আইনি কাঠামোতে ১৫ আগস্টের সরকারি ছুটি ও জাতীয় শোক দিবসের বাধ্যবাধকতা স্থগিত রয়েছে। জাসদ নেতারা এই আইনি পরিবর্তন ও রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে স্বাধীন বাংলাদেশের মূল চেতনার ওপর আঘাত হিসেবে আখ্যায়িত করেন।









